মাহাথির মোহাম্মদ ও আগামীদিনের মালয়েশিয়া

ইমরান চৌধুরী 

প্রায় ২২ বছরের শাসন শেষে জেলে আর অলস কৃষকের দেশ থেকে মালয়েশিয়াকে একটি প্রথম সারির দেশে উন্নীত করে মহাথির মোহাম্মদ যখন অবসর নিলেন, তখন তিনি একজন জীবন্ত কিংবদন্তী। পদ ছাড়ার পর তিনি বলেছিলেন, “ইতিহাস আমাকে মনে রাখলে ক্ষতি নেই।” অথচ ততোদিনে সান ইয়াত সেন, উড্রো উইলসন, উইনস্টন চার্চিল, মাও সে তুং, জোসেফ স্টালিন, হো চি মিন, ফিদেল ক্যাস্ট্রো অধ্যুষিত বিংশ শতাব্দীর সেরা রাষ্ট্রনায়কদের কাতারে পৌঁছে গেছিলো তাঁর নাম। আধুনিক যুগে সফল শাসকের টেক্সট বুক নমুনা হিসেবে সংরক্ষিত ছিলো মহাথির মোহাম্মদের নাম।

এমতাবস্থায় কেউ নিজের পর্বতসম সুনাম নিয়ে কোনরূপ জুয়া খেলার কথা ভাবতে পারেনা। অধিকিন্তু, ৯২ বছর বয়সে এসে তো নয়ই। এটা কোন স্বাভাবিক বয়স নয়। এসময় নতুন সূচনার কথা কেউ ভাবে না। তবে ব্যতিক্রম হয় তাদের ক্ষেত্রে, যাদের চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত পুরোটাই কলিজা!

বহুবার মহাথির নিজেই বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে বাঙ্গালীদের মালয়দের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত বলে অভিহিত করলেও এটা আমাকে স্বীকার করতে হবে, এমন গুর্দাওয়ালা রাজনীতিবিদ বাংলায় নেই। একটাই নজির দেখা যায় ১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর, যেদিন মুসলিম লীগকে রক্তচক্ষু দেখিয়ে অতিপ্রাকৃত সাহসের পরিচয় দেখিয়ে মুসলিম বিদ্বেষী হিন্দু মহাসভার সাথে কোয়ালিশন করে সরকার গড়েছিলেন এ কে ফজলুল হক। তবে সেটা দুঃসাহসী বাজি হলেও তা বিফল হয়েছিলো।

নবতিপর বৃদ্ধ মহাথির মোহাম্মদের জন্য পনের বছর পর নিজের বহুল আলোচিত সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার ইব্রাহীমের অনুকূলে প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবীদার হওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এক বাজি ছিলো। তিনি যদি নির্বাচনে সামান্য আসনের ফারাকেও পরাজিত হতেন, তবে তা তাঁর এতো বছরের সুনামকে ম্লান ও পলকা করে ফেলতো।।

অথচ, মহাথির দৃশ্যত অসাধ্য সাধন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা প্রায়শই তাঁকে একনায়ক বলে অভিহিত করতো। জনগণে ভোটে জয়ী হয়ে তিনি এই অভিযোগকে কার্যত খণ্ডন করেছেন। যদি ভোটারদের বেশিরভাগ নতুন প্রজন্মের হয়ে থাকে, তাহলে তারা মহাথির মোহাম্মদের শাসনামল দেখেনি, অথবা সেই আমলে দুনিয়ায় থাকলেও তা বুঝার মতো অবস্থানে ছিলো না। অথচ তিনি এদেরও ভোট পেয়েছেন। এই নির্বাচন এই মতই প্রতিষ্ঠিত করেছে যে, মালয়েশিয়ায় মহাথিরই শেষ কথা, এবং তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমুন্নত রেখেই।

যাহোক, মহাথির মোহাম্মদের এবারের নেতৃত্ব কেমন যাবে তা চিত্তাকর্ষক ভাবনার বিষয়। যে জোটের প্রার্থী হিসেবে মহাথির মোহাম্মদ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, সেই জোটের বাগডোর কার্যত সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহীমের হাতে থাকবে।

নির্বাহী ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী হলেও এবার বোধকরি মহাথিরের ভূমিকা হবে উপদেশ ও অনুশাসনমূলক। সরকার চালিত হবে আনোয়ার ইব্রাহীমের নকশকদমে। এটা নিশ্চিত করতেই আনোয়ার ইব্রাহীমের স্ত্রী ওন আজিজাকে উপপ্রধানমন্ত্রী করা হয়েছে। এরপর আনোয়ার ইব্রাহীম প্রধানমন্ত্রী হবেন।

তবে মহাথির মোহাম্মদের সাহায্যে কারামুক্তি ও প্রধানমন্ত্রীত্বের পথে ধাবিত হলেও আনোয়ার ইব্রাহীম বেশি দূর যাবেন না। এর কারণ, মহাথির মোহাম্মদের মতো আনোয়ার ইব্রাহীমেরও সমস্যা বয়স। সেক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে নতুন ধারার এক পরিবারতন্ত্র গড়ে উঠবে। আনোয়ার ইব্রাহীমের কন্যা নূরুল ইজ্জত ক্রমেই পিতার প্রতিস্থাপক হিসেবে সামনে আসতে শুরু করবেন…!

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদদ্বিতীয় সুন্দরবনে রূপ নিচ্ছে চরকুকরিমুকরি
পরবর্তি সংবাদকুরআনের সমাজ কায়েম করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হতে হবে-মুফতী ফয়জুল্লাহ