
কাজী মাহবুবুর রহমান
প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐতিহ্যে যে নামটি আভিজাত্য আর নিজস্ব মহিমা নিয়ে জ্বলজ্বল করছে, তা হলো মসলিন। ঢাকাই মসলিন। একসময়ে শুধু বাংলা বা মুঘল রাজদরবারই নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীজুড়েই অতি সূক্ষ্ম, মিহি, মোলায়েম আর উজ্জ্বল এই বস্ত্র ছিল চাহিদার শীর্ষে। মসলিনের একটি একান্ত বিশেষত্ব হলো, মসলিন কাপড় অকল্পনীয় রকমের পাতলা ও মিহি হতো।
একদা ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত এসেছিলেন তৎকালীন বঙ্গদেশ ভ্রমণে। ফেরার সময় রানীর জন্য নিয়ে গেলেন এক আজব উপহার। একটি মাত্র দেশলাইয়ের বক্স নিয়ে রানীর সামনে উপস্থিত হলেন রাষ্ট্রদূত! সভাসদ সবাই অবাক। রানীর হাতে এই উপহার তুলে দিতেই রানী ভীষণ অপমান বোধ করলেন। কিন্তু দেশলাইয়ের বক্স খুলতেই রানীর সমস্ত রাগ, অপমান কর্পূরের মতো নিমেষেই উড়ে গেল। এ যে মসলিন! এত স্বচ্ছ, মিহি আর নজরকাড়া কাপড় তিনি কখনোই দেখেননি।
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, এই মসলিন তৈরি হতো ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে। মসলিন তৈরির জন্য শীতলক্ষ্যার পাড়ের আবহাওয়া ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। মসলিনে সুতা এতই সূক্ষ্ম ছিল যে সকাল কিংবা সন্ধ্যাবেলার শীতল আর স্নিগ্ধ পরিবেশ ছাড়া এই সুতা কাটাই যেত না। বিদেশি পর্যটকরা এসে বিশ্বাসই করতে পারতেন না, এমন কাপড় মানুষের হাতে তৈরি হয় কী করে! এ যেন পরীর কাজ!
ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর জেলার কাপাসিয়াতে ফুটি কার্পাস নামে একধরনের বিশেষ তুলাগাছ উৎপন্ন হতো। সেই গাছের তুলা থেকে পাওয়া যেত একধরনের বিশেষ সুতা। সেই সুতাকে আবার মিহি আর মসলিন তৈরির উপযুক্ত করে তোলার জন্য বোয়াল মাছের দাঁত আর বাঁশের ধনু দিয়ে পরিষ্কার করার পর চরকায় কাটা হতো। কারিগরেরা ধাপে ধাপে মসলিন বোনার প্রক্রিয়া মনে রাখার জন্য বিভিন্ন শ্লোক বা ছন্দ মনে রাখতেন। এইসব তাঁতীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসায় তৈরি হতো একেকটি মসলিন। একেকটি স্বপ্ন, একেকটি আনন্দঘন মুহূর্ত।
মসলিনের অনেকগুলি ক্যাটাগরি ছিল। সবগুলোই ছিল গুণে-মানে সর্বদিক দিয়ে উন্নত। ইতিহাস ঘেঁটে সর্বমোট এগারটি মসলিনের নাম জানা যায়। সেগুলি হলো, মলবুল খাস, সরকার-ই- আলা, ঝুনা, আব-ই- রওয়ান, খাসসা, শবনম, নয়ন সুখ, বদনখাস, সরবন্ধ, ডোরিয়া, জামদানি।
মুঘল আমলে মসলিন তৈরিতে বহু পৃষ্ঠপোষকতা করা হতো। মূলত পলাশী যুদ্ধের পরপরই এর প্রসার কমতে শুরু করে। ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা হারিয়ে শহর হিসেবে এর গুরুত্ব যেমন কমে যাচ্ছিল, তেমনি মসলিন শিল্পেও ভাঙন ধরে। ইংরেজরা বহু তাঁত নষ্ট করে দেয়, তাঁতীরা যাতে মসলিন তৈরি করতে না পারে সেজন্য তাদের বুড়ো আঙুল কেটে নেওয়া হয়।
আজ ১৭ই মার্চ আমাদের উপমহাদেশের, বিশেষত ঢাকার এই অপূরণীয় ক্ষতি ও ব্রিটিশ জুলুমের আড়াইশ বছর পুর্ণ হতে যাচ্ছে। দুইশত পঞ্চাশ বছর আগে ইতিহাসের এই দিনে তাঁতীদের আঙুল কেটে দেয়া মর্মে ব্রিটিশ আদালত ফরমান জারি করে।
আশার কথা, বর্তমানে দেশের মানুষসহ প্রশাসন মসলিনের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক মান উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাই চলছে একে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশন অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের পরিচালক ও বায়োটেকনোলজি গবেষক অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল এ নিয়ে কাজ করছে। চলছে ফুটি কার্পাস গাছের অনুসন্ধান। সেই দেশলাইয়ের বাক্সে আঁটবে এমন মসৃণ মসলিন তাঁরা তৈরি করতে পারবেন, এমনটা না বললেও তাঁদের আশা আদি মসলিনের কাছাকাছি মসলিন নিশ্চয়ই তৈরি করা সম্ভব।
আদি মসলিন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেলেও বাংলাদেশের শেকড়ে প্রোথিত আছে গার্মেন্ট শিল্প। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে তৈরি-পোশাকশিল্প বা আরএমজি। তিনটি রফতানিমুখী খাতের মধ্যে পোশাকশিল্পই অন্যতম। দেশের অর্থনীতিকে বেগবান করতে পোশাক শিল্পের কোনো বিকল্প নেই। যে কোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে সে দেশের শিল্পের উপর নির্ভরশীল। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পনির্ভর।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও পোশাকশিল্পে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে বহির্বিশ্বে। তৈরি-পোশাকশিল্প রপ্তানি বাণিজ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বেকার-সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ শিল্পের অবদান ঈর্ষণীয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ এই শিল্পের হাত ধরে বিশ্ববাজারে একটি ব্র্যান্ড সৃষ্টি করেছে। যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে নতুন পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করছে। দুই হাজার তেরো সালে সাভারের রানাপ্লাজা ধস, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন গার্মেন্ট কোম্পানিতে অগ্নিসংযোগ, নানাবিধ দুর্নীতি ও অনিয়মের ভেতর দিয়েও বাংলাদেশের বর্তমান পোশাকশিল্প যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, সত্যিই তা প্রশংসনীয়।
