
সদর সাহেব রহ.: এক বিপর্যস্ত জাতির পুনর্জাগরণের কারিগর
পতনের ভেতরেই জাগরণের বীজ
আবু মারুফ
একটি জাতির পতন হঠাৎ ঘটে না।
তার আগে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তার অর্থনৈতিক ভিত। দুর্বল হয়ে যায় শিক্ষা। ক্ষয়ে যায় সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস। একসময় মানুষ নিজের ইতিহাস ও পরিচয় নিয়েও সংশয়ে পড়ে।
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসেও এমন একটি দীর্ঘ অন্ধকার সময় এসেছিল।
আওরঙ্গজেব আলমগীরের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের রাজনৈতিক জীবনে যে অবক্ষয়ের সূচনা হয়, আঠারো শতকের পলাশী-ট্র্যাজেডি তাকে আরও তীব্র করে তোলে। ১৭৫৭ সালের পর বাংলার মুসলমান শুধু রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারায়নি; তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক কাঠামোও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ ঔপনিবেশিক অধ্যায়।
এই সময়ের অভিঘাত ছিল বহুমাত্রিক। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়। পুরোনো শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক কাঠামো বদলে যায়। ফারসির জায়গায় ইংরেজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি অন্ধকারের ভেতরেই কোথাও না কোথাও জাগরণের বীজ থাকে।
সেই বীজকে লালন করেন কিছু মানুষ।
কেউ শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে আসেন। কেউ সমাজসংস্কারে। কেউ রাজনীতিতে। কেউ সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। কেউ আবার মানুষের অন্তর্জগতের পরিবর্তনকে নিজের কর্মের কেন্দ্র বানান।
মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., যিনি মানুষের কাছে সদর সাহেব রহ. নামে পরিচিত, ছিলেন এই বহুমাত্রিক জাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারিগর।
তিনি শুধু একজন আলেম ছিলেন না।
তিনি ছিলেন শিক্ষক।
সংস্কারক।
সংগঠক।
লেখক।
আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
সমাজচিন্তক।
আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন একজন জাতিগঠনের মানুষ।
ঔপনিবেশিক অভিঘাত: অর্থনীতি থেকে আত্মপরিচয়
পলাশীর পরাজয় ছিল রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা। কিন্তু এর অভিঘাত সেখানেই থেমে থাকেনি।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো নীতির মাধ্যমে বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। রাজস্বের চাপ বাড়ে। কৃষকের ওপর শোষণ তীব্র হয়। অর্থনৈতিক কাঠামোতে তৈরি হয় দীর্ঘস্থায়ী সংকট।
এরপর আসে নিষ্কর বা লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া।
এই সম্পত্তিগুলোর ওপর নির্ভর করত বহু মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ, দরগাহ ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। ফলে অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে মুসলিম সমাজের শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক কাঠামোও।
শিক্ষাব্যবস্থায়ও আসে বড় পরিবর্তন।
ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটে। প্রশাসন ও চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজির গুরুত্ব বাড়ে। ফারসি ধীরে ধীরে রাজকর্মের ভাষার মর্যাদা হারায়। এর ফলে পুরোনো মুসলিম শিক্ষিত শ্রেণি নতুন ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়ে।
ধর্মীয় জীবনও এই অভিঘাত থেকে মুক্ত ছিল না।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মচর্চার কাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় সমাজে নানা কুসংস্কার ও লোকাচার জায়গা করে নেয়। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
অর্থাৎ সংকটটি ছিল সর্বাঙ্গীণ।
রাজনৈতিক ক্ষমতা গেছে।
অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয়েছে।
শিক্ষার কাঠামো বদলে গেছে।
সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে গেছে।
ধর্মীয় জীবনও নানা সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে।
এমন এক সময়েই প্রয়োজন হয়ে পড়ে এমন নেতৃত্বের, যে শুধু সমস্যার কথা বলবে না; বরং পুনর্গঠনের পথও দেখাবে।
যে মানুষটির ভেতর দায়িত্ববোধ জন্মেছিল শৈশবেই
মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর জন্ম ১৮৯৮ সালে বর্তমান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার এক গ্রামে। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামী দাওয়াতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাঁর পিতা মুন্সী মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ছিলেন আলেম এবং ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তি।
শৈশবেই তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয় পরিবারে।
কায়দা।
আম্মাপারা।
প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল।
এরপর তিনি সাধারণ শিক্ষার ধারাতেও প্রবেশ করেন। কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় পড়াশোনার সময় তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। বৃত্তি পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্ব অর্জন করেন। প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও সাফল্য দেখান।
পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।
বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর ছাত্র হওয়ার সুযোগও তাঁর হয়েছিল। কিন্তু তাঁর অন্তরের আকর্ষণ ছিল অন্য জায়গায়।
তিনি খুঁজছিলেন ইলমে দ্বীন।
এই আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে শেষ পর্যন্ত দেওবন্দের পথে নিয়ে যায়। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে তিনি সেই সুযোগকে নিজের বহুদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ হিসেবে গ্রহণ করেন।
এই যাত্রা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
থানভী ও মাদানী: দুই ধারার মিলন
দেওবন্দে যাওয়ার পর তাঁর জীবনে দুটি ব্যক্তিত্ব বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেন।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.
এবং
শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.
সাহরানপুরে অধ্যয়নকালে তিনি থানভীর সঙ্গে নিয়মিত আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। পরে দেওবন্দেও তাঁর এই ইসলাহী সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে তিনি উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেমদের কাছ থেকে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করেন।
এই দুই মনীষীর প্রভাব তাঁর ব্যক্তিত্বকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়।
থানভীর কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক সংস্কার ও সমাজসংস্কারের গভীর বোধ।
মাদানীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন সংগ্রামী চেতনা, বৃহত্তর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
এই দুই ধারার সমন্বয় তাঁর পরবর্তী কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
সদর সাহেব রহ.-এর জীবন তাই কেবল কিতাবি জ্ঞানের জীবন ছিল না।
এটি ছিল জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি, সমাজসংস্কার ও সংগ্রামী চেতনার সমন্বিত এক সাধনা।
শিক্ষা: জাতি গড়ার প্রথম হাতিয়ার
সদর সাহেব রহ. বুঝেছিলেন, একটি জাতিকে স্থায়ীভাবে বদলাতে হলে তার নতুন প্রজন্মকে বদলাতে হবে।
আর নতুন প্রজন্মকে বদলানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো শিক্ষা।
তাই তাঁর সংস্কারকর্মের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল শিক্ষাব্যবস্থা।
তিনি শুধু মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেননি।
তিনি একটি শিক্ষাদর্শ দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন।
তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন শিক্ষা, যা মানুষকে নিজের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখবে। একই সঙ্গে তাকে সময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে।
মক্তব: ভবিষ্যতের বীজতলা
সদর সাহেব রহ. যেখানে যেতেন, সেখানে মক্তব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন।
তাঁর কাছে মক্তব ছিল কেবল প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষার জায়গা নয়।
এটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসগঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠান।
শিশুর হাতে কুরআন তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে একটি ধর্মগ্রন্থ পড়ানো নয়। তার সামনে একটি নৈতিক ও আত্মপরিচয়ের জগৎ খুলে দেওয়া।
এই ভাবনা থেকেই তিনি ব্যাপকভাবে মক্তব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন।
প্রাথমিক শিক্ষায় সমন্বয়ের চেষ্টা
মক্তবের পর আসে প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এখানেও তিনি ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার সমন্বয়ের কথা বলেছেন।
প্রাথমিক স্তরেই যদি শিশুর চিন্তার ভিত তৈরি হয়, তাহলে সেই ভিতকে বিচ্ছিন্ন করে গড়ে তোলার কোনো অর্থ নেই—এমন একটি ধারণা তাঁর কর্মে স্পষ্ট।
নূরানী পদ্ধতির বিকাশ ও প্রসারে তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার কথাও মূল লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদরাসা প্রতিষ্ঠার বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ
ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় পুরোনো মুসলিম শিক্ষাকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
সদর সাহেব রহ. এই সংকটকে শুধু সমস্যা হিসেবে দেখেননি।
তিনি এটিকে একটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁর শিষ্য-শাগরেদরাও এই উদ্যোগকে বিস্তৃত করেন। ফলে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
এই ধারার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল জাতীয় মানের কিছু জামেয়া প্রতিষ্ঠা।
আশরাফুল উলূম বড় কাটারা।
জামি”আ কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ।
জামি”আ আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ।
খাদেমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা।
এসব প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে শুধু ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে থাকেনি। শিক্ষা, সংস্কার, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এগুলো ভূমিকা রাখে।
অর্থাৎ তিনি শুধু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেননি।
তিনি নেতৃত্ব তৈরির পরিকাঠামো নির্মাণ করেছিলেন।
ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতু
সদর সাহেব রহ.-এর শিক্ষাচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়।
তিনি ‘মানকুলাত’ ও ‘মাকুলাত’-এর সমন্বয়ের কথা বলেছেন।
একদিকে কুরআন-হাদীস।
অন্যদিকে যুক্তি, বিজ্ঞান ও অনুসন্ধান।
তাঁর কাছে এই দুই ধারার মধ্যে সংঘাত থাকা উচিত নয়।
বরং একে অন্যকে সমৃদ্ধ করা উচিত।
তিনি ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, জ্যামিতি, জীববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মতো বিষয় শেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে বিজ্ঞান মানুষের বুদ্ধিকে প্রসারিত করবে এবং সৃষ্টিজগতের রহস্য অনুধাবনে সহায়তা করবে।
এই চিন্তা তাঁর সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ তিনি একদিকে অন্ধ অনুকরণ চাননি।
অন্যদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের দরজাও বন্ধ করতে চাননি।
তিনি চেয়েছিলেন জ্ঞান আসুক।
কিন্তু আত্মপরিচয় অটুট থাকুক।
সমন্বিত শিক্ষাই ছিল তাঁর স্বপ্ন
সদর সাহেব রহ.-এর শিক্ষাদর্শনের একটি বহুল উদ্ধৃত বক্তব্য—
‘ধর্মহীন কর্মশিক্ষা এবং কর্মহীন ধর্মশিক্ষা উভয়টাই জাতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।’
এই বাক্যটি তাঁর শিক্ষাচিন্তার সারকথা বলা যায়।
তিনি এমন আলেম চাননি, যিনি শুধু কিতাব জানেন কিন্তু সমাজ বোঝেন না।
আবার এমন শিক্ষিত মানুষও চাননি, যিনি আধুনিক জ্ঞান জানেন কিন্তু নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছেন।
তিনি চেয়েছিলেন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।
এই ধারণার বাস্তব প্রয়োগও তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায়। কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষার কথাও মূল লেখায় এসেছে।
অর্থাৎ তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষ তৈরির প্রক্রিয়া।
শুধু চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নয়।
মসজিদকেও বানিয়েছিলেন শিক্ষার কেন্দ্র
শিক্ষাকে তিনি শুধু প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালে আটকে রাখেননি।
সাধারণ মানুষের কাছে কুরআনের শিক্ষা পৌঁছে দিতে মসজিদকেন্দ্রিক কুরআন শিক্ষা ও তাফসিরের ক্লাস চালুর উদ্যোগ নেন।
এখানে তাঁর কর্মপদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ধরা পড়ে।
তিনি মানুষের কাছে গেছেন।
মানুষকে প্রতিষ্ঠানে আসার অপেক্ষায় থাকেননি।
ধর্মীয় সংস্কার: মূলের দিকে ফিরে যাওয়া
সদর সাহেব রহ.-এর সংস্কারচিন্তার দ্বিতীয় বড় ক্ষেত্র ছিল ধর্মীয় জীবন।
ঔপনিবেশিক সময়ের নানা অভিঘাতে মুসলিম সমাজে কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিকৃতি জায়গা করে নিয়েছিল—মূল লেখায় এই সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সদর সাহেব রহ. এই অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছেন।
তাঁর সংস্কারের কেন্দ্রে ছিল তাওহীদ।
সুন্নাহ।
এবং ইসলামের মৌলিক চেতনার প্রতি প্রত্যাবর্তন।
তিনি চেয়েছিলেন ধর্মীয় জীবনের ওপর জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় আবরণ সরিয়ে মানুষকে ইসলামের মূল শিক্ষার কাছে ফিরিয়ে নিতে।
কিন্তু তাঁর ধর্মীয় সংস্কার শুধু নিষেধের ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
পরিবারে।
সমাজে।
অর্থনীতিতে।
রাজনীতিতে।
নৈতিকতায়।
সবখানেই ইসলামের একটি জীবনমুখী দৃষ্টিভঙ্গি আছে—এ কথা তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
মতভেদের ঊর্ধ্বে ভ্রাতৃত্ব
সদর সাহেব রহ.-এর চিন্তার একটি উজ্জ্বল দিক ছিল মুসলিম ঐক্যের প্রতি তাঁর গুরুত্ব।
মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য তাঁকে ব্যথিত করত।
তিনি মনে করতেন, মতভেদ থাকতে পারে।
কিন্তু মতভেদ যেন সম্পর্ক নষ্ট না করে।
শাখাগত বিষয়ে মতপার্থক্যকে তিনি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্যের পথে বাধা হতে দিতে চাননি। জীবনীকারের বর্ণনায় বিভিন্ন ধারার মুসলমানের প্রতি তাঁর উদার ও সমন্বয়ী মনোভাবের কথা এসেছে।
এই দিকটি তাঁর সংস্কারকর্মকে একটি মানবিক মাত্রা দেয়।
সংস্কার করতে গিয়ে বিভাজন তৈরি করা সহজ।
কিন্তু সংস্কার ও ঐক্যকে পাশাপাশি রাখা কঠিন।
সদর সাহেব রহ. সেই কঠিন পথটিই বেছে নিয়েছিলেন।
সংস্কৃতি: আত্মপরিচয়ের গভীর স্তর
সদর সাহেব রহ.-এর কাছে সংস্কৃতি ছিল কেবল গান, সাহিত্য, পোশাক বা উৎসবের নাম নয়।
সংস্কৃতি মানুষের বিশ্বাস।
তার জীবনযাপন।
তার মূল্যবোধ।
তার সামাজিক সম্পর্ক।
তার ভাষা।
তার ইতিহাসবোধ।
তার আত্মপরিচয়।
এই বৃহত্তর অর্থেই তিনি বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের কথা ভেবেছেন।
ঔপনিবেশিক অভিঘাতে যখন আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি হয়েছিল, তখন তিনি শিক্ষা, ধর্মীয় সংস্কার ও আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও মনোযোগ দেন।
খাদেমুল ইসলাম: সংগঠন থেকে সমাজগঠন
‘স্রষ্টার ইবাদত, সৃষ্টির খেদমত’—এই ভাবনাকে সামনে রেখে খাদেমুল ইসলাম জামাত গড়ে ওঠে।
এর লক্ষ্য ছিল মানুষকে সংগঠিত করা।
সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করা।
জনকল্যাণের কাজে মানুষকে যুক্ত করা।
আর ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজজীবনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া।
এখানে সদর সাহেব রহ.-এর চিন্তার একটি মৌলিক দিক স্পষ্ট।
তিনি শুধু ব্যক্তিকে পরিবর্তন করতে চাননি।
তিনি সমাজকেও পরিবর্তনের অংশ করতে চেয়েছেন।
প্রতিষ্ঠান নির্মাণ: তাঁর সবচেয়ে দৃশ্যমান উত্তরাধিকার
সদর সাহেব রহ. যেখানে গেছেন, সেখানে মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন—মূল লেখায় তাঁর কর্মের এই দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে আশরাফুল উলূম বড় কাটারা, জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগ, জামেয়া ফরিদাবাদ, গওহরডাঙ্গাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে বহু মানুষের শিক্ষা ও চিন্তার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এখানে তাঁর কাজকে শুধু স্থাপনা নির্মাণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
তিনি জায়গা তৈরি করেছেন।
সেই জায়গায় প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি হয়েছে মানুষ।
আর সেই মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে।
একটি প্রতিষ্ঠান এভাবেই একসময় একটি ধারায় পরিণত হয়।
গবেষণা: জ্ঞানের নিজস্ব পরিসর তৈরির চেষ্টা
সদর সাহেব রহ. বুঝেছিলেন, একটি জাতির স্থায়ী জাগরণের জন্য শুধু বক্তৃতা যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন গবেষণা।
প্রয়োজন লেখক।
প্রয়োজন চিন্তক।
প্রয়োজন এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, যেখানে ইসলামী জ্ঞানকে সমকালীন ভাষায় নতুন করে উপস্থাপন করা যায়।
এই লক্ষ্যেই তিনি ইদারাতুল মাআরিফ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। গবেষক ও লেখক তৈরির এই প্রচেষ্টার কথাও মূল লেখায় বিস্তারিতভাবে এসেছে।
এই উদ্যোগ তাঁর চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে।
তিনি শুধু উত্তরাধিকার গ্রহণ করতে চাননি।
তিনি উত্তরাধিকারকে নতুন ভাষায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।
খেদমতে খলক: মানুষের সেবাই দায়িত্ব
সদর সাহেব রহ.-এর কর্মজীবনে মানুষের সেবা একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।
‘খেদমতে খলক’ বা সৃষ্টির সেবাকে তিনি আলেমদের সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের মূলমন্ত্রেও ছিল স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টির সেবা।
এখানে তাঁর ধর্মচিন্তার একটি গভীর মানবিক দিক প্রকাশ পায়।
ইবাদত মানুষকে স্রষ্টার সঙ্গে যুক্ত করবে।
আর সেই সম্পর্কের ফল প্রকাশ পাবে মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধে।
অর্থাৎ ধর্ম তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত সাধনা নয়।
এটি সামাজিক দায়ও।
কলমকে বানিয়েছিলেন দাওয়াতের বাহন
সদর সাহেব রহ. ছিলেন বহু ভাষায় পারদর্শী।
আরবি।
বাংলা।
ইংরেজি।
উর্দু।
ফারসি।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনি সহজ বাংলা ভাষাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। জীবনীকারের বর্ণনায়ও তাঁর সহজবোধ্য ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি সাহিত্যিক খ্যাতির জন্য লেখেননি।
লিখেছেন বোঝানোর জন্য।
লিখেছেন মানুষকে কাছে টানার জন্য।
লিখেছেন দাওয়াতের জন্য।
এই কারণে তাঁর ভাষায় পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের চেয়ে যোগাযোগের ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাঁর বিপুল লেখালেখির মধ্যে ‘তাফসীরে হক্কানী’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এটি তাঁর বড় অবদান হিসেবে মূল লেখায় উপস্থাপিত হয়েছে।
শুধু বই নয়।
সাপ্তাহিক জলসা।
বক্তৃতা।
সেমিনার।
মাসিক পত্রিকা।
দেয়ালিকা।
এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও তিনি শিক্ষার্থীদের মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশে ভূমিকা রাখেন।
আধ্যাত্মিকতা: বাহ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্তরের পরিবর্তন
একটি সমাজের কাঠামো বদলালেই সমাজ বদলে যায় না।
মানুষের ভেতরেও পরিবর্তন আনতে হয়।
সদর সাহেব রহ.-এর আধ্যাত্মিক কর্মধারার গুরুত্ব এখানেই।
থানভবনে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর দীর্ঘ সাহচর্য তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে তিনি বাংলার মানুষের মধ্যে সেই আত্মশুদ্ধির চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তাঁর কাছে আত্মশুদ্ধি ছিল ব্যক্তিগত বিষয়।
কিন্তু তার ফল ছিল সামাজিক।
কারণ চরিত্রবান মানুষ ছাড়া কোনো ভালো প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন টেকে না।
রাজনীতি: ক্ষমতার জন্য নয়, আদর্শের জন্য
সদর সাহেব রহ.-এর রাজনৈতিক জীবনও ছিল বিস্তৃত।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। দেশভাগের সময় সিলেটের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর ভূমিকার কথা মূল লেখায় এসেছে। পরবর্তী সময়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, মুসলিম লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
তবে তাঁর রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর আদর্শিক ভিত্তি।
তিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি হিসেবে দেখেননি।
তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল একটি জীবনদর্শনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবায়নের হাতিয়ার।
এই কারণেই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে কেবল দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর ভূমিকার ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না।
তিনি সমাজের চিন্তা বদলাতে চেয়েছেন।
সংস্কৃতি বদলাতে চেয়েছেন।
মানুষ তৈরি করতে চেয়েছেন।
তারপর সেই মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের কাজে যুক্ত করতে চেয়েছেন।
একজন মানুষ, বহু ময়দান
সদর সাহেব রহ.-কে একটি পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা কঠিন।
তিনি আলেম।
কিন্তু শুধু আলেম নন।
তিনি শিক্ষক।
কিন্তু শুধু শিক্ষক নন।
তিনি সমাজসংস্কারক।
কিন্তু শুধু সমাজসংস্কারক নন।
তিনি লেখক।
কিন্তু শুধু লেখক নন।
তিনি আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
তিনি সংগঠক।
তিনি রাজনৈতিক চিন্তক।
তাঁর জীবনকে একত্রে দেখলে একটি বৃহৎ জাতিগঠন প্রকল্পের ছবি ফুটে ওঠে।
মক্তব থেকে মাদরাসা।
মাদরাসা থেকে জামেয়া।
মসজিদ থেকে গবেষণাকেন্দ্র।
শিক্ষা থেকে সংস্কার।
সংস্কার থেকে সংগঠন।
সংগঠন থেকে সমাজ।
আর সমাজ থেকে বৃহত্তর জাতিগত জাগরণ।
এই ছিল তাঁর কর্মের বিস্তার।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান কী?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে দেওয়া যায় না।
বইয়ের সংখ্যা দিয়েও নয়।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তালিকা দিয়েও নয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল একটি বিপর্যস্ত সমাজের সামনে আত্মপরিচয়, শিক্ষা ও পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত পথ তুলে ধরা।
তিনি বলেছিলেন—শিক্ষা চাই।
কিন্তু শিকড়হীন শিক্ষা নয়।
বিজ্ঞান চাই।
কিন্তু নৈতিকতাহীন বিজ্ঞান নয়।
ধর্ম চাই।
কিন্তু জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ধর্ম নয়।
সংগঠন চাই।
কিন্তু মানুষের সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন সংগঠন নয়।
রাজনীতি চাই।
কিন্তু কেবল ক্ষমতার জন্য নয়।
এই সমন্বয়ের মধ্যেই তাঁর চিন্তার স্বাতন্ত্র্য।
উত্তরাধিকার: একটি জাতির স্মৃতিতে তাঁর স্থান
একজন মানুষের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর জীবদ্দশার কাজ দিয়ে মাপা যায় না।
মাপতে হয় তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান দিয়ে।
তাঁর তৈরি মানুষ দিয়ে।
তাঁর প্রভাবিত চিন্তা দিয়ে।
তাঁর শুরু করা ধারার পরবর্তী বিস্তার দিয়ে।
এই বিচারে সদর সাহেব রহ.-এর উত্তরাধিকার বিস্তৃত।
তাঁর শিক্ষা-সংস্কার বহু প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করেছে।
তাঁর ধর্মীয় সংস্কার মুসলিম সমাজের চিন্তায় প্রভাব ফেলেছে।
তাঁর সাংগঠনিক কর্মধারা সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি কাঠামো তৈরি করেছে।
তাঁর লেখালেখি বাংলা ভাষায় ইসলামী জ্ঞানচর্চার একটি বড় পরিসর তৈরি করেছে।
তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মধারা বহু মানুষের ব্যক্তিজীবনে প্রভাব ফেলেছে।
আর তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা একটি আদর্শভিত্তিক সমাজদৃষ্টির কথা সামনে এনেছে।
শেষ কথা: তাঁকে মনে রাখা কেন জরুরি
ইতিহাসে কিছু মানুষ সময়ের কোলাহলে হারিয়ে যান।
কিন্তু তাঁদের তৈরি করা পথ থেকে যায়।
প্রতিষ্ঠান থেকে যায়।
চিন্তা থেকে যায়।
মানুষ থেকে যায়।
সদর সাহেব রহ. তেমনই একজন মানুষ।
তিনি এমন এক সময়ে কাজ করেছেন, যখন বাঙালি মুসলমান নানা দিক থেকে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়েছে। অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা বদলে গেছে। সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসে ভাঙন ধরেছে। ধর্মীয় জীবনও নানা সংকটে আক্রান্ত হয়েছে।
তিনি সেই সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু আক্ষেপ করেননি।
কাজ করেছেন।
মক্তব গড়েছেন।
মাদরাসা গড়েছেন।
জামেয়া গড়েছেন।
গবেষণাকেন্দ্র গড়েছেন।
সংগঠন করেছেন।
বই লিখেছেন।
মানুষকে সংগঠিত করেছেন।
আত্মশুদ্ধির দিকে ডেকেছেন।
সমাজের জন্য কাজ করতে বলেছেন।
তাঁর জীবন তাই কেবল একজন আলেমের জীবনী নয়।
এটি একটি সমাজকে পুনর্গঠনের দীর্ঘ প্রয়াস।
একটি হারাতে বসা আত্মপরিচয়কে পুনরায় দৃঢ় করার চেষ্টা।
একটি জাতিকে জ্ঞান, চরিত্র, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের শক্তিতে দাঁড় করানোর সাধনা।
তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—
জাতি শুধু বক্তৃতায় জাগে না।
জাতি জাগে মানুষ তৈরিতে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠায়।
চিন্তা নির্মাণে।
চরিত্র গঠনে।
সংগঠন গড়তে।
আর নিজের পরিচয়ের ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে।
সদর সাহেব রহ. সেই কাজটিই করে গেছেন।
নীরবে।
দীর্ঘদিন ধরে।
নিজের জন্য নয়।
কওম ও মিল্লাতের জন্য।
তাঁকে স্মরণ করা তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়।
এটি নিজেদের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানো।
নিজেদের জাতিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার উৎসকে নতুন করে বোঝা।
আর হয়তো সেখান থেকেই ভবিষ্যতের জন্য নতুন কোনো পথের সন্ধান পাওয়া।
