অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পাতায় বঙ্গবন্ধুর জীবনের খণ্ডচিত্র ও চিন্তা

ফাতেহ ডেস্ক :

“গোপালগঞ্জ শহরের কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি আমার আব্বাকে বলেছিলেন, আপনার ছেলে যা আরম্ভ করেছে তাতে তার জেল খাটতে হবে । তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে, তাকে এখনই বাধা দেন । আমার আব্বা যে উত্তর করেছিলেন তা আমি নিজে শুনেছিলাম । তিনি বলেছিলেন, “দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছে না; যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে; তাতে আমি দুঃখ পাব না । জীবন নষ্ট নাও তো হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দিব না । আমার মনে হয়, পাকিস্তান না আনতে পারলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না।”

অনেক সময় আব্বা আমার সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন । আমাকে প্রশ্ন করতেন, কেন পাকিস্তান চাই ? আমি আব্বার কথার উত্তর দিতাম । একদিনের কথা মনে আছে, আব্বা ও আমি রাত দুইটা পর্যন্ত রাজনীতির আলাপ করি । আব্বা আমার আলোচনা শুনে খুশি হলেন । শুধু বললেন, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তিগত আক্রমণ না করতে । একদিন আমার মা’ও আমাকে বলছিলেন, “বাবা যাহাই কর, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলিও না।” শেরে বাংলা মিছামিছিই ‘শেরে বাংলা’ হন নাই । বাংলার মাটিও তাঁকে ভালবেসে ফেলেছিল । যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি ।

একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন ? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন ? এই সমস্ত আলোচনা করেছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়ই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শুদ্ধা করতেন— দাঁড়িয়ে বললেন, “যাহা বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না । তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না । জিন্নাহ কে ? তার নামও তো শুনি নাই । আমাদের গরীবের বন্ধু হক সাহেব ।”

এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম । সোজাসুজি ভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না । কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে তাই বুঝালাম । শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে । অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে ।

কয়েকবার মার খাওয়ার পর আমাদের বক্তৃতার মোড় ঘুরিয়ে দিলাম । পূর্বে আমার দোষ ছিল, সোজাসুজি আক্রমণ করে বক্তৃতা করতাম । তার ফল বেশি ভাল হত না । উপকার করার চেয়ে অপকারই বেশি হত । জনসাধারণ দুঃখ পেতে পারে ভেবে দাবিটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করতাম । পাকিস্তান দু’ইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে । একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে— পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে । অন্যটা হবে হিন্দুস্তান । ওখানে হিন্দুরাই সংখ্যাগুরু থাকবে । তবে সমান নাগরিক অধিকার পাবে হিন্দুস্তানের মুসলমানরাও ।

আমার কাছে ভারতবর্ষের একটা ম্যাপ থাকত । আর হবীবুল্লাহ বাহার সাহেবের ‘পাকিস্তান’ বইটা এবং মুজিবুর রহমান খাঁ সাহেবও ‘পাকিস্তান’ নামে একটা বিস্তর বই লিখেছিলেন সেটা; এই দুইটা বই আমার প্রায় মুখস্তের মত ছিল । আজাদের কাটিংও আমার ব্যাগে থাকত ।

সিপাহি বিদ্রোহ এবং ওহাবি আন্দোলনের ইতিহাসও আমার জানা ছিল । কেমন করে ব্রিটিশরাজ মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল, কি করে রাতারাতি মুসলমানদের সর্বস্বান্ত করে হিন্দুদের সাহায্য করেছিল, মুসলমানরা ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারি, সিপাহির চাকরি থেকে কিভাবে বিতাড়িত হল — মুসলমানদের স্থান হিন্দুদের দ্বারা পূরণ করতে শুরু করেছিল ইংরেজরা কেন ? মুসলমানরা কিছুদিন পূর্বেও দেশ শাসন করেছে তাই ইংরেজকে গ্রহণ করতে পারে নাই । সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ করত । ওহাবি আন্দোলন কি করে শুরু করেছিল হাজার হাজার বাঙ্গালি মুজাহিদরা ?

বাংলাদেশ থেকে সমস্ত ভারতবর্ষ পায়ে হেঁটে সীমান্ত প্রদেশে যেয়ে জেহাদে শরিক হয়েছিলেন । তিতুমীরের জেহাদ, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফারায়জি আন্দোলন সমন্ধে আলোচনা করেই আমি পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস বলতাম । ভীষণভাবে হিন্দু বেনিয়া ও জমিনদারদের আক্রমণ করতাম । এর কারণও যথেষ্ট ছিল । একসাথে লেখাপড়া করতাম, একসাথে বল খেলতাম, একসাথে বেড়াতাম, বন্ধুত্ব ছিল হিন্দুদের অনেকের সাথে । আমার বংশও খুব সম্মান পেত হিন্দু মুসলমানদের কাছ থেকে । কিন্তু আমি যখন কোন হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, আমাকে অনেক সময় তাদের ঘরের মধ্যে নিতে সাহস করত না আমার সহপাঠীরা ।

একদিনের একটা ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল, আজও সেটা ভুলি নাই । আমার এক বন্ধু ছিল ননীকুমার দাস । একসাথে পড়তাম, কাছাকাছি বাসা ছিল, দিনভরই আমাদের বাসায় কাটাত এবং গোপনে আমার সাথে খেত । ও ওর কাকার বাড়িতে থাকত । একদিন ওদের বাড়িতে যাই । ও আমাকে ওদের থাকার ঘরে নিয়ে বসায় । ওর কাকীমাও আমাকে খুব ভালবাসত । আমি চলে আসার কিছু সময় পরে ননী কাঁদো কাঁদো অবস্থায় আমার বাসায় এসে হাজির । আমি বললাম ‘ননী কি হয়েছে?” ননী আমাকে বলল, “তুই আর আমার বাসায় যাস না । কারণ তুই চলে আসার পর কাকীমা আমাকে খুব বকেছে তোকে ঘরে আনার জন্য এবং সমস্ত ঘর আবার পরিষ্কার করেছে পানি দিয়ে ও আমাকেও ঘর ধুতে বাধ্য করেছে ।” আমি বললাম, “যাব না, তুই আসিস।” আরও অনেক হিন্দু ছেলেদের বাড়িতে গিয়েছি, কিন্তু কোন সহপাঠীরা আমাকে কোনদিন একথা বলে নাই । অনেকের মা ও বাবা আমাকে আদরও করেছেন ।

এই ধরনের ব্যবহারের জন্য জাতক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে বাঙ্গালি মুসলমান যুবকদের ও ছাত্রদের মধ্যে । শহরে এসেই এই ব্যবহার দেখেছি । কারণ আমাদের বাড়িতে হিন্দুরা যারা আসত প্রায় সকলেই আমাদের শ্রদ্ধা করত । হিন্দুদের কয়েকটা গ্রামও ছিল, যেগুলির বাসিন্দারা আমাদের বংশের কোনো না কোনো শরিকের প্রজা ছিল ।

হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচারেও বাংলার মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন । তাই মুসলমানরা ইংরেজদের সাথে অসহযোগ করেছিল । তাদের ভাষা শিখবে না, তাদের চাকরি নেবে না, এই সকল করেই মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল । আর হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ইংরেজকে তোষামোদ করে অনেকটা উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়েছিল । যখন আবার হিন্দুরা ইংরেজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন অনেকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে মরতে দ্বিধা করে নাই । জীবনভর কারাজীবন ভোগ করেছে, ইংরেজকে তাড়াবার জন্য । এই সময় যদি এই সকল নিঃস্বার্থ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী পুরুষরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে সাথে হিন্দু ও মুসলমানদের মিলনের চেষ্টা করতেন এবং মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমিদার ও বেনিয়ারা করেছিল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন, তাহলে তিক্ততা এত বাড়ত না ।

হিন্দু নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজী সুভাষ বসু এ ব্যাপারটা বুঝেছিলেন, তাই তাঁরা অনেক সময় হিন্দুদের হুঁশিয়ার করেছিলেন । কবিগুরুও তাঁর লেখার ভেতর দিয়ে হিন্দুদের সাবধান করেছেন । একথাও সত্য, মুসলমান জমিদার ও তালুকদাররা হিন্দু প্রজাদের সঙ্গে একই রকম খারাপ ব্যবহার করত হিন্দু হিসাবে নয়, প্রজা হিসাবে । এই সময় যখনই কোনো মুসলমান নেতা মুসলমানদের জন্য ন্যায্য অধিকার দাবি করত তখনই দেখা যেত হিন্দুদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত, এমনকি গুণী সম্প্রদায়ও চিৎকার করে বাধা দিতেন । মুসলমান নেতারাও ‘পাকিস্তান’ সম্বন্ধে আলোচনা ও বক্তৃতা শুরু করার পূর্বে হিন্দুদের বিরুদ্ধে গালি দিয়ে শুরু করতেন । এই সময় আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করেন এবং নতুনভাবে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে পাকিস্তান দাবি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু মুসলমানদের মিলানোর জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বাস করতে পারে তারই জন্য । তিনি আমাদের কিছু সংখ্যক কর্মীকে বেছে নিয়েছিলেন, তাদের নিয়ে রাতে আলোচনা সভা করতেন মুসলিম লীগ অফিসে ।

হাশিম সাহেব পূর্বে বর্ধমান থাকতেন, সেখান থেকে মুসলিম লীগ অফিসে একটা রুমে এসে থাকতেন, কলকাতায় আসলে । মুসলিম লীগ অফিসটা শহীদ সাহেব ভাড়া নিয়েছিলেন । তাঁকেই ভাড়া দিতে হয়েছে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত । হাশিম সাহেব আমাদের বললেন, একটা লাইব্রেরি করতে হবে, তোমাদের লেখাপড়া করতে হবে । শুধু হিন্দুদের গালাগালি করলে পাকিস্তান আসবে না । আমি ছিলাম শহীদ সাহেবের ভক্ত । হাশিম সাহেব শহীদ সাহেবের ভক্ত ছিলেন বলে আমিও তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম, তাঁর হুকুম মানতাম । হাশিম সাহেবও শহীদ সাহেবের হুকুম ছাড়া কিছু করতেন না । মুসলিম লীগের ফান্ড ও অর্থ মানে শহীদ সাহেবের পকেটে । টাকা পয়সা তাঁকেই জোগাড় করতে হত । সে সম্বন্ধে পরে আলোচনা করতে হবে । গ্রাম থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে । উপরের তলার প্রতিষ্ঠান করলে চলবে না । জমিদারদের পকেট থেকে প্রতিষ্ঠানকে বের করতে হবে । শহীদ সাহেবের সাথে পরামর্শ করে সমস্ত বাংলাদেশ ঘুরতে আরম্ভ করলেন । চমৎকার বক্তৃতা করতেন । ভাষার উপর দখল ছিল । ইংরেজি বাংলা দুই ভাষায় বক্তৃতা করতে পারতেন সুন্দরভাবে ।”

আগের সংবাদস্বীকৃতি আসলেও রয়ে গেছে অনেক সংশয়
পরবর্তি সংবাদইসরাইলে মিলল উসমানী খিলাফতের কারখানা