বিদেশী কর্মী ছাটাই থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন, সৌদিতে কি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে?

হামমাদ রাগিব

সম্প্রতি সৌদি আরবে কর্মরত কিছু রোহিঙ্গা শ্রমিককে অবৈধভাবে সেখানে কাজ করার অভিযোগে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি সরকার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি থেকে বিদেশি কর্মী ছাটাইয়ের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে গেল কয়েক বছর ধরে, তারই অংশ এই উদ্যোগ।

অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের মতো সৌদি আরবেও মুসলিম বিশ্বের গরিব দেশগুলোর প্রচুর শ্রমিক কাজ করেন। গত কয়েক বছর ধরে এই সমস্ত শ্রমিকের ওপর নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করে তাদেরকে সৌদি আরব ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি এদের মধ্য থেকে মোটামুটি ভালো পজিশনেও যারা চাকরি করছেন, তাদের ওপরও নেমে এসেছে অনুরূপ আইনের খড়গ। ফলে নতুন প্রবাসীদের জন্য নতুন কোনো কাজের সুযোগ যেমন বন্ধ, তেম্নি পুরনোরাও ভুগছেন চরম অনিশ্চয়তায়। অনেকে একে সৌদি জাতীয়তাবাদের উত্থান হিসেবেও দেখছেন।

এ বিষয়ে মতামত জানতে চেয়ে কথা বলেছিলাম মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট, বিশিষ্ট আরবি ভাষাবিদ মাওলানা মহিউদ্দীন ফারুকীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে তাদের প্রচুর যুবক বেকারত্বে ভুগছে। এ সমস্যা দূর করার জন্যই মূলত প্রবাসী কর্মীদের ওপর কড়াকড়ি করা হচ্ছে। রাষ্ট্র যেহেতু তাদের, তাই তারা চাইবে নিজের রাষ্ট্রের যুবকরা কাজে লাগুক। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাইরের যারা সেখানে কাজ করছিলেন, তাদের বিদায়ের পদ্ধতিটা পরিকল্পিত এবং সুন্দর করতে পারেনি সৌদি। কর্মীদের অনেককেই তারা কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই দেশ থেকে বের করে দিচ্ছে। তাই ব্যাপারটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও যেটা খুব একটা ভালো দেখায় না।’

বর্তমান সৌদি যুবরাজ—যিনি কার্যত সৌদি রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী—মুহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগেই এগুলো হচ্ছে, এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাওলানা মহিউদ্দীন ফারুকী বলেন, ‘হ্যাঁ, মুহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বেই এসব হচ্ছে। তিনি যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন, অনেকের প্রত্যাশা ছিল কিছু একটা তিনি করবেন মুসলিম উম্মাহর জন্য। সে হিসেবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের কেউ কেউ তৃতীয় মুহাম্মদ ইত্যাদি উপাধী দিয়ে তাঁকে নিয়ে অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। মুহাম্মাদ বিন সালমানও ভিশন টু থাউজেন থারটি নামে সৌদিতে আমূল সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সে উদ্যোগেরই ধারাবাহিকতা প্রবাসী কর্মীদের ওপর পীড়ন। ফলে যারা আশা করেছিলেন মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে তিনি পরিবর্তন সাধন করবেন, তাদের আশার গুড়ে বালি পড়েছে। কারণ তিনি পরিবর্তনে হাত দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে।’

পশ্চিমা দেশগুলোতে যেভাবে অভিবাসন-বিরোধী মানসিকতা নিয়ে একধরনের জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে, তার ঢেউ কি সৌদিতে এসেও লেগেছে? সৌদি যেভাবে কেবল সৌদিদের জন্য হচ্ছে, সে প্রেক্ষিতে মুসলিম উম্মাহ প্রশ্নের মীমাংসা কীভাবে করা হবে? আমরা দেখছি, পশ্চিমা দেশগুলোতে নাগরিক হবার তুলনায় সৌদির নাগরিক হওয়া কঠিন, সৌদি ও পার্শ্ববর্তী আরবরা বাইরের কারো সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কেও যুক্ত হয় না, এর দায় শুধু সৌদি সরকারি নীতির, নাকি সৌদি প্রভাবিত ইসলামি চিন্তা বা সংস্কৃতিতেও সমস্যা আছে? ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পক্ষ থেকে এমন কিছু প্রশ্ন রাখা হয়েছিল সৌদি আরবে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি তরুণ আলেম ও লেখক মীযান হারুনের কাছে।

জবাবে মীযান হারুন বলেন, ‘প্রথমেই যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা মীমাংসা করে নিতে হবে সেটা হলো, এখন এখানের আলেমদের মুখ একেবারেই বন্ধ বলা চলে। সব জায়গা থেকে তাদের যতটুকু কর্তৃত্বও ছিল সেটা কেড়ে নেয়া হচ্ছে। হাইআতুল আমরি বিল মা’রূফ ওয়ান নাহয়ি আনিল মুনকারের মতো শক্তিশালী সংস্থাকে বিলকুল পঙ্গু বানিয়ে দেয়া হয়েছে। জেল আলেমদের দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। বাজার, লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন জায়গা নারী-পুরুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সব জায়গায় তাদের চাকুরিতে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে— এসব ক্ষেত্রে আলেমদের বলার কিছু নেই। আলেমদেরকে বলা হয়েছে, দরস, তাদরিস, দাওয়াত নিয়ে থাকতে। যে কারণে এ ব্যাপারে তাদের প্রকাশ্যে কিছুই বলার সুযোগ নেই।’

রোহিঙ্গা বিতাড়ন ও প্রবাসী কর্মী ছাটাই বিষয়ে মীযান হারুন বলেন, রোহিঙ্গা বিতাড়নের সংবাদ আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয়নি। তবে এখানে রোহিঙ্গাদের ইমেজ কিংবা কাজকর্ম কোনোটাই সুখকর নয়। তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশন নিলে সেটার ঢালাও বিরোধিতার সুযোগ কম।

‘কর্মী ছাটাই ইস্যুটি আপনি-আমি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত পার্সেন্টে সৌদিদের নিয়োগ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই কোটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন পেশায় বিদেশিদের কাজ করতে নিষেধাজ্ঞা আসছে। আপনি এটাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

‘সৌদি জনসংখ্যা দিনে দিনে প্রচুর বাড়ছে। প্রত্যেকটা পরিবারেই বাচ্চাদের সংখ্যা অনেক বেশি। এ তুলনায় কাজের সুযোগ কম। যার কারণে বেকারত্ব বাড়ছে। তাছাড়া কোনো একটা দেশে এত পরিমাণ বিদেশি লোক থাকা আশ্চর্যই বটে। বিদেশি লোকেরা বড় বড় চাকুরি করছে, টাকা নিচ্ছে, আর নিজেদের বেকার যুবকদের সংখ্যা বাড়ছে, এটা যে কোনো সরকারের জন্য মাথা ব্যথার কারণ। এই ভিত্তিতেই সৌদি সরকার সৌদিকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এটাকে সরকার জাতীয়তা হিসেবে নিচ্ছে না। জনগণও এটাকে বিদেশিদের প্রতি বৈষম্য হিসেবে না দেখে স্বাভাবিক বিকাশ হিসেবে দেখছে। আলেমগণও এটাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও সময়ের বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন। ফলে এটা নিয়ে তারা প্রতিবাদের কথা ভাবছেন না।’

সৌদি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রবাসী এই শিক্ষার্থী আলেম বলেন, ‘আসলে আমি ব্যক্তিগতভাবে কাজের ক্ষেত্রে সৌদিকরণ আর জাতীয়তাবাদ দু’টোকে ভিন্ন বিষয় হিসেবে দেখছি। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখানে বিদেশিদের সংখ্যা খুব বেশি, তাদের জনসংখ্যা বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, অপরদিকে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই তারা কাজের সুযোগ চাইবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে প্রচুর বিদেশি শিক্ষক ছিলেন। এখন সেটা শতকরা ২/৩ ভাগ। কারণ কী? কারণ শিক্ষিত সৌদিরা ঘুরে বেড়াবে, আর বিদেশিরা চাকুরি করবে, এটা কোনো দেশের জনগণ মানবে?

‘অবশ্যি সৌদিসৌদিকরণ প্রক্রিয়ার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলামি বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ প্রকাশ পেয়েছে। উদাহরণত কাজ না করে কেবল সৌদি হওয়ার কারণে বেতন নেয়া। আলেমগণ এটার বিরোধিতা করেছেন।

‘বিয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জটিলতা হয় বিধায় সামাজিক একটা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু তারপরেও বিয়ের ঘটনা ঘটছে। এটাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। সমস্যা হচ্ছে বিধায় আলেমগণও এই মৌন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কথা বলেন না।

‘শেষে একটি কথা, সৌদিরা বিদেশিদের যথেষ্ট সমীহ করে। এটাই স্বাভাবিক চিত্র এদেশের। মুসলিম উম্মাহ হিসেবে প্রত্যেক দেশের মুসলিমকে সৌদি সমাজের মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। জাতীয়তাবাদ কিংবা জাতিগত কোনো বৈষম্যের কোনো চিত্র আমার দৃষ্টিতে কখনো আসেনি। ব্যতিক্রম ব্যতিক্রমই। বিদেশিদের প্রতি উদারতা, দীন কেন্দ্রিক ভালোবাসা, সহমর্মিতার যে চিত্র এখনও এদেশে প্রতিদিন দেখে চলেছি, সেটা আমাদের দেশে বিরল।

‘নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাদের সিস্টেমকে আমার কাছে বিকলাঙ্গ ও বাড়াবাড়ি মনে হয়। প্রায় সব আরব দেশগুলোর কাছাকাছি অবস্থা। আমার ধারণা এটা পারস্পরিক অনাস্থা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক দুর্বলতার ফল। সৌদি আরব ডুয়েল সিটিজেনশিপ গ্রহণ করে না। ফলে কোনো সৌদিও বাইরের দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারে না। বাইরের লোকদের নাগরিকত্ব দিলে দেশে জটিলতার আশংকা করে হয়তো তারা। আমার ধারণা, গণতান্ত্রিক ধারার দেশগুলোতে বিদেশীদের নাগরিকত্বের বিষয়টি যতটা সহজ রাজতন্ত্রে ততটা জটিল।

‘বিরোধিতার প্রসঙ্গ আসত, যদি নিষিদ্ধ হতো। ব্যাপারটা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু সংকুচিত। কিছুদিন আগেও বেশ কিছু সংখ্যক লোককে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্ত ওই যে বললাম, অনুমতি রেখেও আইনের মারপ্যাচে সংকুচিত করে রাখা হয়েছে! এর কারণে যে কেউ চাইলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে, কিন্তু তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না।’

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদগাইবান্ধা-৩ থেকে সরে দাঁড়ালো ঐক্যফ্রন্ট
পরবর্তি সংবাদসংরক্ষিত আসনে ভোটের তফসিল আগামী সপ্তাহে