
রাগিব রব্বানি
দেশের অভিজাত ইসলামি প্রকাশনীগুলোর অংশগ্রহণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত কয়েক বছর ধরে আঞ্চলিক কিতাবমেলার আয়োজন করে আসছে মাকতাবাতুল আযহার ও মাকতাবাতুল ইসলাম। সময়ে সময়ে আয়োজিত এসব মেলা থেকে ইসলামি ভাবাপন্ন পাঠকরা বিশেষ ছাড়ে ক্রয় করতে পারেন নিজেদের কাঙ্ক্ষিত বইপত্র। থাকে লেখকদের সঙ্গে সহজেই মতবিনিময়ের সুযোগ। ফলে এ ধরনের মেলার গ্রহণযোগ্যতা ও চাহিদা দিনদিন বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৬ সালে রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় মাকতাবাতুল আযহারের প্রধান বিক্রয়কেন্দ্র প্রাঙ্গণে সর্বপ্রথম এ ধরনের কিতাবমেলার আয়োজন করা হয়। তারপর বিগত তিন বছরে রাজধানীর মিরপুর, জামিয়া রাহমানিয়া মোহাম্মদপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, কিশোরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে মোট ১৫টি কিতাবমেলার আয়োজন করেছে মাকতাবাতুল আযহার। মাকতাবাতুল আযহার উদ্যোগ নিলেও এসব মেলায় ইসলামি ঘরানার অভিজাত প্রকাশনীগুলোও নিয়মিত অংশগ্রহণ করে।
বাংলা একাডেমি আয়োজিত প্রতি বছরের একুশে বইমেলায় ইসলামি ঘরানার অভিজাত প্রকাশনীগুলো স্টল পায় না। প্রকাশনী কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যাবতীয় শর্তাদি পূরণ করার পরও বইমেলায় তাঁরা অংশগ্রহণ করতে পারেন না। ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে অনেকে জানিয়েছেন, মন্ত্রী পর্যায় থেকে সরাসরি সুপারিশ এনেও কাজ হয়নি, লটারির অজুহাতে বইমেলায় অংশগ্রহণ থেকে তাদেরকে বঞ্চিত রাখা হয়। তাই আঞ্চলিক কিতাবমেলার এ ধারাকে অনেকে বইমেলার বিকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন, এবং জানাচ্ছেন, ইসলামি বইপত্রকে সাধারণ শ্রেণির পাঠক মহলের কাছে পৌঁছে দিতে এ উদ্যোগ বইমেলা থেকেও অধিক ফলপ্রসূ প্রমাণিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন : একুশে বইমেলায় ইসলামি প্রকাশনীগুলো যেতে পারে না কেন?
এই ধারাবাহিকতায় আগামী ১ ও ২ আগস্ট বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাজধানীর জামিয়া নুরিয়া কামরাঙ্গীরচর প্রাঙ্গণে আয়োজিত হচ্ছে ১৬তম আঞ্চলিক কিতাবমেলা। আসন্ন এ কিতাবমেলাকে সামনে রেখে কথা বলেছিলাম মাকতাবাতুল আযহারের উপদেষ্টা ও আঞ্চলিক কিতাবমেলার অন্যতম উদ্যোক্তা, লেখক ও অনুবাদক মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুকের সঙ্গে।
তিনি জানান, মাকতাবাতুল আযহার প্রচুর পরিমাণে বিদেশি কিতাবাদি আমদানি করে। সেই সঙ্গে নিজেরাও প্রচুর বইপত্র প্রকাশ করে। তাঁদের বিশাল এই কালেকশনের সঙ্গে পাঠকদেরকে পরিচয় করিয়ে দেবার লক্ষ্যে কয়েক বছর আগে বাড্ডায় তাদের প্রধানবিক্রয়কেন্দ্রের সামনে কিতাব প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এবং এ প্রদর্শনীকেই আরেকটু ব্যাপক রূপ দিয়ে পরবর্তী সময়ে কিতাবমেলা প্রথার সূচনা হয়।
মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ২০১৬ সালের দিকে আমরা যখন আমাদের প্রধান বিক্রয়কেন্দ্রের সামনে কিতাবমেলার আয়োজন করি এবং মেলা উপলক্ষে বইপত্রে বিশেষ ছাড় দিই, তখন পাঠকদের থেকে অভাবনীয় সাড়া পাই। আমাদের কাছে অনুরোধ আসতে থাকে স্থানে স্থানে যেন এরকম কিতাবমেলা করা হয়। ইসলামি ঘরানার আরও বেশ কয়েকটি প্রকাশনীর কাছ থেকেও এ ব্যাপারে আমরা সাড়া পাই। ফলে এখান থেকেই আঞ্চলিক কিতাবমেলা করার চিন্তা আসে আমাদের মাথায়।
আবদুল্লাহ আল ফারুক জানান, দেশের নানা জায়গায় কিতাবমেলা করার ফলে ইসলামি পাঠকদের বাইরে সাধারণ ঘরানার পাঠকদের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে ইসলামি প্রকাশনীর বইগুলো। সাধারণ ঘরানার রুচিশীল পাঠকদের অনেকে অবাক হন নানা কন্টেন্টে ইসলামি প্রকাশনীগুলোর বিপুল পরিমাণ বই দেখে। তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করে জানাচ্ছেন, ইসলামি প্রকাশনীগুলো যে এত এত কন্টেন্টের ওপর এমন মানসম্মত বই করছে, ব্যাপারটা তাঁদের জানা ছিল না। ফলে তাঁরা আগ্রহী হচ্ছেন ইসলামি প্রকাশনীগুলোর প্রতি।
পাশাপাশি আঞ্চলিক কিতাবমেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লেখকের উপস্থিতির কারণে লেখক-পাঠকের মধ্যে সরাসরি একটা মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাঠকরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত বই বইয়ের লেখকের অটোগ্রাফসহ সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে পাঠকদের ভেতর যেমন অনুপ্রেরণা কাজ করে, তেম্নি নতুন লেখকও তৈরি হন এসব পাঠকের মধ্য থেকে।
এ ছাড়া এসব কিতাবমেলা যে জায়গাগুলোতে হচ্ছে, ইসলামি বইয়ের নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে সেসব স্থানে। আবদুল্লাহ আল ফারুক জানান, মফস্বল এলাকাগুলোতে বইয়ের বাজার তেমন চাঙ্গা না। আঞ্চলিক কিতাবমেলা যেসব এলাকায় হয়েছে, প্রত্যেকটা এলাকায় আলাদা একটা সাড়া পড়েছে। মানুষের মধ্যে বই কেনার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যার ফলে কিতাবমেলার পর কোনো কোনো এলাকায় মানুষের চাহিদার ভিত্তিতে নতুন নতুন লাইব্রেরিও গড়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন : ইসলামী ফাউন্ডেশনের বইমেলা : কেন আগ্রহী নয় ইসলামী প্রকাশনীগুলো?
মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, মেলায় আমরা বিশেষ ছাড় দেবার কারণে অনেকটা পাইকারি দরে বই বিক্রি করি। খুচরা বিক্রেতারা এটাকে ভালোভাবে নিতে চান না। কিন্তু আদতে কিতাবমেলার মধ্য দিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বইয়ের বাজার চাঙ্গাই হয়, ফলে মূল লাভটা তাদেরই হয়। আর যেখানে বইয়ের বাজার মোটামুটি চাঙ্গা আছে, সেখানে সাধারণত আমরা কিতাবমেলার আয়োজন করি না।
তিনি আরও বলেন, কিতাবমেলায় বিক্রি-বাট্টা বেশ জমজমাট থাকে। বিশেষ ছাড় থাকার কারণে পাঠকরা দেদারসে বই কেনেন, ফলে পাইকারি দরে কিতাব বিক্রি করেও মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনীগুলো ভালো একটা মুনাফা অর্জন করতে পারেন।
বইমেলা তো জাতীয় পর্যায়ের মেলা, দীর্ঘ সময় ব্যাপী হয়, তারপরও আপনাদের কিতাবমেলার সঙ্গে যদি বইমেলার বিক্রি-বাট্টার তুলনা করতে যান, কীভাবে করবেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, সবদিক বিবেচনা করে যদি তুলনা করি, তবে বলব আমাদের বিক্রি-বাট্টাই বেশি। কারণ, বইমেলা হয় মাসব্যাপী, প্রস্তুতি ফুরোতে ফুরোতেই মাসের অর্ধেক পার হয়ে যায়, শেষ অর্ধেকে বিক্রি-বাট্টা জমে, তাও কেবল সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে। কিন্তু আমাদের কিতাবমেলাগুলোর ব্যাপ্তি থাকে দুই থেকে তিন দিন, পাঠক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুরোধে মাঝে মাঝে এক/দুই দিন বাড়ানোও হয়, কিন্তু আমাদের এ স্বল্প সময়ের ভেতরে যে বিক্রি-বাট্টা হয়, মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনীগুলোর কেউই কুলিয়ে উঠতে পারে না।
আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, বইমেলায় যে প্রকাশনীগুলো যায়, সারা মাস বিক্রি করেও তাদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ মেলার খরচই তুলতে পারে না, অনেকে লোকসানের অভিযোগ করেন, কিন্তু আমাদের কিতাবমেলায় যে প্রকাশনীগুলো অংশগ্রহণ করে, তাদের খরচ তো উঠেই, মোটামুটি অংকের মুনাফাও অর্জন করে সবাই।
কিতাবমেলা নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে কিতাবমেলার অন্যতম এ উদ্যোক্তা জানান, আপাতত আমরা একটা টার্গেট নিয়ে নেমেছি, সারা দেশে এ রকম মোট ৫০টি কিতাবমেলার আয়োজন করা। প্রতিটি জেলায় তো আর ওরকম পরিবেশ নেই, তবে সবকটি বিভাগে, যেখানে কিতাবমেলা করার মতো মোটামুটি পরিবেশ আছে, আমরা মেলার আয়োজন করব। ১৫টা এ পর্যন্ত করেছি, ১৬ নম্বরটা তো কামরাঙ্গীর চরে, বাকি ৩৪টাও আমরা উপযোগী স্থান বেছে বেছে ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করব। এবং এ ৫০টি মেলার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামি সাহিত্যের পরিচিতি আমরা ছড়িয়ে দিতে পারব বলে আশাবাদী।
