ফতোয়া ও ফতোয়াবাজী : সমকালীন বাংলাদেশে ফতোয়ার চর্চা

ফতোয়া ও ফতোয়াবাজী : সমকালীন বাংলাদেশে ফতোয়ার চর্চা

সাবের চৌধুরী :

সমকালে ফতোয়া চর্চার আলোচনায় প্রবেশের আগে ফতোয়ার পরিচয় সংক্রান্ত ছোট একটা ভূমিকার দরকার আছে বোধ করি। আমি এখানে অ্যাকাডেমিক সংজ্ঞায়নের দিকে যাচ্ছি না। বরং, ফতোয়ার গভীর মর্মার্থ থেকে দর্শনগত দুইটি দিক সামনে আনছি। এর একটি হলো—ফতোয়া মানে মানুষের জীবন সংশ্লিষ্ট কোন ক্ষেত্রে শরীয়তের সিদ্ধান্ত। শরীয়ত প্রণেতা হলেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা। সুতরাং, একজন আলেম যখন ফতোয়া দিচ্ছেন, এর অর্থ দাঁড়ায় তিনি বলছেন যে, এটি আল্লাহ তাআলার সিদ্ধান্ত। এ জন্য ফিকহের ভাষায় ফতোয়াকে বলা হয় ‘তাওকী মিনাল্লাহ’, বা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে স্বাক্ষরকারী। আমার মনে হয় না এরপর আর ফতোয়া যে একটি স্পর্শকাতর গুরু দায়িত্ব, তা আর বুঝিয়ে বলার দরকার আছে। দ্বিতীয় দিকটি হলো—ফতোয়া হলো ‘আর রুখসাতু মিন সিকাতিন’, বা শরীয়ত-বিশেষজ্ঞ নির্ভরযোগ্য কোন পণ্ডিত ব্যক্তি থেকে শরয়ী সিদ্ধান্তের সহজায়ন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিস্কার করে বলেছেন : তোমরা লোকদের জন্য দীনকে সহজ করো; কঠিন করো না। এ ছাড়া আরো আরো অনেক বক্তব্য আছে এ সংক্রান্ত।

এ দুটি দিক সামনে রাখলে আমরা দেখি একজন আলেম ফতোয়া প্রদানের সময় একটি দ্বান্দ্বিক অবস্থানে থাকেন। একদিকে সিদ্ধান্তটিকে শরীয়তের টেক্সট ও মূলনীতিসমূহের আলোকে শতভাগ সঠিক রাখার চাপ, অপরদিকে মানুষের জন্য যথাসম্ভব সহজ পথটি বের করে নিয়ে আসার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। কোন একদিকে চাপ বেশি হয়ে গেলে সেই ফতোয়া প্রশ্ন ও সংকট তৈরী করে। এখানে এসেই দেখা দেয় যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার প্রশ্ন। এটা একটা লম্বা আলোচনা। সেদিকে না গিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, ফতোয়া প্রদানের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হলেন একজন মুজতাহিদ, যার শরীয়তের ব্যাপারে স্কয়ার নলেজ আছে এবং বিশ্বস্ততা আছে। প্রশ্ন হলো এর সর্বোচ্চ সীমা কতটুকু? এবং সর্বনিম্ন লেভেল কী? সংক্ষিপ্ত শব্দে একে আটকে ফেলা আসলে মুশকিল। এর চেয়ে সাধারণ একটা কথা বলা যাক—একজন মুফতি তাঁর ধর্মচর্চা ও অ্যাকাডেমিক দক্ষতা—এ দুইয়ের পরিমাণ দিয়ে সমকালের অ্যাকাডেমিক পরিসরে নিজের অবস্থানটি গ্রহণ করেন, এবং পরবর্তী সময়েও তা জারি থাকে। এখানে একটা মুশকিলের ব্যাপার আছে। আমাদের দেশের গণমানুষ ফিকহ, ফতোয়া, ইজতেহাদ, মুজতাহিদ ইত্যাদি শব্দগুলোর মর্ম বোঝেন না। ফলে এর ব্যাপ্তি, গভীরতা ও জটিলতার ব্যাপারটি তাদের বোধের আওতার বাইরে। তাদের কাছে বড় আলেম বা মুফতি হওয়ার অন্য নানা হিসাব আছে। ফলে সমকালে অ্যাকাডেমিক পরিসরের স্বীকৃতি ও গণপরিসরের গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে অনেক সময় একটা কনফ্লিক্ট হতে দেখি। এবং এখান থেকে সমাজের মধ্যে বিক্ষিপ্ততা ও দুর্যোগ তৈরী হয়। এই দ্বন্দ্বটি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জনসাধারণকে ইসলামি জ্ঞান ও এর মৌলিক উৎসগুলোর পরিচয় সম্পর্কে সাধারণভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ আমি দেখি না।

ফতোয়ার ক্ষেত্রে একদিকে যেমন সঠিক তথ্য গ্রহণ করতে হয়, তেমনিভাবে সেই তথ্য পরিবেশনের সময় বিচক্ষণতাকে কাজে লাগানো একটা বড় বিষয়। এক্ষেত্রে ফতোয়াপ্রার্থী, পরিবেশ ও সময়কে বিবেচনায় না নিলে অনেক সময় সেই ফতোয়া সংকট তৈরী করে। উদাহরণত, কিছুদিন আগে প্রজেক্টরে নারীগণ পুরুষ ওয়ায়েজকে দেখতে পারবে কি না—এ নিয়ে ধুন্দুমার কাণ্ড ঘটে গেছে। অথচ, বিষয় এখানে খুব সহজ ছিল। এখানে দুইটি বিষয় : এক হলো নারীগণ পুরুষগণের চেহারা হাত পা ইত্যাদি প্রয়োজনে দেখতে পারবে। আরেকটি হলো—পুরুষ যেমন নজরের হেফাজত করতে হয়, তেমনি নারীগণকেও নজর হেফাজত করতে হয়। এ দুইটি বিষয় সামনে রাখলে সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়—স্বাভাবিক চলাফেরা ও জীবন যাপন করতে গিয়ে যতটুকু আবশ্যকীয়ভাবে নজরে পড়ে যাবে, ততটুকু দেখাতে সমস্যা নেই। কিন্তু ইচ্ছা করে আনন্দ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে না। ফতোয়া যখন পাবলিক পরিসরে আলোচনা করা হবে, তখন অবশ্যই নানা দিক বিবেচনা করে অত্যন্ত হেকমতের সাথে করতে হবে। সাথে আলী রা.-এর সেই কথাটিও মনে রাখা দরকার—তোমরা লোকদের মেধা ও সমঝ অনুপাতে কথা বলো। অপরদিকে একজনকে বলতে শুনলাম, নারীগণ পুরুষের চেহারা দেখতে পারবে না, এটাই উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত তিনি কোথায় পেলেন কে জানে।

বাংলাদেশে ফিকহের চর্চা ছিল অনেক আগে থেকেই। পুরনো মাদরাসাগুলোর ফতোয়া বিভাগ এ কাজটি আঞ্জাম দিয়ে আসছে। আমরা স্বনামধন্য অনেক মুফতিকে পেয়েছি এই দেশে। বর্তমানেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজন মেটনোর মতো মুফতি ও ফতোয়াচর্চাকারীগণ রয়েছেন, পাশাপাশি আমাদের জাতীয় পর্যায়ের বিষয়গুলো ডিল করার মতো লোকজনও রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় মুফতি আবদুস সালাম চাটগামী, মুফতি কেফায়াতুল্লাহ, মুফতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, মুফতি আবদুল মালেক, মুফতি দেলওয়ার হুসাইন, মুফতি আবু সাইদ, মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ প্রমুখ। তবে, এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে বেশি দিন হয়নি। এখানে অনেক আশার বাণী আছে, আবার এ কথাও সত্য এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক খুব মজবুত ভিত গড়ে ওঠেনি। গবেষণার উৎকর্ষের সাথে সামাজিক স্থিতিশীলতার একটা সম্পর্ক আছে। সেই সাথে আছে আর্থিক স্বচ্ছলতার সম্পর্ক। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, বাংলাদেশের এক ক্রিকেট ছাড়া আর কোন অঙ্গনেই আন্তর্জাতিক মানে উৎকর্ষ সাধিত হয়নি। সুতরাং, বাংলাদেশের ইসলামি অ্যাকাডেমিয়াকেও এই বিবেচনাটি সামনে রেখেই মূল্যায়ন করতে হবে। বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে মূল ধারার গবেষকদের সামনে এগুলো বাধা হয়ে আছে। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে ফিকহ চর্চার বড় একটি দুর্বলতার জায়গা হলো এখন পর্যন্ত আমাদের জাতীয় পর্যায়ে কোন ফিকহি বোর্ড নেই। মাঝে একবার শোনা গেলেও পরবর্তীতে আর কোন সংবাদ তেমন শোনা যায়নি।

আহলে হাদীস উলামায়ে কেরাম যখন এই দেশে এসে বিশেষ কিছু মাসআলা নিয়ে প্রচলিত মতের বাইরে গিয়ে ফতোয়ার প্রচার শুরু করলেন, তখন এক রকমের অস্থিতিশীলতা তৈরী হয়েছিল, যার জের এখনো চলমান। আমি সে দিকে না গিয়ে আরেকটি বিষয় বলি। তাদের এই কর্মপ্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব সীমিত সামর্থ নিয়ে, এবং প্রায়শ কোন রূপ সামর্থ ছাড়া শুধু বাংলা অনুবাদ-নির্ভর করে ফিকহ নিয়ে কথা বলা ও সিদ্ধান্ত প্রদানের বিশেষ একটি প্রবণতা গড়ে তুলেছিল। এ দেশের উলামায়ে কেরামের যত না আপত্তি বিশেষ মাসআলাগুলোর সিদ্ধান্ত নিয়ে, তার চেয়ে বেশি আপত্তি ছিল এই প্রবণতাটি নিয়ে। একে রোধ করতে গিয়ে মাঝে মাঝে তাদের বক্তব্য অসঙ্গত হয়েছে, কিন্তু তাদের মূল আপত্তির জায়গাটিকে এড়িযে যাবার কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না।

আরেকটি বিশেষ দিকে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এবং বর্তমানে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এটি আরো প্রকটভাবে নজরে পড়ে, আমাদের দেশের গণমানুষের মধ্যে এক ধরনের ফতোয়া চর্চার প্রবণতা আছে। সমকালে বিশেষত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লোকদের মধ্যে এটি বোধকরি সবচেয়ে বেশি। এখানে সাধারণত কিছু পূর্বসিদ্ধান্ত থাকে। যেমন, নিজস্ব সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দর্শন, সম্প্রীতি, মানবিকতা, সমতা, স্বাধীনতা, প্রগতি, উন্নয়ন ইত্যাদি। সমাজের কাছে এগুলোর নিজস্ব কিছু বিশেষায়িত ব্যাখ্যা আছে। এগুলোর জন্য তারা ধর্মের সাথে কোনরূপ কম্প্রোমাইজ করতে রাজি না। ফলে, যেখানে গিয়ে ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে গিয়ে তারা নিজেদের মতো করে ফতোয়া দিয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের জ্ঞানগত তর্কে সূক্ষ্মতার উপর একান্ত জোর দিলেও ধর্মীয় বয়ান প্রস্তুত করার সময় লোকগুলো এক রকমের উদার ও সরলমনা হয়ে পড়েন। এখানে সহযোগী হিসেবে একটি জিনিসের উপস্থিতি দেখা যায়, ফিকহের ভাষায় একে বলা হয়—‘তাতাব্বুউর রুখাস ওয়াশ শুযূয’। অর্থাৎ, বিভিন্ন ফিকহি অ্যাকাডেমির বিশেষ ছাড়মূলক সিদ্ধান্ত ও বিচ্ছিন্ন দুর্লভ মতগুলোকে খুঁজে খুঁজে বের করে সেগুলোকে কাজে লাগানো। মুজতাহিদগণ একে ‘তালাউব বিদদীন’ বা দীন নিয়ে খেলা করণ বলে উল্লেখ করেছেন। উদাহরণত, সম্প্রতি মিল্কব্যাংক, বাদ্যসহ গান, পর্দা, হিন্দুদের পূজায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে গণপরিসরে উঠে আসা সংলাপগুলোতে নজর দিলে বিষয়টি খেয়াল করা যায়। এখানে শরিয়ত বয়াতির মতো কুসংস্কারাচ্ছন্ন একজন লোকও গানের ব্যাপারে ফতোয়া দিচ্ছেন। পারভেজ আলমের মতো শাহবাগের মুখপত্র দিচ্ছেন নানা ধর্মীয় সিদ্ধান্ত। অ্যাকাডেমিক দক্ষতা থাকলে যে কেউ ফিকহি সিদ্ধান্তের বিতর্কে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না এই প্রশ্ন সঠিক নয়। কারণ, ফতোয়া শুধু অ্যাকাডেমিক দক্ষতার উপর নির্ভর করে না; এখানে বিশ্বস্ততার প্রশ্ন আছে, ব্যক্তিজীবনে ধর্মচর্চার বিষয় আছে। ফতোয়ার সাথে এগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী রহ.-এর একটি মন্তব্য আছে—‘এই জ্ঞান হলো তোমাদের দীন। সুতরাং তোমরা তোমাদের দীন কার থেকে গ্রহণ করছো, দেখে নিয়ো।’ তাছাড়া, অ্যাকাডেমিক দক্ষতা কতটুকু উপস্থিত থাকছে, তা তো বক্তব্য দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। আশার কথা হলো, এ ধরনের লোকজন ফোকাস্ড বেশি হলেও, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ফিকহ ও ফতোয়ার ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম ও মুফতিগণের উপরই নির্ভশীল ও নির্দ্বিধায় আস্থাশীল।

লেখক : তরুণ আলেম

আগের সংবাদইসলাম নিয়ে কটূক্তি করা ফেসবুক স্ট্যাটাস শেয়ার, আটক হিন্দু শিক্ষক
পরবর্তি সংবাদডিজিটাল ফতোয়া ও ধর্মীয় ক্ষমতা কাঠামোর রূপান্তর