
মুসান্না মেহবুব:
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী জমিয়ত নেতা মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে সমর্থন দিয়েছেন স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। গতকাল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মধ্যে সিলেটে এক সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক থেকে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে সমর্থন জানায়।
মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক জামায়াতে ইসলামীর কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদির ‘ভ্রান্ত আকিদা’র ওপর লিখিত তাঁর একাধিক বই আছে বাজারে। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি জামায়াতের ভ্রান্তি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করে দলটিকে ‘ভ্রান্ত ফেরকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ঐতিহাসিকভাবেও বিরোধ আছে। ২০০১ থেকে বিএনপির সঙ্গে উভয় জোট এক সঙ্গে গাঁট ছড়া বাঁধলেও সরাসরি এভাবে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে সমর্থন জানায়নি কখনও।
গতকালের বৈঠকে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক তাঁর বক্তব্যে জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দেশ ও ইসলামের স্বার্থে আমাকে সাহায্য করুন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির সুযোগ নেয় ইসলাম-বিরোধী শক্তিগুলো। অতএব অতীতের সব মনোমালিন্য ভুলে গিয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
তাঁর এ বক্তব্য এবং জামায়াতের সমর্থন নিয়ে একটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে গতকাল থেকে। ইসলামি ঘরানার অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, জীবনভর জামায়াতকে ‘ইসলাম বহির্ভূত দল’ এবং ‘ভ্রান্ত ফেরকা’ আখ্যা দিয়ে এসে এখন কেন জামায়াতকে ‘ইসলামি দল’ বলা হচ্ছে আর তাদের সমর্থন চাওয়া হচ্ছে?
সিলেটের বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সৈয়দ মবনু এ ব্যাপারে আপত্তি তুলে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, ‘মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেব জামায়াত-প্রশ্নে এতদিন একটা আদর্শের ওপর অটল ছিলেন, মানুষকে জামায়াতের ভ্রান্তির ব্যাপারে সচেতন করেছেন এতকাল, আজ নির্বাচনে এসে জামায়াতের সমর্থন প্রত্যাশা করে এবং নিয়ে তাঁর সে আদর্শের ওপর কতটা অটল থাকতে পারলেন? আমি মনে করি নির্বাচন ও রাজনীতির জন্য নিজের আদর্শ থেকে সরে আসা ঠিক না।’
তবে দৈনিক সিলেটের ডাক-এর সাহিত্য সম্পাদক সাংবাদিক ফায়যুর রাহমান ব্যাপারটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। তাঁর মতে, কানাইঘাট-জকিগঞ্জ এলাকা আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখের ঘাঁটি। ইসলামি ঘরানার ভোট হিসাব করলে তিন ধরনের সমীকরণ আসে। এক. দেওবন্দি ঘরানার ভোট। দুই. ফুলতলি ঘরানার ভোট। তিন. মওদুদি ঘরানা তথা জামায়াতের ভোট। প্রথম দুই ঘরানার ভোট উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের বাক্সেই পড়বে। তবে জামায়াতের ভোট নিয়ে একটা শঙ্কা ছিল, কারণ, উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেব জীবনভর এ ‘ভ্রান্ত ফেরকা’র বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করেছেন। গতকাল সব বিভেদ ভুলে তাঁকে জামায়াতের সমর্থন দেওয়ায় শঙ্কাটা খানিক দূর হলেও পুরোপুরি দূর হয়নি। কারণ, জামায়াত তাদের সঙ্গে করা উবায়দুল্লাহ ফারুক সাহেবের বিরোধিতা এত সহজে ভুলে যাবার নয়। সমর্থন সত্ত্বেও তারা তাঁকে একটা ‘শিক্ষা’ দেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে।
মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে জামায়াতের সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের কথা হয় তাঁর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মাওলানা বিলাল আহমদ ইমরানের সঙ্গে। ঐতিহাসিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও জামায়াতের সঙ্গে তাঁরা কীভাবে সমঝোতা করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে বিরোধ তো বিরোধের জায়গায়ই আছে। আমরা জামায়াত প্রশ্নে আমাদের আদর্শ ও বিশ্বাস থেকে কখনো সরিনি, সরবও না। তবে বৃহৎ কল্যাণের স্বার্থে, দেশে চলমান ফ্যাসিবাদের উৎখাতের জন্য নির্বাচনে আমরা এক সঙ্গে কাজ করছি। এমনটা সব দেশেই হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের দিকে তাকালেই এর দৃষ্টান্ত দেখতে পারবেন। সেখানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম হিন্দু-প্রধান কংগ্রেসের সঙ্গে এক হয়ে নির্বাচন করছে। তার মানে তো এই নয় যে, সেখানকার জমিয়ত কংগ্রেস হয়ে গেছে অথবা কংগ্রেস হয়ে গেছে জমিয়ত! বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে আদর্শিক অবস্থান ঠিক রেখে সাময়িকভাবে এ রকম এক হওয়া যায়, হতে হয়। আমরা এ কাজটাই করেছি।’
