মুনশি নাঈম:
নব্বইয়ের দশকের পর ইন্টারনেট আমাদের জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। সামাজিক জীবন থেকে ধর্মীয় জীবন—সবক্ষেত্রে ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে কাজ সম্পাদনের অন্যতম মাধ্যম। ধর্মীয় জিজ্ঞাসা এবং প্রশ্নের উত্তর পেতেও মানুষ এখন শরণাপন্ন হচ্ছে ইন্টারনেটের। বিশেষ করে যাদের মাদরাসায় পড়ার সুযোগ নেই, যাদের কোনো মুফতির সঙ্গে যোগাযোগের উপায় নেই, তারা তাদের ইসলামি জিজ্ঞাসা এবং চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়তই ঢুঁ মারছে ইন্টারনেটে। ব্লগ, ওয়েবসাইট, পোর্টাল, পত্রিকা ডিজিটাল সব মাধ্যমে এখন ধর্মীয় বিভাগটিকেও খুব গুরুত্ব সহকারে রাখা হয়। টিভির লাইভ অনুষ্ঠানে রাখা হয় ইমেইলে বা লাইভে প্রশ্ন করার সুযোগ।
মানুষ ইসলাম সম্পর্কে যতটুকুই জানুক, আরও বেশি জানতে ইন্টারনেটকেই বেছে নিচ্ছে খুব সহজে। বিশেষ করে নারীরা, যারা আলেমদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারে না, তাদের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠছে এই ডিজিটাল আয়োজন। মানুষের ইসলাম-জিজ্ঞাসার সমাধান দিতে, দ্বীন-প্রশ্নের উত্তর দিতে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল ইফতা বিভাগ খোলা হয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারে, ওপ্রান্তে ইসলামিক স্কলারগণের সাহায্যে সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়।
সঠিক ব্যাখ্যা এবং সমাধান সরবরাহের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট নির্ভরতা কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়ে আলেমগণ শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তাই এখন দেখা যায় ইসলামি সমাধান সরবরাহের ওয়াবসাইটগুলো হয়তো কোনো আলেমের সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিংবা স্বীকৃত কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত, অথবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত। বিশেষ ধারা, সংগঠন বা ব্যক্তি কেন্দ্রিক ফতোয়া দানের প্রবণতাও কম নয়। তারা মানুষের নিত্য-নৈমত্তিক প্রশ্নগুলোর সমাধান দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বদাই তৎপর এবং নতুন নতুন মান এবং উপায় খুঁজে বের করছে। এভাবে ধর্মীয় ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে দ্রুত বিশেষ রুপান্তর ঘটছে।
কারা, কী খুঁজছে?
আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ডা. ইসকান্দার কায়রো বলেছিলেন, ‘বিশেষ করে যে নারী পারিবারিক সমস্যার সম্মুখীন হয়, যে কর্মচারী বসের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়, রাষ্ট্রের নির্যাতনের শিকার হয় যে নাগরিক—তারাই সবচে বেশি ইন্টারনেটে এ বিষয়ে ইসলামিক সমাধান খুঁজেন। যদিও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামের নিয়ম-কানুন ক্রমশই লঙ্ঘন হচ্ছে, তবুও মানুষের ভেতর ইসলামকে জানার অদম্য এক স্পৃহাও জাগছে। তাই তারা তাদের দৈনন্দিন কাজের ফলাফল, আখেরাতের নির্দেশনা পেতে দারস্থ হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমের।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘মানুষ এমনকি তার অতীত পাপ, ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনা, মানসিক চাপ, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও ইসলামের সমাধান জানতে চাইছে ইন্টারনেটে। সমাধান জানতে চাইছে স্বপ্নের ব্যাখ্যারও। ‘
ডিজিটাল মাধ্যমে আলেমদের জন্য সুবিধা
যারা ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন, তাদেরও জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হয়। তাদের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন দুয়ার উন্মোচন হয়। তারা আধুনিক সমাজ, সময়, চিন্তা, দর্শন সম্পর্কে আরও বেশি অবগত হতে পারেন কেবল ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তারা খুব সহজেই বিভিন্নজনের বিভিন্ন মত পড়ে দেখতে পারেন। ফলে তাদের দেখার এবং ভাবার দৃষ্টিভঙ্গির বৃত্ত বড় হতে থাকে।
ডিজিটাল মাধ্যমে ফতোয়ার আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, এখানে কোনো সীমানা এবং দেশের মধ্যে আটকে থাকতে হয় না। বরং যার যার সমস্যা অনুযায়ী তাকে সমাধান দেয়া হয়। এখানে ইসলামি আইনকে একজন মানুষের জীবন রিলেটেড করে বয়ান করা হয়। সেটা সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক হোক।
ডিজিটাল মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে গিয়ে সমাধানপ্রার্থীর জন্য সবচে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ধন্দে পড়ে যাওয়া। এই বিস্তৃত প্লাটফর্মে একই বিষয়ে বিভিন্নজনের বিভিন্ন মত দেয়া আছে। সেইসব মত থেকে সবচে বেশি কোরআন-হাদিস সমর্থিত জোরালো মতটি বুঝে উঠতে তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তার মস্তিস্কে চাপ পড়ে। এবং এখানে ভুল করার সম্ভাবনাও অনেক। পরিস্থিতিভেদে কঠোর বা শিথিল মত গ্রহণের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
আর উত্তরদাতাদের জন্য সবচে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হওয়া। এমন এমন বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, যে বিষয়ে হয়তো তিনি কখনো ভাবেনইনি। কিংবা ওই বিষয় সম্পর্কে তার জানাশোনা নেই। তাই বিপাকে পড়তে হয়। কারণ ফতোয়া ব্যক্তির পরিবেশ এবং অবস্থা না জেনে দেয়া যায় না। পাশাপাশি আপেক্ষাকৃত কঠোর ও শিথিল ফতোয়ার দিকে মানুষের আগ্রহ বেশী থাকায় মধ্যপন্থা বাঁধাগ্রস্থ হয় অনেক ক্ষেত্রে। ফেইক আইডির আড়াল থেকে অনেক সময় আক্রমণের শিকার হতে হয়।
চ্যালেঞ্জ কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়
চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের একটিই পথ—বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরী করা। যেন যে বিষয়ে প্রশ্ন, উত্তরটা কেবল ঐ বিষয়ের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই দেন। সবার সব প্রশ্নের দিতে হলে সমস্যা আরও প্রকট হবে। যেমন কেউ ইসলামি মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ, কেউ ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ, কেউ ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, কেউ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। তাহলে প্রশ্ন যত নতুনই হোক, বিশেষজ্ঞ তার সঠিক উত্তর খুঁজে বের করতে পারবেন।
মানুষ এখন ইন্টারনেটের দিকে ঝুঁকছে। মুফতিদের কাছে যত মানুষ মাসআলা জানতে চাইছে, তারচেয়ে বেশি মানুষ সমাধান খু্ঁজে নিচ্ছে ইন্টারনেটে। মানুষের চাহিদার তুলনায় ইন্টারনেটের খুচরো সমাধান খুবই অপ্রতুল। একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেটে জোয়ারের এই সময়ে ডিজিটাল মাধ্যম এখন মানুষের সবচে নাগালে। সুখে-দুখে, হাসি-আনন্দে তারা এই মাধ্যমের দারস্থ হয়। তাই এই ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষ যেন সঠিক ইসলামি সমাধানটাই পায়, এজন্য অভিজ্ঞ ইসলামিক স্কলারদেরও এগিয়ে আসা দরকার।
