ঊনিশের মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র

ঊনিশের মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র

মুনশী নাঈম

২০১৯ সালে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র ছিল অস্থিতিশীল। কখনো গৃহযুদ্ধের দাবানলে পুড়েছে, কখনো বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছে। বিদেশি দখলে যেমন নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে, তেমনি কখনও দুলে উঠেছে স্যাকুলারিজমের দুর্দান্ত বাতাসে। গেলো বছরে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রের দৃশ্য কেমন ছিল, আমরা এখানে  তা আঁকার প্রয়াস পাব।

গৃহযুদ্ধ

সিরিয়া: ২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ লেগে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ৷ প্রায় নয় বছর পূর্ণ করছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। নয় বছরের জটিল এ যুদ্ধে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) হিসেবে আনুমানিক ১০ মিলিয়ন মানুষ সিরিয়া ছেড়ে গেছে। লেবানন, জার্মানি, ইরান ও তুরস্ক সিরিয়ার শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়।

স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে ২০১১ সালে ১৫ মার্চ সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে দেশটির মুক্তিকামী তরুণরা। আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করার চেষ্টা করে সরকার। জুলাইয়ে আসাদের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করা সেনা কর্মকর্তা কর্নেল রিয়াদ আল আসাদ গঠন করেন তুরস্কভিত্তিক বিদ্রোহী ফ্রি-সিরিয়ান আর্মি (এফএসএ)। ২০১৩ থেকে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অন্য এলাকাগুলোতে বিমান হামলা শুরু করে সরকারি বাহিনী। ২০১৫ সালে বাশারের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয় রাশিয়া। আসাদকে সমর্থন দিতে শুরু করে শিয়াপ্রধান রাষ্ট্র ইরান, ইরাক ও লেবাননের হেজবুল্লাহ। বিপরীত দিকে তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরব সমর্থন দেয় বিদ্রোহীদের। সিরিয়া কার্যত পরিণত হয় একটি প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রে।

ইয়ামেন: মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়ামেনে প্রায় চার বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলছে। দেশটির বিভিন্ন অংশে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। বলা হয়ে থাকে, ইয়ামেনের যুদ্ধের আড়ালে আদতে লড়াই চলছে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে।

ইয়ামেনের দীর্ঘকালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন একনায়ক আলী আবদুল্লাহ সালেহ। প্রচণ্ড বিক্ষোভের মুখে ২০১১ সালে আবদ রাব্ব মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিনি। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে সানা দখল করে নেয় হুতিরা। ফলে ইয়েমেনে দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে যায়। একটি সরকার পক্ষ, আরেকটি হুতি বিদ্রোহীরা। আলী আবদুল্লাহ সালেহর সমর্থক সেনারাও হাত মিলিয়েছিল হুতিদের সঙ্গে। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে এমন বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আবদ রাব্ব মনসুর হাদি।

২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ শুরু করে। আবদ রাব্বু মনসুর হাদির সমর্থনে এই বিমান হামলা শুরু হয়। নির্বাসনে থেকেই ইয়ামেনের প্রেসিডেন্ট হাদি এই অভিযানে সমর্থন দেন। হুতি বিদ্রোহীদের ইরান সমর্থন দিচ্ছে বলে বিশ্বাস করে সৌদি আরব। কারণ ইরান ও হুতি বিদ্রোহী—দুইই শিয়া ধর্মাবলম্বী। সুন্নি সৌদি আরব তাই মনে করে, ইরানের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই হুতিরা এত রণংদেহী হয়ে উঠেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইয়ামেনে প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এ সব শিশু মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল। দেশটির প্রায় ২ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের সুবিধা পাচ্ছে না।

লিবিয়া: লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। রাজধানী ত্রিপোলির নিয়ন্ত্রণের জন্য এ বছরের এপ্রিলের ৪ তারিখে শুরু হওয়া এ গৃহযুদ্ধে এই মুহূর্তে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছে অন্তত নয়টি দেশ। একদিকে পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের সেনাপ্রধান, ফিল্ড মার্শাল খালিফা হাফতারকে সাহায্য করছে প্রধানত আরব আমিরাত। কিন্তু তার সাথে আরো আছে মিসর, সৌদি আরব, ফ্রান্স, সুদান, এবং রাশিয়া। অন্যদিকে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার জিএনএর (গভর্নমেন্ট অফ ন্যাশনাল অ্যাকর্ড) পক্ষে আছে প্রধানত তুরস্ক, এবং সেই সাথে সীমিত আকারে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছে কাতার।

বিদেশীদের হস্তক্ষেপের ফলে লিবিয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসেবে গত সাড়ে সাত মাসের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে অন্তত ১,১০০ মানুষ। আহত হয়েছে আরো প্রায় ৬,০০০ এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার মানুষ। নিহতদের মধ্যে অন্তত ২০০ জন বেসামরিক জনতা, পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী যাদের একটা বড় অংশই বিদেশী। আর ত্রিপোলিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা অন্তত ১০ জন।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতা

আলজেরিয়া: ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল আজিজ বুতেফলিকা। ৮২ বছর বয়সী বুতেফলিকা ২০ বছর ধরে আফ্রিকার এই দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পঞ্চমবারের মতো একই পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন তিনি। এরই প্রতিক্রিয়ায় আলজেরিয়ায় গণবিক্ষোভ শুরু হয়।

লেবানন: জরুরি অর্থনৈতিক অবস্থা ঘোষণা, মার্কিন ডলারের সংকট, বাজেট অধিবেশনকে সামনে রেখে দ্রব্যপণ্যের উপর মূল্য সংযোজন কর বৃদ্ধি, হোয়াটস অ্যাপের কল রেট বৃদ্ধি ও বর্তমান সরকারের দুর্নীতির প্রতিবাদে অক্টোবরে বিক্ষোভে নামে লেবাননের জনগণ। একটানা বিক্ষোভের মুখে গত মাসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরি।

ইরাক: দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অনুপযুক্ত সেবামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামে ইরাকের জনগণ। অবশেষে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল-মাহদি।

মালি: মালিতে চলছে অস্থিতিশীল পরিবেশ। বিদ্রোহী ও সরকারি বাহিনীর পরস্পরের মধ্যে নিয়মিতই হামলা-প্রতিহামলা চলছে। গত নভেম্বরে ৫৩ সেনাকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা৷ ডিসেম্বরে ৩৩ বিদ্রোহীকে হত্যা করে সেনারা। অন্যদিকে নাইজেরিয়াতেও চলছে এমন অস্থিতিশীলতা।

সুদান: দেশটির প্রেসিডেন্ট ওমর আল–বশিরের পদত্যাগের দাবিতে ২০১৮ এর ডিসেম্বর থেকে সুদানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়৷ ৯ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে মুখর সুদানের বিক্ষোভরত কয়েক হাজার মানুষ পার্লামেন্টের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে৷

২৯ বছর ধরে প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন আল–বশির৷ ১৯৮৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসেন তিনি৷ আফ্রিকা মহাদেশের একসময়কার বৃহত্তম দেশ সুদান অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এখন চূড়ান্ত দুরবস্থায়৷ ২০১১ সালে আলাদা দেশ হিসাবে দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর থেকে সুদানের অর্থনৈতিক দুর্দশা বেড়েছে, কারণ দেশের তেল সম্পদের চারভাগের তিনভাগই চলে গেছে দক্ষিণ সুদানে৷ আল–বশির এই দুরবস্থা শুধু সামাল দিতে পারছেন না তাই নয়, নানা ধর্ম ও জাতিতে বিভক্ত দেশটির মধ্যে শান্তি বজায় রাখার কাজেও তিনি ব্যর্থ৷ দেশে বেকার সমস্যা ভয়াবহ, জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া৷ এর ওপর রুটিতে আর সরকারি ভরতুকি পাওয়া যাবে না, এমন আশঙ্কা তৈরি হওয়া ক্ষোভে ফেটে পড়ে সুদানের মানুষ।

অবশেষে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সুদানের সামরিক প্রধান ওমর আল বশির।

পাকিস্তান : সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে আজাদী মার্চের ডাক দিয়েছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজন করেছিলেন বিশাল বিক্ষোভের। এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল বিরোধী সব দল। কিন্তু তবুও উল্লেখযোগ্য কোনো ফলাফল আসেনি। ইমরান খান পদত্যাগ করেননি।

অন্যান্য দেশের অবস্থা

অন্যান্য দেশে এমন ব্যাপক বিক্ষোভ হয়নি। এর মধ্যে সৌদি, কাতার, আরব আমিরাত এবং ব্রুনাইতে প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক রাজতন্ত্র।  তুরস্ক, গাজা, তিউনিসিয়া, মালয়েশিয়ায় ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায়। আলবেনিয়া, মিশর, সাবেক সোভিয়েত এবং ফ্রেঞ্চ কলোনিভুক্ত রাষ্ট্রে ক্ষমতার কুরসিতে আসীন সেকুলার সরকার। বিদেশি দখলে জর্জরিত আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনে ইহুদিদের অবৈধ বসতি স্থাপন ২০১৯ সালে বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈধতা পেয়েছে। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে ট্রাম্প-তালেবান আলোচনা একবার বাতিল হয়েছে, আবার শুরু হয়েছে।

২০১৯ যেমনই কেটেছে, অপার স্বপ্ন নিয়ে আমরা তাকিয়ে আছি ২০২০ সালের দিকে। মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রটা আরও সংহত, আরও শক্তিশালী হবে।

আগের সংবাদকাজাখস্তানে ১০০ আরোহীসহ বিধ্বস্ত বিমান, নিহত ১৪
পরবর্তি সংবাদমানচিত্রে মুসলিম সংখ্যালঘু নির্যাতন : ঊনিশের ভয়াল চিত্র