স্বীকৃতি আসলেও রয়ে গেছে অনেক সংশয়

ওমর ফারুক

কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদে আইনটির অনুমোদন হওয়ার পর নতুন করে নড়েচড়ে বসেছেন আলেমসমাজ। অধিকাংশ আলেম ওলামা ও শিক্ষার্থীরা সরকারকে অভিনন্দন জানালেও আইনটির বিরোধিতা করছেন অনেকে। বিভিন্ন টিভি টকশোতেও তাদের স্বপক্ষের যুক্তি তুলে ধরতে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিরোধীদের সব কথা ঠিক হলেও স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে অনেক সংশয় থেকেই যাবে।

তাদের বিরোধিতার অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে, ‘মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্বীকৃতি না দিয়ে সরাসরি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদানের স্বীকৃতি তাদের চাকরি ক্ষেত্রে বড় কোনো সুযোগ এনে দিবে না।’

তবে চাকরি ক্ষেত্রে না হোক শুধু স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দিয়ে কওমি শিক্ষার্থীদের যে বড় একটি উদ্দেশ্য- বর্হিবিশ্বে পড়তে যাওয়া বা পিএইচডি অর্জন করা এসব উদ্দেশ্য পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হবে না বলে আশঙ্কা করছেন দেশের কওমি শিক্ষাবিদ ও কর্ণধাররাও। আবার তাদের অনেকেই মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে স্বীকৃতি দিলে কওমি শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য তা অর্জনে ঘাটতি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন। এ কারণেই নিচের শ্রেণিগুলোতে তারা সরকারি স্বীকৃতি দাবির বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

তবুও আশঙ্কা পিছু ছাড়ছে না বলে মনে করছেন রাজধানী মিরপুরের জামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কী এ আনন্দ বিষাদে পরিণত হবে না? এ নিশ্চয়তা হয়ত কেউ দিতে পারবে না। গুরুজনেরা বলে থাকেন, স্বাধীনতা লাভ করা থেকে রক্ষা করা কঠিন। সনদের এ মান যদি তথাকথিত মূলধারার শিক্ষার সাথে কওমী শিক্ষাকে একাকার করার একটি পদক্ষেপ হয়ে থাকে, তাহলে তো কওমীয়ানদের আমও গেল ছালাও গেল। শত বছর এখনো হয়নি। প্রবীনরা ভাল বলতে পারবেন, নিউ স্কিম মাদরাসাগুলোর স্কুলে পরিণত হওয়ার দুঃখজনক ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আজকে কওমি সনদের মান দিচ্ছে, সেই সংসদেই তো এক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কথা বলে সনদের মানের ধরণ পাল্টিয়ে দিতে পারে। ফলে কওমি দালানকোঠা থাকবে আর শিক্ষা হবে ইংরেজ প্রবর্তিত ব্যবস্থায়।’

তিনি বলেন, আমরা এমন হওয়ার প্রত্যাশা করি না। তবে কেন জানি অজানা আশংকা পিছ ছাড়ছে না।

স্বীকৃতির পরও বর্হিবিশ্বে পড়াশোনা বা ডিগ্রি আনতে হলে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি ইউসুফ সুলতান।

তিনি বলেন, কেউ পিএইচডির আবেদন করতে চাইলে মাস্টার্সের সার্টিফিকেট দাখিল করতে হয়। যা সংশ্লিষ্ট দেশের হাই কমিশন কর্তৃক সত্যায়িত করতে হয়। হাই কমিশন সত্যায়িত করে যদি ফরেইন মিনিস্ট্রি ও এডুকেশন মিনিস্ট্রি সত্যায়িত করে। এডুকেশন মিনিস্ট্রি সত্যায়িত করে যদি বিশ্ববিদ্যালয়টা ইউজিসি কর্তৃক নিবন্ধিত হয়। ইউজিসি কর্তৃক নিবন্ধিত হতে বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে প্রথমত। চক্রটা মোটামুটি এমন, কিছু কমবেশি থাকতে পারে। কাজেই ব্যাপারটা বাস্তবতার মুখ দেখা আরো সময়ের ব্যাপার।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত পিএইচডিতে আবেদনের ক্ষেত্রে মাস্টার্সের সার্টিফিকেটের পাশাপাশি থিসিসের প্রপোজাল ও পূর্বে পাবলিশকৃত পেপারের তথ্য সংযুক্ত করলে সুবিধা হয়। প্রপোজাল তো অনেক জায়গায় আবশ্যক। তাহলে কীভাবে সম্ভব? তিনি বলেন, কাজেই রিসার্চ মেথডলজি বা গবেষণার রীতিনীতি, এ বিষয়টা দাওরা বা এর আগে পরে যুক্ত করতে হবে। একই সাথে বর্তমান বিশ্বের জার্নালগুলোর সাথে পরিচিতি, পাবলিশের পথ ও পদ্ধতি ইত্যাদি জানতে হবে এবং আবশ্যিকভাবে কোনো সংক্ষিপ্ত পেপার লিখতে হবে। এত সব কিছু দাওরার এক বছরে সম্ভব না, দুই বছর হলে হতে পারে। স্বীকৃতির ব্যাপারটা অবশ্যই ইতিবাচক, তবে আমাদের ভেতরে বাইরে আরো প্রস্তুত হতে হবে সামনের পথ চলার জন্য।

একই রকম আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন সৌদি আরবে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মীযান হারুন। তিনি বলেন, সৌদিসহ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনার্সে ভর্তি হতে হলে এইচএসসি বা আলিমের সার্টিফিকেট লাগবে। মাস্টার্সে হতে হলে অনার্সের সার্টিফিকেট লাগবে। পিএইচডিতে হতে হলে মাস্টার্সের সার্টিফিকেট লাগবে। একাডেমিকভাবে দাওরার ভবিষ্যৎ কী তাহলে? উদাহরণত দাওরা দিয়ে আপনি সৌদির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনার্সে ভর্তি হতে পারবেন না। কারণ ওটা সেকেন্ডারি না, মাস্টার্স সমমান। আবার মাস্টার্সেও পারবেন না। কারণ ওটা অনার্সের সর্টিফিকেট না। আবার পিএচডিতেও পারবেন না। কারণ দাওরার একাডেমিক কোয়ালিফিকেশন আন্তর্জাতিক মাস্টার্সের রিকোয়ারমেন্ট উত্তীর্ণ না। তাহলে দেখা যাচ্ছে একাডেমিকভাবে আপনি অন্তত বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছুই করতে পারছেন না। এটাই আশঙ্কার বিষয়। এ সীমাবদ্ধতার কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য থেকেই যাচ্ছে।

তবে এ সীমবদ্ধতার থেকে বের হতে হলে স্বীকৃতি নিয়ে আরেকটু ভাবতে হবে। যেমন, এইচএসসি পর্যায়ে একটা অধ্যায় যোগ করতেই হবে। সেটা শরহে বেকায়া বা আগে পরে হলে ভালো। ওটা শেষ করে ফেললে ছাত্রদের সামনে পুরো পৃথিবীর দুয়ার খোলা থাকবে। দেশে-বিদেশে সকল জায়গার জ্ঞানের জগত উন্মুক্ত হবে। যদি আলিয়ার ফাজিল আর কামিলের মতো মিশকাত-দাওরাতে ছাত্র না পাওয়া ভয় থাকে, কিংবা ছাত্রদের পদস্খলনের ভয় থাকে তবে সেটার প্রতিরোধে অন্য ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক সব ডিঙিয়ে এক লাফে মাস্টার্স, এটার অন্যান্য বিভিন্ন উপকারিতা থাকলেও একাডেমিকভাবে ছাত্ররা মোটেও উপকৃত হবে না। ছাত্রদের আলিয়া ও স্কুলে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকবেই।

তিনি বলেন, দ্বিতীয় পথটা হচ্ছে সৌদি সরকারের সঙ্গে দাওরার মুআদালা (সমমান) করে ফেলা। আল হাইআতুল উলইয়ার অধীনে যেই দাওরা পরীক্ষা দেবে সৌদির যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সে আবেদন করতে পারবে, এমন একটা পদক্ষেপ নিলেই হয়। খুব সহজ। সৌদির পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা নেই। কিছু কিছু মাদরাসাতো প্রাইভেটভাবেও কাজটি করে ফেলেছে। এখন যদি কেবল বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলে জাতীয়ভাবে কাজটি করার উদ্যোগ নেয়া হয় তবে খুব সহজেই হয়ে যাবে ইনশআল্লাহ। এটা আমাদের উলামারা করবেন কি?