
মাওলানা সালমান আহমাদ। ব্রিটেনের অভিবাসী একজন বাংলাদেশি তরুণ আলেম। নর্থ লন্ডনের আল-রাহমান ইসলামিক সেন্টারের ইমাম ও প্রধান শিক্ষক। পরিবার নিয়েই বাস করছেন লন্ডনে। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে নৃশংস হামলা, ইউরোপে ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার এবং অভিবাসী মুসলিমদের ভালো থাকা মন্দ থাকা নিয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের খুদে সাক্ষাৎকার আয়োজনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। কথা বলেছেন হামমাদ রাগিব।
আপনি তো ইউরোপে বসবাস করছেন। গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডে যে নৃশংসতা ঘটে গেল, সে ব্যাপারে নিশ্চয় অবগত আছেন। তো ইউরোপ জুড়ে এই যে ইসলামবিদ্বেষের ছড়াছড়ি, এর কারণটা কী, আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।
১৫ মার্চের ঘটনার নৃশংসতায় আমরা আসলে বাকরুদ্ধ। কী বলব, খুঁজে পাচ্ছি না। তবে ইউরোপে যে হারে ইসলামোফোবিয়ার বিস্তার ঘটেছে এবং ঘটছে, সে দিকে লক্ষ করলে এমন ঘটনা স্বাভাবিকই বলতে হয়। বিশেষত বর্ণবাদীরা প্রচণ্ড মারমুখো রূপ ধারণ করছে দিনদিন। এমনটা চলতে থাকলে নিউজিল্যান্ডের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিংবা এরচেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে এখানে। ইউরোপে আমরা যাঁরা অভিবাসী মুসলিম, আমাদের ওপর এই বর্ণবাদীরা খেপে আছে। অভিবাসীদের দিনদিন উন্নতি, সফলতা এবং যোগ্যতার বিকাশকে তারা হিংসার চোখে দেখছে।
সেই সঙ্গে বর্ণবাদী এই শ্বেতাঙ্গরা ইসলাম ও অভিবাসী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। আশঙ্কা ও হতাশার বিষয় হচ্ছে পশ্চিমা নেতৃত্ব ও মিডিয়াগুলোও নানাভাবে তাদের সাপোর্ট দিচ্ছে। এই নিউজিল্যান্ডের ঘটনাটাই ধরুন না! যে নৃশংস তাণ্ডব ঘটল সেদিন, সেটাকে ঠিক ওভাবে উপস্থাপন করেনি পশ্চিমা কোনো মিডিয়াই। উল্টো আরও হামলাকারীদের ব্যাপারে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছে। টাইম ম্যাগাজিন তো মূল হামলাকারী ট্যারন্টের ব্যাপারে ঢালাওভাবে প্রচার করছে যে, এ ইতিপূর্বে খুব ভালো ছেলে ছিল। তাকে ‘অ্যাঞ্জলিক বয়’ বা ফেরেশতাতুল্য ছেলে হিসেবে আখ্যা দিয়েছে তারা। পাশাপাশি নানাভাবে এটা বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে, এমন ছেলে এই কাজ করতেই পারে না। করেও যদি থাকে, তবে তার মানসিক বিকারের কারণে করেছে।
তো এই পরিস্থিতিতে অভিবাসী মুসলিমরা খুব আতঙ্কের ভেতর দিয়ে সময় পার করছেন।
এই পরিস্থিতির প্রতিকারের জন্য কী করা যেতে পারে বা বিশ্বমুসলিম নেতৃত্বের কী করা উচিত বলে আপনারা মনে করেন?
এ ব্যাপারে বেশ কিছু তরুণের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, যারা ব্রিটেনের অভিভাসী মুসলিম পরিবারের সন্তান এবং ব্রিটেনেই তাদের বেড়ে ওঠা। তাঁরা আসলে বিশ্বমুসলিম নেতৃত্বের ব্যাপারে হতাশ। যার দরুণ মুসলিম নেতাদের কাছ থেকে তাঁরা খুব কিছু আশা করেন না। তাঁদের চাওয়া এবং চেষ্টা হলো, বিদ্যমান এই সমস্যার মুকাবেলায় নিজেরাই এগিয়ে আসা। নিজেদের কমিউনিটির লোকজনকে এ ব্যাপারে সোচ্চার করে তোলা। পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে তাদের মধ্যে ইসলাম-বান্ধব মনোভাব জাগিয়ে তুলতেই এই তরুণরা বেশি আগ্রহী। এবং এর মাধ্যমে নিজেদের এই সমস্যাগুলোর সমাধান তারা খুঁজে নিচ্ছেন।
আপনাদের দাওয়াতি কার্যক্রম বা দৈনন্দিন জীবনযাপনে আপনারা কি এ ধরনের ইসলাম বিদ্বেষের শিকার হন, সে ব্যাপারেও জানতে চাই।
ব্রিটেন তো জানেন একটা লিবারেল কান্ট্রি এবং বহুজাতিক মানুষের বসবাস এখানে। আইন-কানুনেও খুব নিয়মানুবর্তিতা। এসব কারণে আসলে আমাদের সাধারণ দাওয়াতি কার্যক্রমে ওভাবে কোনো বাধা আসছে না এখনো পর্যন্ত। ভিনধর্মী সাধারণ মানুষও আমাদের ব্যাপারে যথেষ্ট পজেটিভ। এই তো নিউজিল্যান্ডের হামলার পর ব্রিটিশ এক মহিলা আমাদের মসজিদে ফুল নিয়ে এসেছিলেন সহমর্মিতা জানাতে। তাছাড়া ব্রিটেনের পুলিশও ঘটনার পর প্রতিটা মসজিদ ঘুরে গেছে এবং আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে। জানতে চেয়েছে কোনোধরনের সমস্যা হচ্ছে কি-না।
মোটকথা ব্রিটেনে এখনও মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনযাপন বা সাধারণ দাওয়াতি প্রক্রিয়ায় ওইভাবে কোনো বাধা আসছে না, নির্বিঘ্নেই এসব কাজ আঞ্জাম দেওয়া যাচ্ছে, কিন্তু দিনদিন যেভাবে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে, আগামীর দিনগুলোতে নির্বিঘ্নতার এই পরিস্থিতি কতটা অটুট থাকবে সে-ব্যাপারে আমরা ভীষণ শঙ্কিত।
আরও পড়ুন : কেন বাড়ছে ইসলামোফোবিয়া, যা বলছেন আলেমরা
