
হামমাদ রাগিব
চলমান তাবলিগ-সঙ্কটে সাদপন্থী তাবলিগিরা বাংলাদেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরামের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত না মানার কারণ হিশেবে, বাংলাদেশের আলেমদের পক্ষপাতের দোষে দুষ্ট হওয়ার ব্যাপারটি উল্লেখ করছেন। তাবলিগ বিষয়ে দেশীয় কোনো আলেমের সিদ্ধান্তকে তাঁরা কোনোভাবেই মানবেন না বলে মত দিয়েছেন। তবে ভারতের শীর্ষ উলামায়ে কেরামের ওপর তাঁদের পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা আছে বলে জানিয়েছেন সা’দপন্থীদের মুখপাত্র মাওলানা জিয়া বিন কাসিম। ফাতেহ২৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানিয়েছেন, ভারতের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম তাবলিগ সম্পর্কে যে পরামর্শ দেবেন, সাদপন্থীরা তা শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে নেবে।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ভারতের বড় বড় মাদরাসাগুলোর কর্তৃপক্ষ এবং শীর্ষ উলামায়ে কেরাম মাওলানা সা’দ কান্ধলভি সম্পর্কে দারুল উলুম দেওবন্দ যে ওয়াজাহাতনামা প্রকাশ করেছিল বছর দুয়েক আগে, তার ওপর পরিপূর্ণ সহমত জ্ঞাপন করেছেন। এবং তাঁদের সে সহমত এখন অবধি বলবৎ আছে।
তাবলিগের চলমান সঙ্কট এবং মাওলানা সা’দ কান্ধলভির বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের ওপর ভারতীয় উলামায়ে কেরামের লেখা বিভিন্ন পুস্তিকা ‘তাবলিগ সিরিজ’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেছেন বিশিষ্ট লেখক অনুবাদক ও আলেম মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক। তিনি ফাতেহ২৪-কে জানিয়েছেন, তাবলিগ সিরিজের সপ্তম বই ‘সাদ সাহেবের ভ্রান্তি নিরসনে দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্যোগ: কিছু ইতিহাস, কিছু বেদনা’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতে ভারতের কানপুর, মুম্বাই, তামিলনাড়ু, লাখনৌ, বেলগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত শীর্ষ সব মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ ও সেগুলোর উসতাদদের অভিমত তাঁদের স্বাক্ষরসহ সংযোজিত হয়েছে। তাঁরা সকলেই দারুল উলুম দেওবন্দের ওয়াজাহাতনামার সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন।
দেওবন্দের অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে প্রকাশিত সেই ওয়াজাহাতনামা এখনও বলবৎ আছে। সা’দ সাহেব ওয়াজাহাতনামা প্রকাশের পর দারুল উলুম দেওবন্দের কাছে চিঠিমারফত রুজুনামা প্রেরণ করলেও রুজুনামায় রুজু করার নির্ধারিত নীতি রক্ষা করা হয়নি বিধায় দারুল উলুম দেওবন্দ তাঁর ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম দেওবন্দের সেই ওয়াজাহাতনামার ভিত্তিতেই মাওলানা সা’দ সাহেবের বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানান মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক।
সম্প্রতি টঙ্গী ময়দানে অবস্থানরত তাবলিগের সাধারণ সাথী, আলেম ও মাদরাসা-ছাত্রদের ওপর চালানো সা’দপন্থীদের নৃশংস হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন নদওয়াতুল উলামা লাখনৌ-এর উসতাদ, তাবলিগের পুরনো সাথী ও মুরব্বি মাওলানা মুহাম্মদ জাহেদ মাজাহেরি নদভি। এ বিষয়ে সা’দপন্থী ও উলামায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে সম্প্রতি একটি পুস্তিকাও লিখেছেন তিনি।পুস্তিকাটির এক জায়গায় লিখেছেন—’মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেবের কিছু বয়ানের ওপর শুধু বাংলাদেশি উলামায়ে কেরামই আপত্তি তোলেননি, পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম ও ভারতের উলামায়ে কেরামও শারঈ দলিলের আলোকে আপত্তি তুলেছেন। দারুল উলূম দেওবন্দের দারুল ইফতার বাইরে মাযাহিরে উলূম সাহারানপুরের অসংখ্য আলেম, জামিয়া কাসিমিয়া শাহি মুরাদাবাদ, জামিয়া আরাবিয়া হাতুড়াবান্ধাও সা’দ সাহেবের এ ধরনের বয়ানগুলোকে ভুল অভিহিত করেছে। শুধু এ কারণেই বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম মাওলানা সা’দ সাহেবকে আমন্ত্রণ জানাননি। কারণ, তাঁরা, তার আপত্তিকর কথাগুলো থেকে বাংলাদেশি মুসলমানকে সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছেন। আর বাস্তবতা হলো, এটা তাঁদের শারঈ দায়িত্ব। যদি তাঁরা এ দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে তাঁদেরকে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মাওলানা সা’দ সাহেবের সঙ্গে বাংলাদেশি উলামায়ে কেরাম ও মাদরাসাসংশ্লিষ্ট মহলের কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, বৈরীতা ও হঠকারিতা নেই। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের ওপর যেই দায়িত্ব, তাঁরা নিজস্ব বিবেচনা অনুসারে সে দায়িত্ব পালন করেছেন।’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘আপনারা মাওলানা সাদ সাহেবের জন্যে দুআ করুন। উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম যখনই তাঁর ব্যাপারে আশ্বস্ত হবেন তখন বাংলাদেশের উলামায়ে কেরামও মাওলানা সা’দ সাহেবসমেত নিযামুদ্দিন মারকাযের সকল যিম্মাদারকে পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বাংলাদেশে ডেকে নেবেন এবং তাদের বয়ান-আলোচনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের উপকারিতার পথ খুলে দেবেন।’
মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক উর্দুতে লেখা এ পুস্তিকাটি ‘ইজতেমা ময়দানে সংঘাত: সাথীদের উদ্দেশে কিছু কথা’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
অনুবাদ প্রসঙ্গে মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, মূল বইটি প্রকাশ হবার পর ভারতের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম এর প্রশংসা করেন। দারুল উলুম দেওবন্দের উসতাদ মাওলানা আবদুল্লাহ মা’রেফি বইটি পড়ে বাংলায় এর অনুবাদ করার পরামর্শ দেন। সেই প্রেক্ষিতেই বইটি অনুবাদ করেন মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক।
বাংলাদেশে তাবলিগের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ওপর দেওবন্দ সম্প্রতি কোনো বক্তব্য দিয়েছে কি-না জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, দারুল উলুম দেওবন্দ একটি প্রতিষ্ঠান। তার কাজ হচ্ছে মৌলিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া। মাওলানা সা’দ সাহেব সম্পর্কে একটি দিকনির্দেশনা তারা দিয়ে রেখেছেন। ছোট ছোট যেকোনো বিষয়েই যে তাঁরা কথা বলবেন, বা তাঁদের বক্তব্য নিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু সাদপন্থীরা দেওবন্দের বক্তব্য কী, দেওবন্দ তো এ ব্যাপারে কিছু বলেনি—এরকম কিছু কথা বলে কথায় কথায় দেওবন্দ টেনে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। দেওবন্দ ছোট-খাটো বিষয়ে কখনও কথা বলে না, এবং বলবেও না। তাঁরা সা’দ সাহেব সম্পর্কে মৌলিক কিছু কথা বলে রেখেছেন, উলামায়ে কেরাম সে কথাগুলোর আলোকেই সা’দ সাহেবের বিভ্রান্তি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। এবং এটাই উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব।
