নির্বাচনের পরে বাংলাদেশ একটি নতুন জটিল সময়ের মুখোমুখি হবে: শরীফ মুহাম্মদ

তুহিন খান

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শেষ সময়ের প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচনী ডামাডোলে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। বাঙলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এই প্রথম, দলীয় সরকারের নেতৃত্বে দেশের প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক শক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় ইসলামি দলগুলোও অংশ নিচ্ছে এবারের নির্বাচনে।

নির্বাচনের আগে বেশ কিছু সময় ধরে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত ছিলো ইসলামি দল এবং দেশের আলেমসমাজকে কেন্দ্র করে। অনেকেই ভাবছিলেন, আলেমসমাজ এবারের রাজনীতিতে একটা ‘বিগ ফ্যাক্টর’ হতে যাচ্ছেন। কিন্তু মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পরে এই শেষ সময়ে এসে সেই ধারণায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে আলেমসমাজ কিছুটা ব্যাকফুটেই আছেন এখনও পর্যন্ত। এবং এই অস্বস্তিকর অবস্থা নির্বাচনের অব্যবহিত পরেও জারি থাকবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তা আলেমদের উপরে কতটা প্রভাব ফেলবে? এবারের নির্বাচনে, তুলনামূলকভাবে আলেমদের ভূমিকা কেমন ও কতটুকু? বিভিন্ন দলের ইশতেহারে আলেমসমাজ ও মাদ্রাসা কারিকুলামের ব্যাপারে যেসব কথাবার্তা এসেছে, তা কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক? এসব নিয়েই কথা হয়েছিলো বিশিষ্ট আলেম, লেখক ও ইসলাম টাইমস টোয়েন্টি ফোরের সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদের সাথে।

নির্বাচনের এই অন্তিম সময়ের প্রচার-প্রচারণার ভিত্তিতে, নির্বাচনের ফলাফল কেমন হতে পারে বলে মনে হয়? এ প্রশ্নের জবাবে শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘এটা এখনই ভেবে ফেলার বা ঠিক করে ফেলার দরকার নাই মনে হয়। এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে তো এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, প্রচার-প্রচারণা, আনুষাঙ্গিক সবকিছুই সরকারপক্ষের নিয়ন্ত্রণেই আছে। বিরোধী পক্ষ হামলা, মামলা, হুমকি-ধমকির উপরেই আছে, তাদের প্রচার-প্রচারণাও তুলনামূলক কম। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কথাটাও এবারই সবচাইতে বেশি ও জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। তাই প্রচার-প্রচারণার ভিত্তিতে আসলে কিছুই বলা যায় না। তবে, আমার ধারণা, এবারের নির্বাচনে ৪৮ ঘন্টাও ফ্যাক্ট হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ২৪ ঘন্টাও অনেক বড় ফ্যাক্ট হয়ে উঠতে পারে।’

এখন পর্যন্ত যে সামগ্রিক অবস্থা, সেই প্রেক্ষাপটে, এবারের নির্বাচনে আলেমদের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এ প্রশ্নের উত্তরে শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যা অবস্থা, তাতে আলেমদের খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন অবস্থান রয়েছে, এমন বলা যায় না। কোন কোন দলের সাথে তাদের জোটের প্রধান দল সঠিক আচরণ করে নাই, যারা বিরোধী পক্ষে আছেন তারা তো এমনিতেই নানা রকম হয়রানির শিকার। কিন্তু, এবারের নির্বাচনা, শুধু আলেম প্রার্থীরাই না, পুরো আলেমসমাজই, কেমন যেন ‘নট আ ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছেন, অন্তত রাজনৈতিক দলগুলোর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তাই বলে। এটা নতুন। এর আগে, ২০০১ বা ২০০৮ এর নির্বাচনেও, সিট বা প্রার্থী খুব বেশি হয়ত ছিল না, কিন্তু আলেমসমাজ একটা ‘ইস্যু’ ছিলেন। এবারেও, গত চার-পাঁচ মাস আগের অবস্থাও ভিন্ন ছিল, আলেমসমাজকে ঘিরেই একটা সময় রাজনীতির মূল অঙ্গন উত্তপ্ত ছিল। কিন্তু নমিনেশনের পরেপরেই এই অবস্থাটা কেমন যেন হুট করে বদলে গেলো। কেন এমন হলো, তা রাজনীতির নীতি-নির্ধারকরাই ভালো বলতে পারবেন।’

নির্বাচনে যে দলই জিতুক, আলেমদের সাথে বর্তমানে সরকার বা বিরোধীপক্ষের সম্পর্কের যে রসায়ন, নির্বাচনের ফলাফল এর উপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘ফলাফলটাই আসলে খুব পরিষ্কার না। নির্বাচনের ফলাফলটাই এবার বেশ কম্পলিকেটেড হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমার মূল্যায়ন হলো, এই নির্বাচনের পরে বাঙলাদেশ একটা নতুন জটিল সময়ে প্রবেশ করবে, তা যে পক্ষই জিতুক। এমনকি যদি সরকারপক্ষও জয়ী হয়, তবুও একদম নতুন ধরণের কিছু জটিলতা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হবে। আলেমসমাজের ব্যাপারটা এই নতুন অবস্থার সাথে একীভূত করেই দেখতে হবে। জটিলতার বাইরে তারাও থাকবেন না অবশ্যই।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বাকি স্তরগুলোকেও স্বীকৃতি দেওয়া এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারটা এসেছে। এটা নিয়ে নানা ধরণের আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ব্যাপারটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এর জবাবে শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘এটা প্রাক্টিকালি শুনতে একটু অন্যরকম শোনায় বটে, কিন্তু তারা এটা কোন দুরভিসন্ধি থেকে করেছেন বলে মনে হয় না। এই অবস্থায় সেটা তাদের করার কথাও না। কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারটা তো কওমি অঙ্গন থেকেই অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে, আকাবির-আসলাফদের লেখাপত্রে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়ার কথা আছে। কর্মসংস্থানের প্রশ্নটা স্বীকৃতির পরে আরো বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারা সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই এটা করেছেন বলে মনে হয়। আর বাকি স্তরগুলোর স্বীকৃতির ব্যাপারটা আসলে, একটা ভুল বোঝাবুঝি বা চিন্তার গ্যাপের কারণে তারা এভাবে বলেছেন। তারা ভেবেছেন, বাকি স্তরগুলোর স্বীকৃতিও তো ভালোই হবে আলেমদের জন্য। তবে এই প্রক্রিয়ায় যে জটিলতাগুলো আছে, সেগুলি নিয়ে তারা হয়ত ভাবেন নাই বা আলেমদের সাথে কথা বলার সুযোগ পান নাই। এজন্যই ব্যাপারটা তারা এমনভাবে বলেছেন যে, এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটা তারা কোন দুরভিসন্ধি থেকে করেছেন, এমন মনে হয় না।’

কিছু কিছু ব্যাপার এখনও ঝুলন্ত অবস্থায়ই আছে, যেমন, তাবলিগ ইস্যু অথবা স্বীকৃতির ব্যাপারটাই যদি বলি, সেটাও একরকম অস্পষ্টতার ভেতরেই আছে। নির্বাচনের ফলাফল এসব ইস্যুর উপরে প্রভাব ফেলবে কিনা? এর উত্তরে শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘ব্যাপারটা ক্রিটিকাল। রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের মুড ও মোটিফের উপর ব্যাপারগুলি নির্ভর করে। এখন পর্যন্ত আলেমদের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর যে সম্পর্ক, সেটা যদি নিছকই নির্বাচনী সম্পর্ক হয়, তাহলে তার প্রভাব নির্বাচনের পরে অবশ্যই দেখা তো যাবেই। আবার যদি লং টার্ম চিন্তা-ভাবনা দলগুলির থাকে, সেক্ষেত্রে তারা সেভাবেই সিদ্ধান্তগুলো নেবে। আলেমদের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক সাধারণত রাজনীতিকেন্দ্রিকই হয়, তার বাইরে লং টার্ম চিন্তা সাধারণত কোন দলই করে না। তবে এই না করা যে দলগুলোর জন্য আখেরে নেতিবাচকও হয়ে পারে, বিরোধীপক্ষ তা কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে। ফলে, এটা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত, তারা কী করবে।’

আগের সংবাদগ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে ইসির প্রতি আহ্বান ইসলামী আন্দোলনের
পরবর্তি সংবাদগাড়িবহরে হামলায় মাথা ফাটল বিএনপি-প্রার্থীর