রাগিব রব্বানি:
কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দিলেও নিচের স্তর ও স্বীকৃতির আগে দাওরা পাশকারীদের সার্টিফিকেট নিয়ে জটিলতা থেকে গেছে আগের মতোই। যার দরুণ প্রশাসনিকভাবে এই সার্টিফিকেটগুলোর সত্যায়ন করাতে গিয়ে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির প্রধানতম উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম ছিল সরকারিভাবে কওমি সনদধারীরা যাতে শিক্ষিত হিসেবে মর্যাদা পান। কারণ, এ শিক্ষাধারার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কোনো সংযোগ না থাকবার কারণে এতোকাল যাবত সরকারি পরিসংখ্যানে তাঁরা শিক্ষিত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হতেন না। অবশেষ ২০১৭ সালে কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসকে সরকারিভাবে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ফলে ২০১৭ সাল থেকে যারা আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হবেন, তাঁরা এ সার্টিফিকেট লাভ করবেন এবং এর মাধ্যমে নিজেদেরকে শিক্ষিত হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন। পাশাপাশি সার্টিফিকেটের অন্যান্য সুবিধাও লাভ করতে পারবেন।
কিন্তু যাঁরা ২০১৭-এর আগে দাওরা উত্তীর্ণ হয়েছেন এবং যাঁরা দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পাননি কিন্তু কওমি মাদরাসার মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হবার সার্টিফিকেট আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সরকারি পরিসংখ্যানে নিজেদের শিক্ষিত হিসেবে উপস্থাপনের কোনো সুরত নেই। ফলে অনেককেই ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
কওমি শিক্ষার্থীদের যারা দাওরার আগেই ভোটার হচ্ছেন তাদের ভোটার আইডিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার স্থানে কওমি শিক্ষাধারার নিচের স্তরগুলোর সার্টিফিকেট গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। একই সমস্যা থেকে গেছে কওমি পড়ুয়া অআলেম (যাঁরা দাওরার আগেই পড়াশোনা শেষ করে নিয়েছেন) এবং স্বীকৃতির আগে দাওরা সম্পন্নকারীদের ক্ষেত্রেও। কওমি মাদরাসা শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি এই তিন শ্রেণির কারোরই কোনো কাজে আসছে না।
এ ছাড়া স্বীকৃতির আগে দাওরা সম্পন্নকারীরা দেশে কিংবা প্রবাসে চাকরির প্রয়োজনে তাদের সার্টিফিকেটের সরকারি কোনো সত্যায়ন নিতে পারছেন না। এনামুল হাসান আরিফ নামে এক মাওলানা, যিনি ২০১২ সালে বেফাকের অধীনে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেছেন, তিনি জানান, প্রবাসে চাকরির প্রয়োজনে তাঁর মেশকাত ও দাওরার সার্টিফিকেট বেফাকের সত্যায়নসহ শিক্ষামন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন সরকারি সত্যায়নের জন্য। কিন্তু উভয় মন্ত্রণালয়ের কোনোটিই সার্টিফিকেট দুটো সত্যায়ন করেনি।
তিনি বলেন, সত্যায়নের জন্য আমার কাগজপত্র প্রথমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিই। সেখান থেকে জানানো হয় আগে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সিল লাগবে। কাগজপত্র আমি শিক্ষামন্ত্রণালয়ে জমা দিই। তারা জানায়, সরকারিভাবে এ দুই সনদে সিল দেবার নিয়ম নেই। সিল নিতে হলে আলিয়া মাদরাসার কাগজপত্র লাগবে।
অবশেষে তিনি দালালের মাধ্যমে উভয় মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় সত্যায়ন নেন তাঁর দুই সার্টিফিকেটে। কিন্তু কাতারের অ্যম্বেসিতে কাগজপত্র জমা দেবার পর সেখান থেকে তা ফেরত আসে। জানানো হয় সরকারি সিলগুলো জাল। জাল সিলে কাজ হবে না।
মাওলানা এনাম জানান, সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও কেবল সরকারি সত্যায়নের অভাবে কাতারে তাঁর চাকরিটা আটকে আছে। কীভাবে এর সুরাহা করা যায় তিনি ভেবে পাচ্ছেন না।
এদিকে গত বছরের শেষ দিকে আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ নতুন নিয়ম করেছে। নিয়ম অনুযায়ী যারা স্বীকৃতির আগে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেছেন তারা সরকারি সনদ নিতে হলে আগামী পাঁচ বছর হাইআর অধীনে যথারীতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হতে হবে।
কিন্তু অনেকে পরীক্ষা দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে থাকেন না, আবার কর্মক্ষেত্রে সরকার স্বীকৃত সার্টিফিকেটর প্রয়োজনও পড়ে—এসব দিক বিবেচনায় স্বীকৃতির আগে দাওরা ফারেগ আলেম, যারা বিভিন্ন বোর্ডের অধীনে দাওরার পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তাঁদেরকে বিশেষ ব্যবস্থায় কি হাইআতুল উলয়ার নতুন সনদ প্রদান করা যায় না? প্রশ্ন রেখেছিলাম হাইআতুল উলয়ার মজলিসে আমেলার সদস্য মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজুর কাছে।
উত্তরে তিনি বলেন, পূর্বের ফারেগান সবাইকে এভাবে সনদ প্রদান করে ফেললে ভালো হতো, আমরাও চাই। কিন্তু প্রক্রিয়াটা জটিল। কারণ, এ তরিকায় সনদ দিতে হলে দেশের সকল কওমি ফারেগদেরকে দিতে হবে। হাইআর অধিভুক্ত পাঁচ বোর্ড ছাড়াও অতীতে হাটহাজারী যাত্রাবাড়িসহ দেশের অনেক বড় বড় মাদরাসা বোর্ডের বাইরে থেকে নিজেদের মাদরাসায় এককভাবে পরীক্ষা নিয়েছে। ফলে হাজার হাজার আলেম এমন আছেন, যারা পাঁচ বোর্ডের কোনোটাতেই পরীক্ষা দেননি। এখন হাইআভুক্ত পাঁচ বোর্ডের পুরনো ফারেগদেরকে নতুন সনদ দিলে এদেরকেও দিতে হবে। দেওয়া দরকারিও। কিন্তু তাদেরকে দিতে হলে অনেক যাচাই-বাছাইয়ের দরকার পড়বে, মাদরাসায় মাদরাসায় যেতে হবে। প্রক্রিয়াটা জটিল, তাই এ নিয়ে এখনও হাইআর উচ্চ পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।
এদিকে দাওরার আগে ঝরে যাওয়া বা নিচের স্তরে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটের সরকারি স্বীকৃতির ব্যাপারে জানতে চাইলে মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, দাওরার স্বীকৃতির পাশাপাশি নিচের স্তরের জামাতগুলোর সনদের স্বীকৃতিও আসলে দরকারি। আমরাও চাচ্ছি নিচের স্তরগুলো স্বীকৃতি পাক। কিন্তু আমাদের মুরব্বি হজরতদের অনেকের এ ব্যাপারে অনীহা থাকবার কারণে ব্যাপারটা এখনও ঝুলে আছে। তবে আমরা এর গুরুত্বের ব্যাপারে তাদেরকে ওয়াকিবহাল করার চেষ্টা করছি, আশা করি এ ব্যাপারে সকলে একটা ঐক্যমতে পৌঁছতে পারব।
