
রাগিব রব্বানি :
বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামে সেই আশির দশক থেকে সোচ্চার ও সচেতন ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সদ্যপ্রয়াত যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীন। তখন তিনি টগবগে তরুণ। নতুন বাংলাদেশে স্তিমিত হয়ে যাওয়া ইসলামি আন্দোলন ও রাজনীতির পুনর্জীবন দানকারী মনীষী আলেম হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর একান্ত স্নেহের ছায়া পেয়ে সেই সময়টায় ধন্য হয়েছিলেন তিনি। আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর বলিষ্ঠতা এবং আগ্রহই মূলত হাফেজ্জী হুজুরের একান্ত করে তুলেছিল তাঁকে।
বাগেরহাটের মফস্বল এলাকা মোড়েলগঞ্জে ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে এক আলেম পরিবারে জন্ম মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীনের। বাবা মাওলানা আবদুল আলি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের আলেম। পড়াশোনা শেষ করে নিজের এলাকায় একটি মাদরসা প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা আবদুল আলি। এটিএম হেমায়েত উদ্দীনের প্রাথমিক পড়াশোনার হাতেখড়ি বাবার প্রতিষ্ঠিত সেই মাদরাসাতেই। তারপর খুলনা শিরোমনি মাদরাসায় হিফজুল কুরআন সমাপ্ত করে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কিশোর হেমায়েত প্রথমবারের মতো ঢাকা আসেন। তারপর পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এবং কর্মজীবনের ব্যস্ততা তাঁকে আর ঢাকা ছাড়তে দেয়নি।
ঢাকা এসেছিলেন মূলত পশ্চিম রাজাবাজার মসজিদে রমজানে তারাবি নামাজ পড়ানোর জন্য। রমজান শেষে পড়াশোনার জন্য ঢাকাতেই তিথু হয়ে যান। ঢাকা আলিয়ায় কিছুদিন অধ্যয়ন করেছেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজের ওপর পড়াশোনা কমপ্লিট করেন। যে মসজিদে তারাবি পড়ানোর জন্য ঢাকা এসেছিলেন তিনি, পরবর্তীতে সেই মসজিদে ইমাম হিসেবেও নিযুক্তি লাভ করেন। কর্মজীবনে ইমামতির পাশাপাশি ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম রাজাবাজার হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। মালিবাগের আবুজর গিফারি কলেজ এবং রামপুরা একরামুন্নেছা ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনাও করেছেন পর্যায়ক্রমে।
ঢাকা আলিয়ার ছাত্র থাকাকালেই আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। আশির দশকের শুরুতেই জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া নামক মাদরাসাছাত্রদের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠনের টানা তিন সেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রদের ১৭ দফা দাবি আদায়ে নানা কর্মসূচি ও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এ সময়। তাঁর ঐকান্তিক সংগ্রামের ফলে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড স্বায়ত্তশাসন লাভ করে।
তারপর হজরত হাফেজ্জী হুজুর যখন তওবার রাজনীতির ডাক দেন, তিনি তখন ইসলামানুরাগী যুবসমাজকে নিয়ে হাফেজ্জী হুজুরের তওবার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। হাফেজ্জী হুজুরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নির্বাচনী প্রচারে যুবনেতা হিসেবে রাখেন অনন্য ভূমিকা। তারপর এ দেশের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটা অধ্যায়েই কেন্দ্রীয়ভাবে ভূমিকা রাখতে থাকেন এটিএম হেমায়েত উদ্দীন।
হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনে ভাঙনের পর ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের (বর্তমান ইসলামী আন্দোলন) সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তারপর থেকে এই দলেই নিজের ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও সংগ্রামের সমস্তটুকু ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি। ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকল আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদে বাংলাদেশে গর্জে ওঠা আন্দোলনের সময় তৎকালীন সরকার কর্তৃক নিপীড়িত হয়ে কারাভোগও করেছেন বেশ কিছু দিন। ২০০২ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আশি ও নব্বইয়ের দশকের ইসলামি আন্দোলন-সংগ্রামের নীরব সাক্ষী, ইসলাম বিষয়ক লেখক ও সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিনকে আমরা ‘হেমায়েত ভাই’ বলেই ডাকতাম। দীর্ঘকাল ধরে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, পরে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাকে বেশিরভাগ সময়ই কোনো দলের মানুষ বলে মনে হতো না। ইসলামী রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ও সোচ্চারকণ্ঠ মানুষটি ছিলেন ইসলামের পক্ষের সব রকম দলমতের মানুষদের জন্যই সমন্বয়কারী ও ঐক্যপ্রয়াসী একজন নেতা। বক্তব্যের কন্ঠে অত্যন্ত বলিষ্ঠ এই ব্যক্তিত্ব আচরণ ও আলাপচারিতায় ছিলেন খুবই সদাচারী ও নিচুকন্ঠ মানুষ। ১৯৮৪/৮৫ সালের দিকে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নেতৃত্বে গঠিত সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের মিছিল-মিটিংয়ে তাকে প্রথম দেখি। ‘জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়া’ নামের একটি সংগঠনের প্রধান ছিলেন তিনি। ওই সংগঠনটি সংগ্রাম পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি তখন একজন উদ্দীপনাপ্রাণ যুবক। পাঞ্জাবী, প্যান্ট, মাথায় জিন্নাহ টুপি। রাজপথে তার স্লোগান ও বক্তব্যের সময় মাইকের প্রয়োজন হতো না।… দীর্ঘকাল ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ঢাকা মহানগরীর সভাপতি ছিলেন। বহুবার বহু মিটিং মিছিলে তাকে দেখিছি। ঘরোয়া মজমায়, চলার পথে, রাতে বাসায় ফেরার সময় লোকাল বাসে তার সাথে দেখা হয়েছে। দেশের পরিস্থিতি ও ইসলামী আন্দোলন নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। দলীয় গন্ডির বাইরে সর্বদলীয় একটি উদ্বেগ ও কন্ঠ তার মধ্যে লক্ষ করেছি সব সময়। দল বা সংগঠনের চেয়ে দেশ ও ইসলামের জন্যই কথা বলতেন বেশি।’
শরীফ মুহাম্মদ বলেন, ‘আমার কাছে মাঝে মাঝেই মনে হতো তিনি একটি দলীয় প্লাটফরমে আছেন। কিন্তু ইসলামের জন্য রাজনৈতিক ময়দানে কিছু করার জন্য সর্বদলীয় মেজাজটা পুরোপুরি লালন করেন। সমন্বয়কারী ও ঐক্যপ্রয়াসী এই হাসিখুশি মানুষটির সঙ্গে গভীর পরিচয় ছিল দল-মত পর্যায়ের বহু মানুষের।’
ক্যান্সার জনিত সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছিলেন, দেশবিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন। সর্বশেষ মাসখানেক আগে ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। মোটামুটি সুস্থই ছিলেন এই কদিন। কিন্তু গত ১১ অক্টোবর, ২০১৯ সালের সকালের দিকে ঢাকাস্থ নিজ বাসায় দলের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে একান্ত আলাপকালে হঠাৎই অসুস্থতা বোধ করেন। এবং কিছুক্ষণের ভেতর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে চির বিদায় জানান পৃথিবীর সব স্বপ্ন সংগ্রাম এবং ব্যস্ততাকে।
তাঁর ইন্তেকালে দলমত নির্বিশেষে সকলেই শোকাহত হয়েছেন। ইসলামি ঘরানার প্রাজ্ঞ লেখক, সম্পাদক ও চিন্তাবিদ মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী তাঁর ইন্তেকালে শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের মুসলমানদের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য তিলে তিলে নিজের পুরো জীবনটিই দান করে গেছেন অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীন ভাই। উদার ধৈর্য্যশীল নির্লোভ বিনয়ী নম্র ভদ্র কোমলমনা নিরহংকার এ মানুষটি ভোলার মতো নন। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা ও মিশুক সদালাপী রাজনৈতিক ব্যক্তি। বড়দেরও তাঁর জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। আল্লাহ তাঁর মাগফিরাত করুন। তাঁকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। তাঁর সাথে ভালোবাসা ও সম মানসিকতা পোষণকারী মুমিন নারী-পুরুষদেরও কবুল করুন।’
