সম্মিলিত সংগ্রাম  পরিষদের তৎপরতা

ওয়ালি উল্লাহ আরমান 

একদিকে যুদ্ধাপরাধীর বিচার এবং ঘাতক দালাল নির্মূলের নামে দেশের ইসলামবিদ্বেষী ও ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবিচক্র প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু করে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাদানিক) নামে চিহ্নিত মহল সমাজে বিভক্তি, অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য তৎপরতা চালাতে থাকে। একই সাথে দৈনিক জনকণ্ঠ, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, নাস্তিককুলের গুরু ড. আহমদ শরীফ এবং বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন সমান্তরালে ইসলামের মূলে কুঠারাঘাত করতে থাকে।

এ অপতৎপরতা মোকাবেলায় ১৯৯৪-এর শুরুতে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক রহ.-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ। যেখানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ব্যতীত অপরাপর ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল, মুসলিম লীগ, আনোয়ার জাহিদ ও শফিউল আলম প্রধানের সংগঠন, জামায়াতপ্রভাবিত সম্মিলিত ওলামা-মাশায়েখ পরিষদ ও আহলে হাদিস যুব পরিষদ সংগঠনগুলি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

ইসলামী ঐক্যজোটের নির্লিপ্ততা :

কিন্তু ইসলামী ঐক্যজোট চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদে আসেননি। সে কারণে ইসলামী ঐক্যজোটভুক্ত দলগুলি নিজ নিজ দলের নামে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদে যুক্ত হয়।

ওই সময় সচেতন ও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকেই এখনো সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ প্রসঙ্গে আলোচনা-পর্যালোচনায় আক্ষেপ করে বলেন, মজলিস নেতৃবৃন্দ তাদের আমির শায়খুল হাদিস রহ.-কে মিসগাইড করে সংগ্রাম পরিষদ থেকে বিরত রাখেন। তারা ভাবছিলেন, নতুন প্লাটফর্ম হলে তাদের আমিরের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। যদিও বাস্তবতা মোটেও এমন ছিল না। সম্ভবত এটাকেই কায়েমী স্বার্থবাদিতা বলে, যা ব্যক্তি সমাজ সংগঠন কারো জন্যই কল্যাণকর নয়। এই বাস্তব, অপ্রয়োজনীয় এবং অদূরদর্শী ভাবনা ইসলামী ঐক্যজোটের মাঝে একটা ছোট্ট গ্যাপ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে।

উত্তাল সারাদেশ :

১৯৯৪ এর মে-জুন মাসে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচিতে রাজধানী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজধানীর বিভিন্ন স্পট অবরোধের দায়িত্বে থাকা পরিষদের কর্মীদের উপর বিএনপি সরকারের পুলিশ বাহিনীর নির্লিপ্ততায় ঘাদানিকের ব্যানারে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বর্বরোচিত হামলা চালায়। মিরপুর মাজার রোডে অবরোধ শেষে জমিয়ত নেতাকর্মীদের উপর ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হামলা চালিয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র জমিয়ত সভাপতি মুফতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু নেতাকর্মীকে আহত করে।

বৃহত্তর মিরপুরের আলেম উলামারা মিরপুর এক নং চত্বরে মিছিল শেষে সমাবেশে মিলিত হয়। একটি মার্কেটের ছাদ থেকে সমাবেশে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে সমবেতরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সংগ্রাম পরিষদের কিছু কর্মী আহত হয় যাদের মধ্যে আমি এবং আরজাবাদ মাদ্রাসার বর্তমান শিক্ষক মাওলানা  শারফুদ্দীন ইয়াহইয়া কাসেমীও ছিল।

এর ক’দিন পর জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ শেষে আমরা বায়তুল মোকাররমে মাগরিব নামাজ পড়তে যাই। ইত্যবসরে একদল ঘাদানিক ক্যাডার আমাদের স্টেজে আগুন ধরিয়ে দেয়। মাগরিব নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় ঘাদানিক এবং ছাত্র ও যুবলীগ ক্যাডাররা স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশ, হোটেল ইম্পেরিয়াল-এর সামনে এবং জিপিওর মোড়, এই তিনদিক থেকে আমাদের উপর আক্রমণ করে। মুখোমুখি সংঘর্ষে আমাদের অনেকের রক্ত ঝরে। কিন্তু আমাদের দিক থেকে প্রবল বিক্রমে প্রতিরোধের মুখে লীগ ক্যাডাররা গুলিস্তানের দিকে পালিয়ে যায়। স্পষ্ট মনে আছে প্রেসক্লাবের সামনে আমাদের স্টেজে অগ্নিসংযোগ এবং বায়তুল মুকাররম দক্ষিণ গেটে সংঘবদ্ধ হামলার সময় পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল।

এর কিছুদিন পর ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সচিবালয় অবরোধ করা হয়। আমরা শাহবাগ মৎস্য ভবন এলাকা ঘেরাও করি। সেদিন রক্তে আগুন-ধরানো স্লোগান এখনো আমাদের কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হয় “লাখো শহীদ ডাক পাঠালো সব সাথীদের খবর দে, সারা বাংলা ঘেরাও করে নাস্তিকদের কবর দে!” পুলিশের গাড়ি আটকাতে দুর্দমনীয় তারুণ্যের স্পর্ধিত দুঃসাহসে মৎস্য ভবনের সামনে আমরা খালি গায়ে রাস্তায় শুয়ে পড়ে বলেছিলাম, ‘গাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে আমাদের উপর দিয়ে যেতে হবে।’

হঠাৎ খতিব সাহেবের লন্ডন গমন :

নিতান্ত আফসোস আর পরিতাপের সাথে বলতে হয়, আন্দোলন জমে উঠতেই সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের আমির খতিব উবায়দুল হক রহ. রহস্যজনক ও অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ লন্ডন পাড়ি জমান, ঠিক যেভাবে আগের বছর তাহাফফুজে খতমে নবুয়তের উত্তাল আন্দোলনের সময় কোন কোন নেতার শেষ মুহূর্তে নিষ্ক্রিয়তা এবং আপসকামিতা কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

সংগ্রাম পরিষদের নতুন সভাপতি :

হতাশা আর নানা গুজব ও কানাঘুষার মাঝেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সংগ্রাম পরিষদ স্টিয়ারিং কমিটির জোর অনুরোধে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন আমির, পীরসাহেব চরমোনাই মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.। ইসলামপ্রেমী জনতার ক্ষোভের মুখে বিএনপি সরকার রাতের আঁধারে ইসলামবিদ্বেষী বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে বিদেশ চলে যেতে সহায়তা করে।

কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হচ্ছে, এদেশের ইসলামী রাজনীতি ও চেতনার গতানুগতিক ধারা অনুসারে আস্তে আস্তে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে আসতে থাকে।

১৯৯৫ সালের কিছুদিন তৎকালীন জমিয়তের নির্বাহী সভাপতি মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. এবং ওই সময় নির্দলীয় আলেম আল্লামা নূর হোসেন কাসেমীর নেতৃত্বে ‘ঈমান বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ আন্দোলন নামে নাস্তিক-মুরতাদবিরোধী প্ল্যাটফর্ম কাজ করে। আমার যতটুকু মনে পড়ছে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সেই প্রথম মাদ্রাসার আঙ্গিনা ছেড়ে সরাসরি কোনো ব্যানারে রাজপথে নেমে আসেন। এই নেমে আসাটাই তাকে এক বছর পর ১৯৯৬ সালে জমিয়তের ব্যানারে সরাসরি রাজনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত হতে সহায়তা করে।

এই ছোট্ট ভূখণ্ডে ভিন্ন ভিন্ন মত-পথ এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংগঠনগুলোর নির্দিষ্ট কিছু বিষয় এবং দাবি-দাওয়া নিয়ে অভিন্ন প্লাটফর্মে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি তখনও ছিল না, এখনও নেই, ভবিষ্যতে হবে কি না জানিনা। প্রমাণ হিসেবে খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত, সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি এবং সর্বশেষ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর উদাহরণ সামনে আনা যায়।

পরের কিস্তি : সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদকে কেন্দ্র করে ইসলামী ঐক্যজোটে অস্বস্তি, মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব।

প্রথম কিস্তি : ফিরে দেখা নব্বই দশক : উত্তাল সময় 

দ্বিতীয় কিস্তি :  ইসলামী ঐক্যজোট: ঐক্যের নতুন প্লাটফর্ম

লেখক : আলেম, রাজনীতিবিদ