আলোচিত সেই বিমান ছিনতাই, মাসউদ আজহার যেভাবে মুক্তি পান ভারতীয় কারাগার থেকে

রাগিব রব্বানি

ভারতের দখলে থাকা কাশ্মীরের পুলওয়ামায় গতমাসে স্বাধীনতাকামী সংগঠন জায়শে মুহাম্মদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় চল্লিশেরও অধিক ভারতীয় সেনা নিহত হবার ঘটনার পর থেকে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সংগঠনটি। পাশাপাশি অনিবার্যভাবে আলোচিত হচ্ছেন এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতা মাওলানা মাসউদ আজহারও।

জায়শে মুহাম্মদ ও মাওলানা মাসউদ আজহার মূলত কাশ্মীরি মুসলমানদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে আসছেন। এবং কাশ্মীরের ভারত অংশে যেহেতু মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও নীপিড়ন চলছে, তাই এ অংশটুকুতেই সংগঠনটি বেশি তৎপর। মাওলানা মাসউদ আজহার যেহেতু পাকিস্তানের বাসিন্দা এবং ভারত যেহেতু পাকিস্তানের ঘোরতর শত্রু আর মাসউদ আজহার ভারতের বিপক্ষেই লড়াই করছেন, তাই পাকিস্তানের ওপর বিশ্বমোড়ল ও মুসলিম-বিরোধী শক্তির আরোপিত একটা ‘বদনাম’ আছে যে, পাকিস্তান সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে মাসউদ আজহার ও জায়শে মুহাম্মদকে।

এই বদনামের বাস্তবতা কতটুকু আল্লাহ মালুম। কেননা, খোদ পাকিস্তানেই মাওলানা মাসউদ আজহারকে দেখা গেছে নানামাত্রিক রাষ্ট্রীয় নিগ্রহের শিকার হতে। এবং সাম্প্রতিক সময়েও জায়শে মুহাম্মদকে কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে পাকিস্তানে। তবে মাসউদ আজহার বা জায়শে মুহাম্মদকে পাকিস্তান যদি কোনো রকমের সহযোগিতা করেও থাকে, সেটা পাক-জাতীয়তাবাদ এবং ভারত-বিরোধিতার স্বার্থেই করছে, ইসলাম কিংবা কাশ্মীরের মুসলমানদের কল্যাণকামিতার চিন্তা থেকে নয়।

মাওলানা মাসউদ আজহারের কাজ কাশ্মীরে যেমন ব্যাপৃত তেম্নি আফগান ভূমিতেও আমেরিকার বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ভারতের কারাগার থেকে তাঁর মুক্তির ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এবং তার কিছুদিন পর টুইন টাওয়ারে হামলার ছুতোয় আমেরিকা ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানে যুদ্ধের সূচনা করে। মাসউদ আজহার তালেবানের পক্ষ নিয়ে নানা সময় সেখানে নানা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।

তাঁর কর্মতৎপরতা নিয়ে বহির্বিশ্বের পাশাপাশি পাকিস্তানেও নানারকম সমালোচনা আছে। প্রকৃত লড়াই বাদ দিয়ে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ ও ‘উগ্রতা’ ছড়াচ্ছেন তিনি–এমন অভিযোগ করেন পাকিস্তানের ‘প্রগতিশীল সমাজ’। তাছাড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেমন একদিকে তাঁকে সাহায্য করে, আবার অন্যদিকে নানারকম চাপের ভেতরও রাখে। বিস্তারিত তথ্য না থাকায় তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসা খুব কঠিন।

১৯৯৯ সালে ভারতীয় একটি বিমান ছিনতাইয়ের ৭দিনের মাথায় ভারতের কারাগার থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন। এর আগে টানা ৬ বছর ২৪ দিন তিনি বন্দী ছিলেন ভারতের কারাগারে। ভারতীয় কারাগারে বন্দী থাকাকালে নানামাত্রিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং অসহ্য নির্যাতনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। এ নির্যাতন থেকে মুক্তির আপাত কোনো উপায় ছিল না তাঁর।

কাশ্মীরে ভারতের আগ্রাসনের মোকাবেলায় মাসউদ আজহারের তৎপরতার প্রতি পাকিস্তানের যদিও মৌন সমর্থন ছিল এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য-সহযোগিতার একটা কথাও প্রচলিত ছিল, কিন্তু ভারতের হাতে বন্দী হবার পর তাঁকে মুক্ত করার ব্যাপারে পাকিস্তানের কোনো উদ্যোগ কি প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়নি।

কিন্তু মাসউদ আজহারের মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের নেতার মুক্তির ব্যাপারে অভিনব এক কৌশলের আশ্রয় নেয়। সেদিন ছিল ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৮১৪ নামের একটি যাত্রীবাহী বিমান নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টের দিকে যাচ্ছিল। বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও বোমা নিয়ে সেই ফ্লাইটে উঠে পড়েন পাকিস্তানের তৎকালীন হরকাতুল মুজাহিদিন নামক সংগঠনের কয়েকজন সদস্য।

বিমানটি ভারতের আকাশসীমায় ঢোকার পরপরই হরকাতুল মুজাহিদিনের এই সদস্যরা অপারেশনে নামেন। অস্ত্রাঘাত ও বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দিয়ে পাইলট ও বিমান কর্তৃপক্ষকে নিজেদের বাগে নিয়ে আসেন। পাইলটকে নির্দেশ দিলেন বিমানের গতিপথ পাল্টাতে। পাইলট তখন নিজের ও যাত্রীদের জানের নিরাপত্তার কথা ভেবে মুজাহিদদের কথা শুনতে বাধ্য। বিমান অমৃতসর, লাহোর ও দুবাইয়ের আকাশপথ প্রদক্ষিণ করে অবশেষে আফগানিস্তানের কান্দাহারে অবতরণ করে। আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তখন তালেবান। বিমানে ছিলেন ১৭৬ জন যাত্রী। ২৭ জনকে দুবাই বিমানবন্দরে নামিয়ে দেওয়া হয়। বাকিদেরকে কান্দাহারে পণবন্দী করে রেখে হরকতুল মুজাহিদিন ভারতের কাছে দাবি করে ভারতের হাতে বন্দীথাকা মুজাহিদ কমান্ডার মুশতাক আহমদ জারগার, আহমদ ওমর সৈয়দ শেখ এবং মাওলানা মাসউদ আজহারকে মুক্ত করে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে।

পুরো বিশ্বজুড়ে তখন তোলপাড় শুরু হয়েছিল। ভারত পড়েছিল চরম বিপাকে। একদিকে দেড়শতাধিক যাত্রী, অপরদিকে তাদের চিরশত্রু ও আতঙ্কমানব মাসউদ আজহারসহ গুরুত্বপূর্ণ দুই বন্দী। ভারতের জনগণের চাপে এবং দেড়শতাধিক ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমান ছিনতাইয়ের ৭ দিনের মাথায় অবশেষে দাবিকৃত তিন বন্দীকে হরকাতুল মুজাহিদিনের হাতে অক্ষত অবস্থায় তুলে দিতে বাধ্য হয় ভারত। এবং সেই সঙ্গে জাগতিকভাবে নিঃস্ব একদল মুজাহিদের হাতে পরমাণুশক্তির অধিকারী হয়েও পরাজয় বরণ করে দেশটি।

মাওলানা মাসউদ আজহারসহ দাবিকৃত অপর দুই বন্দীকে ফেরত পাবার পর পণবন্দী সাধারণ যাত্রীদের মুক্ত করে দেন মুজাহিদরা। এই যাত্রীদের অনেকেই পরে বিভিন্নভাবে স্বীকার করেছেন, পণবন্দীর সময়টায় তাঁদের সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ বা বন্দীসুলভ কোনো কষ্ট দেননি মুজাহিদরা।

আগের সংবাদএকজন আলেম ওয়েব ডেভলপারের ক্যারিয়ারের গল্প
পরবর্তি সংবাদবগুড়ায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ৩