প্রচারে প্রতারণা : যে কারণে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে

প্রচারে প্রতারণা : যে কারণে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে

মুসান্না মেহবুব:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে কাদিয়ানিদের বসবাস শত বছরেরও বেশি সময় ধরে। স্থানীয় সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কাদিয়ানি ধর্মমতে দীক্ষা দিতে এককালে ব্যাপক ও আগ্রাসী তৎপরতা ছিল এই এলাকায়। কাদিয়ানিদের এই তৎপরতা প্রতিরোধের নিমিত্তেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা জামিয়া ইউনুছিয়া। এরই মধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য একটা অংশ কাদিয়ানি ধর্মমতে দীক্ষা গ্রহণ করে ফেলেছিল।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ আলেম ও ধর্মীয় অ্যাক্টিভিস্ট মুফতী এনামুল হাসান জানান, জামিয়া ইউনুছিয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে কাদিয়ানিদের সময়ে সময়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে নানাভাবে। তাদেরকে একপ্রকার নিষিদ্ধই করা হয়েছে এই অঞ্চলে। যার ফলে প্রকাশ্যে এখন আর তারা ওইভাবে তৎপরতা চালাতে পারে না। কিন্তু গোপনে এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তারা সাধারণ মুসলিম জনতাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে প্রতিনিয়ত।

বাড়ি বানানোর কথা বলে কাদিয়ানি-মসজিদ নির্মাণ

মুফতী এনাম জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মসজিদ-মাদরাসার নামে কাদিয়ানিরা যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ঘর নির্মাণ করতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রশাসন থেকে একধরনের নিষেধাজ্ঞা আদায় করে নিয়েছিলেন স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম। ফলে কার্যত তারা এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান সেখানে তৈরি করতে পারে না।

মুফতী এনাম বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় বেশ কিছু কাদিয়ানির বসবাস। প্রশাসন থেকে তারা যখন মসজিত নির্মাণের অনুমতি পায় না, তখন কান্দিপাড়ায় ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণের কথা বলে একটি জমিতে তারা ভবন নির্মাণের অনুমতি নেয়। এবং এই ভবনকেই তারা মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করে। সাধারণ মুসলিম জনগণকে এখানে এনে কাদিয়ানি ধর্মে দীক্ষা দেবার প্রয়াস চালায়।

মুফতী এনাম আরও বলেন, দাওয়াতের ক্ষেত্রে তারা সরাসরি প্রতারণার আশ্রয় নেয়। তারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে শেষ নবি হিসেবে মানার মিথ্যা দাবি করে সাধারণ মুসলিমদের কাছে, তারপর ধীরে ধীরে তাদেরকে কাদিয়ানি মতবাদে দীক্ষিত করে। ফলে একজন সাধারণ মুসলিম বুঝতেই পারে না সে যে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছে।

কাদিয়ানি মতবাদ গ্রহণ করে আবার ফিরে আসা মুসলিমদের স্বীকারোক্তি

মুফতী এনাম জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত বেশ কিছুদিনের ব্যবধানে কাদিয়ানি মতবাদে দীক্ষা গ্রহণকারী বেশ কয়েকজন ব্যক্তি আলেমদের দাওয়াতে তওবা করে পুনরায় ইসলামগ্রহণ করেছেন। তাঁরা আমাদের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন, কাদিয়ানি মতবাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁরা যে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছেন, এটা বুঝতেই পারেননি৷ কাদিয়ানিরা প্রাথমিক পর্যায়ে তাদেরকে বলেছে, মহানবি যে শেষ নবি এটা তারাও মানে। আলেম-উলামার অযথা প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তারা আমাদেরকে বলে, মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানিই ইমাম মাহদী। কোরআনে তার কথা আছে। এবং একপর্যায়ে এটাও আমাদের বলা হয় যে, মির্জা গোলামের নিকট ওহী আসত৷ আমরা এ সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে জানতে পারি, ওহি কেবল নবি-রাসুলদের কাছেই আসে। তখনই আমাদের ভুল ভাঙে।

প্রচারণায় প্রতারণার পাশাপাশি আর্থিক প্রলোভন

রাজধানীর বনশ্রীতে অবস্থিত খতমে নবুওয়াত মারকাজের দাওয়াহ বিভাগের শিক্ষার্থী মাওলানা মুমিনুল হক চৌধুরী। দাওয়াহ বিষয়ে পড়াশোনার সুবাদে কাদিয়ানিদের তৎপরতা সম্পর্কে জানতে তিনি কাদিয়ানি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত সফর করেন। তিনি বলেন, সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক তথ্য প্রদানের পাশাপাশি আর্থিক প্রলোভন দেখিয়েও নিজেদের মতবাদে দীক্ষিত করে কাদিয়ানিরা।

তিনি বলেন, প্রাণ-আরএফএলের মালিকপক্ষের এলাকা নাটোর। কাদিয়ানি অর্থায়নের বড় একটি উৎস এই কোম্পানি। নাটোরে প্রাণের যে জুস ফ্যাক্টরি আছে, সেখানে আমার যাওয়া হয়েছিল। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, যে-কেউ কাদিয়ানি মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করলে তাকে ফ্যাক্টরিতে ভালো মাইনের চাকরি প্রদান করা হবে, এই প্রলোভনে দারিদ্র্য পীড়িত অসংখ্য মুসলিমকে কাদিয়ানি বানানো হচ্ছে।

মাওলানা মুমিন জানান, দেশের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে কাদিয়ানিদের সংগঠিত তৎপরতা ব্যাপক। এই জেলায় কিছুদিন পরপর দাওয়াতি কাজে তিনি ও তার সাথিরা সফর করেন।

সেই এলাকায় কাদিয়ানিদের তৎপরতা জানাতে গিয়ে মাওলানা মুমিন ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে জানান, পঞ্চগড় সদরের ৫নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত একটি গ্রামের নাম তুলার ডাঙ্গা। গ্রামের এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে করতোয়া নদী। নদীর পাশে বাস করতো পঁয়ত্রিশটি পরিবার। মোট একশ চুয়াত্তর জন সদস্য। এরা সবাই দরিদ্র এবং অশিক্ষিত।

স্বাধীনতার পর থেকে এখানে বাস করে এলেও জায়গাটা মুলত সরকারি। এজন্য সরকার থেকে তাদেরকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয় জায়গাটা ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সম্প্রতি এক রাতের বেলা তাদেরকে উচ্ছেদ করে দেয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় ঘরবাড়ি। বসত-ভিটে হারানো মানুষগুলো উপায় না পেয়ে আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে। অস্থায়ী আবাসে কনকনে শীত, নারী-শিশুদের নিয়ে নিদারুণ কষ্ট, মানবেতর জীবন। উপরন্তু স্থানীয়দের বারবার তাগাদা, ঈদগাহ ছেড়ে দিতে হবে। কেউ মারা গেলে এখানে জানাযার নামাজ পড়া হয়, জায়গাটা ছেড়ে দেয়া দরকার।

দারিদ্র্যপীড়িত মানুষগুলোর এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি স্থায়ী বাসস্থান, মাথা গুঁজার মতো একটি আবাস। নদীর অপর পাশেই আহমদনগর। বাংলাদেশে কাদিয়ানীদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। তাদের বড় বড় অনেক তথাকথিত আলেম ওখানে থাকেন। জামেয়া আহমদিয়া নামে কাদিয়ানিদের বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে সেখানে। আছে প্রচুর জায়গা-জমি। কেউ কাদিয়ানি মতবাদ গ্রহণ করলে এখানে তার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। আবার গরিব মুসলিমদেরকে কাদিয়ানি বানাতেও এসব জায়গা ব্যবহার করা হয়।

এখানকার প্রতিটি শিক্ষিত কাদিয়ানিই একেকজন মিশনারি। বিপরীতে মুসলিম দাঈদের পরিমাণ খুবই অল্প। তাদের ধর্ম প্রচারের অনেক কৌশলের একটি হলো, তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদেরকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন শিখিয়ে দেয়। যেমন, ঈসা আলাইহিস সালাম জীবিত না মৃত? জীবিত হলে তিনি পানাহার কী করেন? প্রাকৃতিক প্রয়োজন কোথায় সারেন? ইত্যাদি। স্থানীয় মুসলিমরা দরিদ্র এবং অশিক্ষিত। তারা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, বিভ্রান্ত হয়। নানা প্রলোভন এবং প্রতারণার শিকার হয়ে কাদিয়ানি ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়।

মাওলানা মুমিন জানান, সাধারণ মুসলিমরা, এমনকি নতুন দীক্ষাগ্রহণকারী সাধারণ কাদিয়ানিরাও কাদিয়ানিদের আসল রূপ জানে না। অনেকেই মির্যাকে শুধু মাহদি জানে। মির্যার নবি দাবী করার বিষয়টি জানে না। শেষ নবি হিসেবে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই মানে। নতুন অবস্থায় তাদেরকে হালকা করে বোঝানো হয়। ধীরে ধীরে তাদের ঈমান ধ্বংস করা হয়।

মাওলানা মুমিন বলেন, আহমদনগরের পাশেই শালসিড়ি গ্রাম। এটাও পুরোপুরি কাদিয়ানিদের দখলে। বর্তমানে তুলার ডাঙ্গার সেই পঁয়ত্রিশটি পরিবারের উপর তাদের সেই কৌশলগুলো প্রয়োগ করা হচ্ছে। কাদিয়ানিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তোমরা আমাদের এখানে চলে এসো, আমরা তোমাদের ঘরবাড়ির ব্যবস্থা করে দেবো। এছাড়াও আর্থিক বিভিন্ন সহায়তার আশ্বাসও তাদেরকে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মুসলিম দাঈদের মেহনতের ফলে এরা এতটুকু জানে যে, কাদিযানীরা কাফির, কিন্তু অভাবের তাড়নায় বাধ্য হয়ে তাদের বিভিন্ন অার্থিক সহায়তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এরা যদি মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোন সহায়তা না পায়, যদি তাদের ঘর-বাড়ির কোন ব্যবস্থা না হয়, তাহলে তারা বাধ্য হবে অমুসলিমদের দেয়া ঘর-বাড়িতে পুনর্বাসিত হতে।

কাদিয়ানিদের তৎপরতা বিষয়ে কথা বলেছিলাম তরুণ ইসলামি শিক্ষাবিদ ও দাঈ মাওলানা মহিউদ্দীন ফারুকীর সঙ্গে। তিনিও কাদিয়ানিদের প্রচারণায় প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারটি উল্লেখ করে বলেন, ‘কাদিয়ানিদের মৌলিক তৎপরতার অন্যতম হচ্ছে অপপ্রচার। ইসলামের বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহার করে এবং ইসলামের নাম ভাঙিয়ে দরিদ্র ও সাধারণ মুসলমানদের তারা বিভ্রান্ত করে থাকে। তাদের বেশ কিছু সংগঠন আছে, সংগঠনগুলো প্রশিক্ষিত কর্মী দ্বারা গঠিত, এদেরকে তারা ‘মুবাল্লিগ’ বলে, এই মুবাল্লিগদেরকে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে পাঠিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে দূরে থাকা সরলমনা সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার কাজ আঞ্জাম দেওয়া হয়। কেবল যে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এই কাজ সীমাবদ্ধ, এমন না, উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবীদেরকেও তারা নানাভাবে বিভ্রান্ত করে।

মাওলানা ফারুকী আরও বলেন, মাসিক আহমদী নামে একটা পত্রিকা আছে তাদের, ওটা দ্বারা মূলত শিক্ষিত সমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া ‘মসজিদ’ নাম দিয়ে তাদের যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও দাওয়াতের নামে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান কিংবা সেমিনারের। সারাদেশে কাদিয়ানিদের চারশো পঁচিশটির মতো শাখা আছে, দেশের নানাপ্রান্তের গ্রাম এবং শহরকে কেন্দ্র করে গঠন করা হয়েছে এসব শাখা। মূলত এগুলোর তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয় তাদের আঞ্চলিক যাবতীয় তৎপরতা।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মুসলমানদের খুব কৌশলে তারা ধোঁকা দেয়। বলে, আপনারা মুসলমান, আমরাও মুসলমান, কোনো তফাত নেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আপনারা যেমন নবি ও রাসুল মানেন, বিশ্বাস করেন—আমরাও তাই। তাঁর সঙ্গে আপনি কেবল আমাদের নবি গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকেও নবি মেনে নিন, ব্যস, আপনি আমাদের ভাই হয়ে যাবেন। এভাবেই নম্র ও আপোসকামী মোলায়েম ভাষায় সাধারণ মুসলমানদের মগজ ধোলাই করে তারা বিভ্রান্ত করে। পাশাপাশি ভালো মাইনের চাকরি এবং আর্থিক লোভও দেখায়। ফলে মানুষ সহজেই তাদের শিকারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত যাঁরা আছেন, তাঁদেরকে মোটিভেশনের কায়দা ভিন্ন। নবিজিকে শেষনবি যে তারা মানে না, এ ব্যাপারটি খোলামেলাভাবে উচ্চশিক্ষিতদের বলে না। বরং অন্য উপায়ে এ শ্রেণিকে মোটিভেশন করে। ফলে চাকরি ও পদোন্নতির লোভে অনেকেই এসব বিষয়ে ঘাটাঘাটি না করে সহজেই কাদিয়ানিদের কাতারে নিজের নাম লিখিয়ে নেয়।

আগের সংবাদসিরিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বাঁচতে রুশ যাত্রীবাহী বিমানের জরুরি অবতরণ
পরবর্তি সংবাদমির্জা কাদিয়ানি : জীবনের নানাদিক