রহস্যে ঘেরা পাকিস্তানের আসন্ন নির্বাচন, মসনদে বসছেন কে?

ওমর ফারুক: আগামী ৩০ জুলাই পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। কে হবেন আগামীর পাকিস্তানের স্বপ্নবাহক, প্রশ্নটি এখন বিশ্বজুড়ে। পাকিস্তানকে চীনের সহায়তায় রাতারাতি বদলে দেওয়ার স্বপ্নে  সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ যখন বিভোর, ঠিক তখনি অপ্রকাশ্য এক শক্তির চাপে পানামা লিক কেলেঙ্কারি মামলায় থমকে গেল পাকিস্তান। ক্ষমতাচ্যুত হলেন নওয়াজ। স্বপ্ন ভঙ্গ হলো নওয়াজের। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিপুল জনপ্রিয়তার স্রোত আটকে দিল দেশটির বিচার বিভাগ। নওয়াজের দল পিএমএল (এন) চাপে পড়ল। এ চাপ এখন নির্বাচনেও সইতে হচ্ছে পিএমএল (এন)কে।

কে আসবেন ক্ষমতায়?

দেশটির প্রধান বিরোধী দল তেহরিকে ইনসাফের নেতা ইমরান খানকে দেশটির পরবর্তী নির্বাচনে এগিয়ে যাবার সুযোগ করে দিল নওয়াজের এই পানামা লিক কেলেঙ্কারি। যদিও সাবেক স্ত্রী রেহাম খান ইমরানের স্বপ্নে চিড় ধরানোর চেষ্টা করেছেন ইমরানের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের আত্মজীবনী লিখে। ইমরানের সাবেক স্ত্রীর আত্মজীবনীর কিছু অংশ গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এভাবে ফাঁস হলো ইমরানের কেলেঙ্কারিও। মোটকথা দুর্নীতি ও নারী আসক্তির কেলেঙ্কারি নিয়েই নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির প্রধান দুটি দল। তবে এ দু’দলের কেউ যে এবার পাকিস্তানের ক্ষমতায় এককভাবে বসতে পারবেন না, এর পূর্বাভাস ইতোমধ্যেই দিয়েছেন দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

রহস্যে ঘেরা এ নির্বাচনে পাক সেনাবাহিনীর পুরানো কৌশলী হস্তক্ষেপ চলে আসতে পারে এমন অভিযোগও উঠেছে। যদিও বুধবার সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে  সেনাবাহিনী। তবে এরই মধ্যে নওয়াজকে নাস্তানাবুদ করতে দেশটির বিচারবিভাগ যে একেরপর এক নওয়াজবিরোধী অর্ডার দিচ্ছে, তা সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে ইমরানকে ক্ষমতায় বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনী। বাস্তবতা তাই হলে ইমরানই হচ্ছে দেশটি ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী। এ প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য ইমরান এক পীরকে বিয়ে করেছেন এমন খবরও পাকিস্তানি মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সে যাই হোক, পাকিস্তানের আগামী নির্বাচনে কোয়ালিশন সরকার আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এককভাবে ক্ষমতায় আসার জনপ্রিয়তা এখন কোনো দলেরই নেই। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার বিশ্লেষণে এ কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

পিএমএল (এন) এর অবস্থান

বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০১৩ সালে নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ (সংরক্ষিত আসন ছাড়াই) ১২৬টি আসনে জয়লাভ করেছিল এবং স্বতন্ত্র, জেইউআইএফ, পিকেএমএপি এবং এনপিকে নিয়ে সহজেই ১৩৭-এর ম্যাজিক সংখ্যা অতিক্রম করে। এখন হয়তো পিএমএল-এন ৮০টি আসনের বেশি পাবে না। কেউ কেউ বলছেন, শাহবাজ শরিফের উত্থান বাধাগ্রস্ত করার জন্য নওয়াজ শরিফ হেরে যেতে চান। কিন্তু এনএবি, অর্থাৎ জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরো তাকে দোষী সাব্যস্ত করলে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য তার নিজেরই প্রধানমন্ত্রী হওয়া দরকার।

পিটিআই এর অবস্থান

পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ বা পিটিআই সাধারণভাবে ২৮টি আসন পেয়েছিল এবং এবার হয়তো এই সংখ্যা হিসাব করে ৭০-৮০ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পিএমএল-এনের ক্ষতি হলে তাদের হবে ‘অর্জন’। কেউ কেউ বলেছেন, এমনকি ‘প্রধান’ শক্তি পিটিআই বেশি আসন পাক, তা চায় না। তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতেই তারা এটা চান না। গতবার পিপিপি ৩২ আসন পেয়েছিল এবং তা হয়তো এই সময়ে বেড়ে ৪০ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল নিয়ে জোট গঠন

পিপলস পার্টি বা ফেডারেল কোয়ালিশনে পিপিপির নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। ছোট ছোট গ্রুপের জন্য (স্বতন্ত্র এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল) প্রায় ৭৫ আসন ছেড়ে দেয়া হতে পারে। তারপর হয়তো সবার একত্রে ৮৫টি আসন হতে পারে। এদের বেশির ভাগ আসন হতে পারে অপ্রকাশ্য শক্তির দর কষাকষির ফসল এবং এসব দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে চতুর্থ একটি শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েও যেতে পারে।

সুতরাং পিএমএল-এনকে ১৩৭ আসনে পৌঁছতে হলে হয়তো বাইরে থেকে প্রায় ৬০টি আসন প্রয়োজন। তারা এখনো স্বাধীন মানসিকতাসম্পন্ন লিবারেল পার্টিগুলোকেও হিসাব করতে পারেন। এসব দলের মধ্যে রয়েছে পিকেএমএপি, এনপি এবং এএনপি। এসব দলের ১০টি আসন পিএমএল-এন নিজেদের পক্ষে হিসাব করতে পারে। কিন্তু ছোট গ্রুপগুলোকে পিএমএল-এনকে এড়িয়ে চলতে বলা হলে সে ক্ষেত্রে একমাত্র বিকল্প হবে পিপিপি নেতা জারদারিকে আইনগত দায়মুক্তি দিয়ে প্রেসিডেন্সির পথে নিয়ে যাওয়া। ১০টিরও বেশি দল নিয়ে কোয়ালিশন সরকার পরিচালনা করার ধারণা পিপিপিকে দেয়া হতে পারে। তবে আসিফ আলী জারদারি সহজেই নওয়াজের বিরুদ্ধে ক্রোধ দেখাতে নাও চাইতে পারেন।

যাহোক, পিটিআইয়ের অতিরিক্ত ৬০টি আসন দরকার হতে পারে। ছোট ছোট গ্রুপগুলো এগিয়ে যাওয়ার সঠিক নির্দেশনা পেলে হয়তো পিটিআইয়ের জন্য তাদরকে কাছে টানা সহজ হবে। তবে ১০টিরও অধিক দল নিয়ে সেটআপ করার ধারণা পিটিআইকেও আতঙ্কগ্রস্ত করতে পারে। পিএমএল-এনের অনুপযোগী হওয়া সত্ত্বেও পিটিআই হয়তো পিপিপিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইবে না। কেউ কেউ বলেন, ‘প্রধান’ শক্তিগুলো ইমরানকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর ব্যাপারে সতর্ক। আবার তারা ছোট গ্রুপগুলোকে একত্রে করে শাহ মেহমুদকে বিকল্প হিসেবে রেখেছেন।

ইমরানের পক্ষ থেকে ‘না’ বলা হলে সিনেট স্টাইলের অপর একটি বিকল্প উপায় নিয়ে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা-ভাবনা আছে। সেটা হলো, ছোট ছোট দলগুলোকে নিয়ে পিপিপির সাথে কোয়ালিশন গঠন করা হবে। এই কোয়ালিশনের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন একজন প্রবীণ, ন¤্র ও শান্ত স্বভাবের ভদ্রলোক। আর কোয়ালিশন সরকারের প্রেসিডেন্ট হবেন জারদারি। তিনিও হয়তো এই বিচিত্র বর্ণের লোকদের পিএমএল-এনের চেয়ে অগ্রাধিকার দেবেন। সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট জারদারিরও অনানুষ্ঠানিক অনেক ক্ষমতা থাকবে। এই অবস্থায় পিএমএল-এন আর পিটিআইকে মন খারাপ করে বিরোধী দলে যেতে হবে এবং তাদের বিরোধীদলীয় নেতার আসন অর্জন করার জন্য সংগ্রাম করতে হবে। এ অবস্থায় উভয় দলই বেসামরিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য একত্রে কাজ করতে পারে।
এই বিকল্প ব্যর্থ হলে এবং ছোট দলগুলো পিটিআইয়ের সাথে ঐক্যবদ্ধ হলে, জারদারি দ্রুত অধিকতর স্থিতিশীল সরকার এবং মধ্যপন্থীদের সাথে যোগ দিতে পারেন। পিটিআইয়ের বিশৃঙ্খল কোয়ালিশনকে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি প্রয়োজনে পিএমএল-এন, পিকেএমএপি, এনপি এবং এএনপি, দলত্যাগী ও দুর্নীতিবাজদের নিয়ে একসাথে কোয়ালিশন গঠন করতে পারেন। একটি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ালিশনের অব্যাহত তাগিদে এটা তখন অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়তে পারে। এভাবে নির্বাচন-পরবর্তী কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হতে পারে চাতুর্যপূর্ণভাবে। ’৯০ দশকের মতো ভোট কারচুপির পরিপ্রেক্ষিতে ’৫০-এর দশকের মতো অস্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে পারে- সেখানে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রায়ই পরিবর্তন আসবে। পিএমএল-এন অথবা পিটিআই ১০০ আসনের বেশি আসনে জয়লাভ করলেই কেবল এ ধরনের অবস্থা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু এটা হবে বলে মনে হচ্ছে না।

সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

চূড়ান্তভাবে কে জয়লাভ করবে, তা বিভিন্ন দল বাস্তবে কত আসন পাচ্ছে তার ওপর এবং ‘ক্ষমতাশালী’দের ওপর নির্ভর করবে। পিপিপি ছাড়া অন্য কোনো স্থিতিশীল সরকার গঠিত না হলে জারদারি প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। এতে করে ‘এক জারিদারি সবার ওপর ভারী’এই স্লোগান বৈধতা পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিনি তার দলকে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী করানোর মতো যোগ্য নন, যিনি এখন অনেকটা নির্জীব।
কিন্তু কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার হবে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট লোভী। মাত্র চারটি পার্লামেন্ট (১৯৭২, ২০০৩, ২০০৮ এবং ২০১৩) মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। এর মধ্যে তিনটি পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্যভাবে। যেসব পার্লামেন্টের দ্রুত অবসান ঘটেছে (১৯৮৮ সালের পার্লামেন্ট ছাড়া) সেগুলোর প্রায় সব ক’টির নির্বাচন সুষ্ঠু ছিল না। তাই ইতিহাস বলে, কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে যে পার্লামেন্টের জন্ম হয়, সেই পার্লামেন্ট মেয়াদ শেষ করতে পারে না। এভাবে নির্বাচিত এবং অপ্রকাশ্য শক্তির মহাকাব্যিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। কিন্তু কোনো পক্ষই এই যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করতে পারবে না।

কোয়ালিশন সরকার গঠনের সম্ভাবনা

তবে জোট সরকার গঠনের অস্ত্র নওয়াজ-ইমরানের হাতে বলে মনে করছেন পাকিস্তানের সুপরিচিত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইকরাম সেহগাল। তিনি বলেন, নওয়াজ শরিফ বা ইমরান খান- কারো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। সে ক্ষেত্রে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই বেশি। আর ওই সরকার গঠন করতে পারেন নওয়াজ শরিফ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা চৌধুরী নিসার কিংবা সদ্যবিদায়ী বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী মির আবদুল কুদ্দুস বিজেনজো।

করাচিভিত্তিক উর্দু দৈনিক ফারজের বিশ্লেষণেও একই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকাটির মতে, স্বতন্ত্র সদস্য হয়েও যেভাবে মির আবদুল কুদ্দুস বেজেনজো বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, তা বেশ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি সম্ভবত ওই ঘটনাকে পুরো পাকিস্তানের জন্য টেস্ট কেস হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, নওয়াজের পতনের সাথে সাথেই চৌধুরী নিসার দল ত্যাগ করেছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে দেশটির রাজনীতি-সংশ্লিষ্টদের প্রবল ধারণা। একই কথা প্রযোজ্য বেজেনজোর ব্যাপারেও।

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদপ্রবাসীদের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো সিলেট সিটি নির্বাচনে
পরবর্তি সংবাদপ্রচারে সমান সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ বিএনপি প্রার্থীদের