শহর ও গ্রামের ঈদ, মিল ও অমিল

কাজী মাহবুবুর রহমান ঃ 

আমাদের শহুরে নাগরিক জীবনের সুখ ও আনন্দের সঙ্গে গ্রামীন আনন্দের একটি বড় ফারাক আছে৷ আমরা শহরের মানুষ যা কিছু করে আনন্দ পাই, গ্রামের মানুষ হয়ত তা বুঝতেই পারবে না৷ কিংবা আমরা যেসব কষ্ট ও টানাপোড়েনে ব্যথিত হই, তাদেরকে হয়ত সেসব স্পর্শই করবে না।

প্রতিবছর আমাদের মাঝে অবারিত আনন্দের ধারা নিয়ে দুটি ঈদ নেমে আসে৷ ঈদ কেন্দ্রিক আমাদের আনন্দগুলিও দুই ধরণের ৷ শহরে যা আছে গ্রামে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তার লেশমাত্র নেই। শহরের ছেলেদের কুরবানী ঈদে কুরবানীর পশু, বিশেষত গরু নিয়ে তুমুল উন্মাদনা থাকে। এরা দলবেধে হাটে যায়। নিজেদের গরু কেনা হবে যেদিন, সেদিনও যায়। আত্মীয় স্বজন বন্ধুদের গরু কিনতেও সবাই একসঙ্গে যায়।

ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে প্রতিদিন শত শত গরুর ছবি আপলোড হয়। ফেসবুকে কার কোন গরু, কেমন দাম হল, এই সংক্রান্ত বিশয় আশয় নিয়ে শত শত গ্রুপ খোলা হয়। এর সঙ্গে জড়িত সব শহুরে ছেলেরাই। এদের আনন্দ উন্মাদনার ধরণ আলাদা। আপাতত এসব হাস্যকর মনে হলেও কুরবানীর পশুর প্রতি এমন মমতা দেখতে ভাল লাগে।

ঈদের দিনটা শুরু হয় অন্যরকম প্রস্তুতি নিয়ে। তেজগাঁয়ে থাকাকালীন কিছু বন্ধু জুটেছিল। ওদের ঈদের দিনের গল্প শুনতাম। ছবি তুলে পাঠাত। ওরা নামাজের আগেই পুরো গলির কোন গরুটা কখন জবাই করা হবে তা খবর নিত৷ এদের কথা ছিল, গরু যা যা-ই করা হোক, জবাই করার সময় আমরা ধরব৷ এভাবে দল বেধে গরু ধরার ভেতর কী আনন্দ তা আমরা গ্রামে বড় হওয়া ছেলেরা কিছুতেই বুঝবনা৷

গ্রামে কুরবানী পরিমাণে অনেক কম হয়। এটাই স্বাভাবিক৷ তবে কম হওয়ার কিছু জটিলতাও আছে৷ কার গরু কত বড়, কার গরুর দাম বেশী, কেমন মাংস হবে, এসব নিয়ে শহরে কথাবার্তা কম বলতে শুনেছি। শহরে তো কেউ কারোর দিকে ফিরে তাকানোরও অবসর নেই। এই কারণেই হয়ত এমন হবে। কিন্তু গ্রামের কুরবানীর ঈদে এসব কথাই বেশী শোনা যায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে এই বিষয়ে কোন কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ। অবস্থাভেদে কুরবানী নষ্ট হয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা আছে।

গ্রামের ছেলেমেয়েদের প্রধান আনন্দ হচ্ছে ঈদুল ফিতরের। কুরবানীর ঈদেরও কিছু নির্মল আনন্দের কথা মনে পড়ে৷ গরু জবাই ও মাংস তৈরী করা শেষ হলে বাড়ি থেকে মা আমাদেরকে হাতে মাংসের ব্যাগ দিয়ে দূরে দূরে চেনা অচেনা সব আত্মীয়দের বাড়ি পাঠাতেন। সারাবছর যাদের সঙ্গে একবারও দেখা হত না, ঈদ উপলক্ষ্যে তাদের দরজায় উপহার নিয়ে দাড়াতাম৷ এই ভালবাসা চিরকাল মনে রাখার মত। আমাদের এই আনন্দগুলি আরো বহুবিধ ডালপালাসহ বেচে থাকুক চিরদিন৷

আগের সংবাদকুরবানীর হুকুম
পরবর্তি সংবাদকুরবানীর চামড়ার মূল্যহ্রাসের প্রেক্ষিতে মাদরাসাগুলো কি ভাবছে?