
কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ
রিকশা আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ এক যানবাহন। বিশেষ করে ঢাকার। রিকশা ছাড়া কি ঢাকার দৃশ্য কল্পনা করা যাবে? মনে হয় না। যতদূর ইতিহাস জানি, স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই দেশে রিকশার চলাচল ছিল। এখনো আছে। অন্যসকল পরিবহন সময়ের সাথে অনেক বদলে গেলেও রিকশা রয়ে গেছে পুরনো আদলেই। ইদানীং চোখে পড়ে ইঞ্জিনের রিকশা। এই রিকশাও পায়ে চালানোর উপযোগী। চালক চাইলে ইঞ্জিন ব্যাবহার করতে পারবেন।
রিকশা সর্বশ্রেণীর মানুষেরই প্রিয় এবং উপযোগী পরিবহন। একজন উঁচুতলার মানুষ যিনি সব সময় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন, তিনি চাইলেই এক লাফে লোকাল বাসে দরজায় ঝুলে যেতে পারবেন না। নানান সীমাবদ্ধতা তাকে বাঁধা দেবে। কিন্তু তিনি অনায়াসেই রিকশায় চড়তে পারবেন। সামাজিক কোন সীমাবদ্ধতা তাকে বাঁধা দিবেনা।
রিকশায় চড়ার মুল আনন্দ হচ্ছে স্বাধীনতা। মুক্ত বাতাসে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকা যায়। কোন মেকিত্ব নেই। নির্ভার চলে যাওয়া শুধু। প্রতিবেশী দেশে আছে অন্য এক রকম রিকশা। যাত্রীকে পেছনে বসিয়ে চালক নিজে উটের রশির মত রিকশা টেনে নিয়েন। ঠেলাগাড়ির মত কোমরে বেঁধে ভোঁ দৌড়। এই সিস্টেম আমার ভালো লাগেনি। আধুনিক এই মেশিনারিজ এর যুগে এসে প্যাডেল মেরে চেন চাকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে, এমন দৃশ্যই মেনে নিতে কষ্ট হয়।
পালকি দেখেছি আমরা। চার বেয়ারা, আট বেয়ারার পালকি। হুন হুন করে ছড়া কেটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পালকিতে চড়া খুব আনন্দের। এক সময়ের রাজারা পালকিতে চড়তেন। আমাদের দেশেও এক সময় পালকিতে চড়ে বিয়ের রেওয়াজ ছিল। ব্যাপারটা উপভোগ্য, কিন্তু পালকিটি যারা বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের কথা ভেবে খারাপ লাগে। জীবিকার জন্য আমরা কত পেশার কাজই করি। কিন্তু আরেকজন আমার মতই সাধারণ মানুষ, তাকে কাঁধে চড়িয়ে নিতে হবে, এটা অমানবিক লাগে।
আগেরদিনের যুদ্ধ, ব্যবসা এবং সকল ভারবাহী কাজের জন্য পশুর সাহায্য নিত মানুষ। বিজ্ঞান পশুকে ভারবহন থেকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষের ভাগ্য বিজ্ঞান এখনো ফেরাতে পারেনি। হয়ত একদিন পারবে। আমরা সেদিনের দ্রুততা কামনা করি।
রিকশা আমাদের দেশের বিরাট একটা সংখ্যক মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা করে। যাদের কিছুই থাকে না, গ্রামে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যায়, তারা শেষ আশ্রয় হিসেবে শহরে এসে রিকশা ধরেন। চলতে চলতে অনেক রিকশাচালকের সঙ্গে গল্প করা হয়েছে।
রিকশাওয়ালাদের সঙ্গে গল্প করাটা বেশ মজার। তারা নিতান্ত অপরিচিত একজন মানুষ, আগামী দশমিনিট পরই যেই লোকটি তার রিকশা থেকে নেমে যাবে, এবং এর পর আর কোনোদিনই তার সঙ্গে দেখা হবে না, এমন একটি লোকের সঙ্গে তারা অবলীলায় জীবনের অনেক গল্প বলে ফেলতে পারেন। রিকশা ওঠার আগে যার সঙ্গে দরকষাকষি হয়ে গেছে এক হাত, রিকশায় ওঠামাত্রই তারা সেই অংশটি বেমালুম ভুলে যান। আপনজনের মত কথা বলতে বলতে পিঠে চড়িয়ে ঘুরে বেড়ান।
ময়মনসিংহের একজন শ্রমিক নেতা আর নির্বাচনী প্রচারণায় একটি শ্লোগান যুক্ত করেছিলেন ” রিকশাওয়ালাকে আপনি বলুন ” শ্লোগানটি বড় ভাল লাগে আমার। আমাদের অনেকেরই একটি খারাপ প্রবণতা থাকে। খুব ছোট ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমরা তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি। এই প্রবণতা দূর হয়ে সবার প্রতি ভালবাসা জেগে উঠুক, এবং ছড়িয়ে পড়ুক সকল প্রাণে।
