
হুজাইফা আওয়াদ
বিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্ন থেকে যে ক’জন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব নিজেদের নানামাত্রিক প্রাজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন, জাতীয় জীবন ও কর্মে প্রবলভাবে নাড়া ফেলেছেন, আবু যোহরা তাঁদের অন্যতম। ইসলামের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সোনালি বাতায়নে তাঁর নামটি জ্বলজ্বল করবে যুগযুগান্তর অবধি।
মিশরে ইসলামি ‘আইন প্রয়োগ’ বলবৎ রেখে এর স্বকীয়তা রক্ষার জন্য আবু জুহরা একটি দুর্বার আন্দোলন ও রীতিমতো মহাযুদ্ধের সাক্ষী হয়ে আছেন, যেখানে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও ‘ব্যাক্তি আইন’ পাশের মতো জটিল থেকে কঠিনতর রাষ্ট্রীয় ব্যাপারগুলো হাজির ছিল। তিনি তাঁর কলম ও চিন্তার শেষ বিন্দুটুকু দিয়ে গেছেন সুদকে বৈধতা দানের অপচেষ্টা রোধ করতে।
তাঁর সময়টা ছিল মিশরের ঐ যুগ, যখন নাস্তিকতার সস্তা চর্চা হতো সর্বত্র, সমাজতন্ত্রীদের উদ্যাম জোয়ারে ভাসছিল পুরা দেশ, রাষ্ট্রযন্ত্র পর্যন্ত জনজীবনের চতুষ্কোণ রাঙিয়ে তুলতে চাচ্ছিল তাদের শেখানো সমাজ-বিদ্যা দিয়ে।কিন্তু মিশরের ইতিহাস এতো কিছুর পরও আবু জুহরাকে তাঁর সত্য-উচ্চারণ থেকে তিল মাত্র পিছু হটতে দেখেনি।
বস্তুর মোহ কখনোই তাঁকে স্পর্শ করেনি, যার ফলে তিনি আজীবন ইসলামের সরল-স্বচ্ছ ধারণাটা মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন; এমনকি শাসকগোষ্ঠির সামনে দাঁড়িয়ে অকপটে বলে যেতেও দ্বিধা করেননি।
তিনি বলতেন, কবে আমার থেকে ভয় এবং লিপ্সার মৃত্যু হয়েছে আমার তা জানা নেই।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি সেমিনারে তাঁকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল একবার। সেখানে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন তৎকালীন মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান। বক্তব্যে তিনি জোরদার ভাষায় ইসলামকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ ধর্ম আখ্যা দেন এবং এটা প্রমাণ করতে ইসলামের শ্বাস্বত বিশ্বাসে জঘন্যভাবে আঘাত হানেন। এমনকি উপস্থিত উলামাদেরকেও তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে কথা বলার আদেশ করেন।
সকলেই রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্যে হতবাক হলো, কিন্তু প্রতিবাদ করবার সাহস কেউ দেখালো না। হঠাৎ আবু যোহরা দাঁড়িয়ে নিজের ভাব-গম্ভীর উপস্থিতি জানান দিলেন। অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় দৃঢ় উচ্চারণে প্রতিবাদ করে বললেন, ‘আমরা মুসলিম কমিউনিটির শরয়ি প্রতিনিধিত্ব করতে এখানে এসেছি। রাষ্ট্রীয় শালিস-বিচারে, মানবীয় সংকটে আমরা কুরআন-নির্দেশিত সমাধানের কথাই শুধু বলি, অতএব রাষ্ট্রনায়কদের উচিত সীমাতিরিক্ত একটা শব্দও উচ্চারণ না করা। আপনি আমাদেরকে এখানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আমাদের কথা শোনার জন্য, আমরা আপনার কথা শুনতে এখানে আসিনি, সুতরাং আমাদের কথাগুলো আমাদেরকে বলতে দিন। এটা অত্যন্ত ধ্রুব সত্য যা আপনিও ভালো করেই জানেন যে, আবু জুহরা কখনো শরিয়তের বিপরীত কথা শুনে আপন স্থানে স্থির থাকতে পারে না।’
রাষ্ট্রপ্রধান কান উঁচিয়ে শুনছিলেন কথাগুলো, কথা শেষ হতে না হতেই তিনি দাঁড়িয়ে একজন আলেমকে ডাকলেন আবু যোহরার বক্তব্যের খণ্ডন করতে, কিন্তু খণ্ডন করার মতো কাউকেই পেলেন না। ইতিহাস বলে, এরপর আর কখনোই আবু জুহরার সামনে তাঁর বিপরীতে গিয়ে কোনো কথা বলার সাহস করেননি সেই রাষ্ট্রপ্রধান।
কালের এই কীর্তিমান মহাযোদ্ধা ১৮৯৮ সালে মিশরের গারিবা জেলার আওতাধীন একটি ছোট্ট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকায় খুব শৈশবেই কোরআনে কারিমের শুদ্ধরূপে তেলাওয়াত ও সুন্দর হস্তলিখনীতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
কিছুদিন পর তানতা শহরের ‘জামে আহমাদি’তে শিক্ষার উদ্দেশ্যে চলে যান। মিশরের অন্যতম বিদ্যাপীঠ ছিল এই জামে আহমাদি। শতাব্দীর বহু আলেম-উলামা জন্ম দিয়েছে এই মাদরাসা। মিশরের দ্বিতীয় ‘আজহার’ বলে খ্যাত ছিল এ দরসগাহ।
১৯১৬-তে খুব ছোট থাকতেই ‘মাদরাসাতুল কাজা আশ-শারয়ি’-তে চান্স পান। সম্ভবত এই মাদরাসার ইতিহাসে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। এখানে যারা উচ্চতর আইন বিভাগে পড়া শেষ করতো, পরবর্তী সময়ে তাদেরকে মিশরীয় আঞ্চলিক মহকুমাগুলোতে নির্বাহী কাজি (বিচারক) হিসেবে পাঠানো হতো।
১৯২৪ সালে আবু জুহরা দীর্ঘ আট বছর পর এখান থেকে শরিয়াহ আইনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি হাসিল করেন। এরপর তিনি একাধিক জামেয়াতে শরিয়াহ অনুষদে অধ্যাপনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৬২-তে জামেয়া আজহারের অধুনিকায়নের পর মিশরের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্লাটফর্ম ‘মাজমাউল বুহুসিল ইসলামিয়্যার’ সিনিয়র সদস্য নির্বাচিত হন।
আবু যোহরার জীবনের আদ্যোপান্ত সবটাই ছিল সত্য উচ্চারণ ও বিদ্যালাপে পূর্ণ। জ্ঞান-প্রজ্ঞার ঋদ্ধ জীবন পার করেছেন তিনি। আমাদের মাঝে আজও আপন মহিমায় ভাস্বর শতাব্দীর এই মহান মনীষী। তাঁর রেখে যাওয়া তুরাস থেকে বহু মানুষ উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে, এবং অব্যাহতভাবে হতে থাকবে আগামীতেও।
এবার আমরা তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিমণ্ডল নিয়ে কিছু আলাপ করি। আবু যোহরা ছোট-বড় প্রায় ৪০টির মতো গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার প্রায় প্রতিটিই ইলমি মহলে যথেষ্ট সমাদৃত। বিশেষত সম্পত্তি, চুক্তি তত্ত্ব, ওয়াকফ, রায়, আদেশ ও তাঁর আইন, উত্তরদায় এবং স্বাধীনতা ও বাধ্যবাধকতা প্রভৃতি বিষয়ে লিখেছেন তিনি।
ইসলামের ইতিহাসে ফিকহের ওপর সুবিস্তৃত কাজ করেছেন এমন আটজন স্বর্ণ-মানবের জীবনের ওপর দিরাসাহ (গবেষণা) করেছেন আবু যোহরা। সেই আটজন হলেন–ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমাদ, যায়দ ইবনু আলি, জাফর সাদিক, ইবনে হাজাম, ইবনে তাইমিয়া। রাহিমাহুমুল্লাহ।
এঁদের প্রত্যকের জন্যই একেকটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন আবু যোহরা। এখানে তাঁদের ইলমি জগত, চিন্তার ব্যাপ্তি ও ফিকহে ইসলামিতে তাঁদের সমুদ্রসম কর্ম ও অবদানের কথা তুলে ধরেছেন বিস্তর পরিসরে। এর মধ্যে আমাদের দেশের উচ্চতর গবেষণা বিভাগে বহুল পরিচিত একটি কিতাব হলো ‘আবু হানিফা, হায়াতুহু ওয়া ফিকহুহু ওয়া আরাউহু’। যা প্রায় পাঁচশত পৃষ্ঠাব্যাপী বড় একটা গ্রন্থ।
আবু যোহরা ইসলামি ফিকহ, শরিয়াহ আইন ও তার ব্যবহারশাস্ত্র, তাফসির এবং সিরাত নিয়েও লেখালেখি করেছেন নিয়মিত।
১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ এপ্রিল ইতিহাসের এই মহান মনীষী আপন হুজরায় সুরা নামলের তাফসির লেখা অবস্থায় ইহজগত ত্যাগ করে মহান রবের ডাকে সাড়া দেন। মিশরেই তাঁকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
লেখক : তাকমিল ফিল হাদিস, দারুল উলুম দেওবন্দ
