কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি: কেন যৌক্তিক?

কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি: কেন যৌক্তিক?

মুসান্না মেহবুব :

বাংলাদেশে কাদিয়ানিদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি অনেক পুরনো। ওলামায়ে কেরাম বহু দিন ধরে এই দাবি জানিয়ে আসছেন। সম্প্রতি তাঁরা এ ব্যাপারে আরও সোচ্চার হয়েছেন। হেফাজত আমির আল্লামা আহমদ শফী এবং মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন মাহফিল ও জনসমাবেশে এই দাবিকে জোরালো করছেন। কিন্তু দাবি পূরণে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাসবাণী শোনানো ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা কেন জরুরি এবং এর যৌক্তিকতা কতটুকু জানতে চেয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক আলেমের সঙ্গে কথা হয়েছে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে। তাঁরা বলছেন, কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা এ দেশের মুসলমানদের সাংবিধানিক অধিকার। তাছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা না করা হলে কাদিয়ানিরা মুসলিম পরিচয়ে হজ ও ওমরা পালনের সুযোগ পায়, যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। পাশাপাশি মৃত্যুর পর মুসলমানদের কবরস্তানে তাদেরকে দাফন করার আইনি বৈধতা থেকে যায়। এ ছাড়া মুসলমানদের মতো করে ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের আইনি সুযোগ তারা অবাধে গ্রহণ করতে পারে, যা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন : কাদিয়ানি প্রতিরোধ : অগ্রগতি নেই কেন?

রাজধানীর শায়খ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও দেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতী মাওলানা মিজানুর রহমান সাঈদ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তো কাদিয়ানিরা কাফের হবার বিষয়টা পরিস্কারই। কারণ, তারা যে আকিদা ও বিশ্বাস লালন করে এর মাধ্যমে কুরআনের আড়াই শ’য়ের মতো আয়াতকে সরাসরি অস্বীকার করে। আর আকার ইঙ্গিতে অস্বীকার করে আরও দু শ’র মতো আয়াত। এ ছাড়া অসংখ্য হাদিসের অস্বীকারকারী তারা। যেখানে কুরআনের একটি আয়াত অস্বীকার করলেই কেউ কাফের হয়ে যায়, সেখানে কয়েক শো’ আয়াত অস্বীকারকারী যে কাফের, এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

মুফতী সাঈদ বলেন, এখন আসেন রাষ্ট্রীয়ভাবে কেন আমরা তাদের অমুসলিম ঘোষণা করার দাবি করছি সে ব্যাপারে। এ ক্ষেত্রে প্রথম কথা হলো, কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা সাংবিধানিক দায়িত্ব। সংবিধানের নীতিই বলছে, এদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে।

কীভাবে? এর উত্তরে মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ বলেন, আমাদের দেশের সংবিধান বলছে, প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীকে স্বাধীনভাবে তার ধর্ম-কর্ম পালন করতে দিতে হবে। ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করতে হবে। অথচ আমরা সেটা পারছি কই? কাদিয়ানিরা কাজের বেলায় স্বতন্ত্র একটি ধর্ম হিসেবে কাজ করে, তাদের অনেক বিশ্বাস ও নীতি আছে, যা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অথচ তারা নাম ব্যবহার করে ইসলামের। ইসলামের সব পরিভাষা ব্যবহার করে তারা কাজ করে। তাদের প্রার্থনালয়ের নাম দেয় মসজিদ, ধর্মগ্রন্থের নাম দেয় কুরআন, আমাদের নবিকে শেষ নবি না মেনেও প্রচারণা চালায় আমাদের নবিকে শেষ নবি মানে।

তিনি বলেন, এ ছাড়া ইসলামের প্রার্থনা ও সকল রীতি-নীতির নামানুসারে তাদের প্রার্থনা ও রীতিনীতির নাম রাখে। ফলে সাধারণ মুসলিম তাদের এই কর্মকাণ্ডে ধোঁকা খেয়ে তাদের দলভুক্ত হয়ে যায়। আর ওলামায়ে কেরাম প্রতিবাদ করলে তারা এর বিরুদ্ধে লেগে যায়। স্বাধীনভাবে প্রতিবাদটাও করতে দেয় না। ফলে আমাদের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

মুফতী মিজান বলেন, কাদিয়ানিদের যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়, তাহলে আমাদের ইবাদত ও রীতিনীতির নামানুসারে তারা তাদের ধর্মের ইবাদত ও রীতিনীতির নামকরণ করতে পারবে না। সাধারণ মুসলিমও আর ধোঁকা খাবে না। তারা বুঝতে পারবে, ওরা যা করছে তার সঙ্গে ইসলামের কোনো সংশ্লেষ নেই। ফলে আমাদের ধর্মীয় অধিকারও আর ক্ষুণ্ন হবে না, যে ব্যাপারে সংবিধানে বলা আছে।

আরও পড়ুন : দেশজুড়ে যেভাবে তৎপর কাদিয়ানি সম্প্রদায়

এদিকে বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন অন্য আরেকটি প্রয়োজনীয়তার দিকে আলোকপাত করেন। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, কাদিয়ানিদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা না করলে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে মুসলিমদের। কারণ, রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা না থাকার কারণে কাদিয়ানিরা নিজেদের মুসলিম পরিচয় প্রদানের সুযোগ পায়। আর এই পরিচয়কে ব্যবহার করে তারা হজ ও ওমরার মতো ইসলামের একান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদতে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। অথচ অমুসলিমদের জন্য হজ ও ওমরা পালনের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মুসলিম পরিচয়ের কারণে তারা এই সুযোগটা ব্যবহার করে। এ ছাড়া কাদিয়ানিদের মৃত্যুর পর তাদেরকে মুসলিমদের কবরস্তানে দাফন এবং জানাজা পড়ার আইনি বৈধতাও তারা পেয়ে যায় এই পরিচয়ের কারণে। তাই তাদেরকে এই কাজ থেকে নিবৃত করতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার কোনো বিকল্প নাই।

ড. আ ফ ম খালিদ আরও বলেন, কাদিয়ানিদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার নজির পাকিস্তানে রয়েছে। দেশটিতে কাদিয়ানিরা স্বতন্ত্র ধর্মাবলম্বী হিসেবে বসবাস করছে। বেশ কিছুদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি আদালতেও একটি মামলায় আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আল্লামা তকি উসমানি এটা প্রমাণ করেছেন যে কাদিয়ানিরা অমুসলিম। ওই আদালতের খ্রিষ্টান বিচারক আল্লামা তকি উসমানির যুক্তিতর্ক থেকে কাদিয়ানিরা অমুসলিম ঘোষণা করে রায় দিতে বাধ্য হয়েছেন।

ড. আ ফ ম খালিদ বলেন, সুতরাং আমরা মনে করি, এই সকল কারণ বিবেচনায় কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।

এদিকে মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়টি উত্থাপন করে আরও একটি দিকে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশের সংবিধান অনুযায়ী সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। দেশের অধিকাংশ জনগণ যা বলে রাষ্ট্রকে সেটাই কার্যকর করতে হবে। যদিও এ নীতিটা ইসলাম-বিরোধী এবং মুসলিম হিসেবে আমরা এ নীতি বিশ্বাস করি না। কিন্তু রাষ্ট্রের সংবিধানে এটা আছে। সরকার এ সংবিধান অনুযায়ীই চলতে বাধ্য। অতএব এ নীতি অনুযায়ী যদি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গণভোট হয়, বা ন্যুনতম পক্ষে সাধারণ জরিপও চালানো হয়, তাহলে এ দেশের ১৭ কোটি মুসলমানের মধ্যে কমপক্ষে সাড়ে ১৬ কোটির রায় থাকবে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার পক্ষে। কারও যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে আমরা চ্যালেঞ্জ করলাম, গণভোটের আয়োজন করে বা জরিপ চালিয়ে দেখতে পারেন। সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাওয়াকে উপেক্ষা করে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা থেকে নিবৃত্ত থাকা সরকারের জন্যও সংবিধানের পরিপন্থী।

তিনি বলেন, অতএব সংবিধান লঙ্ঘন থেকে সরে আসার জন্য হলেও বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমরা জোর দাবি জানিয়ে আসছি কাদিয়ানিদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করার।

আগের সংবাদট্রাম্পের ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা’: আরব লীগের দায়সারা প্রত্যাখ্যান
পরবর্তি সংবাদকাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনে নামছেন আলেমরা