
হামমাদ রাগিব
দেখতে দেখতে ৪৮ বছর পার হয়ে গেল আমাদের স্বাধীনতার। কিন্তু এই ৪৮ বছর পর আজও আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আলেম সমাজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁদেরকে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড় করাতে মরিয়া এ দেশের ধুরন্ধর একটি গোষ্ঠী। আলেমদের নানা তৎপরতা, সচেতনতা ও সতর্কতার কারণে সম্প্রতি যদিও এই প্রবণতা অনেকটা কমে এসেছে, কিন্তু তারপরও একটা অস্পষ্টতা থেকে যায়—স্বাধীনতা-প্রশ্নে আলেমদের অবস্থান আসলে কী ছিল?
প্রশ্নটাকে সামনে রেখে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে কথা বলেছিলাম অধুনা বিলুপ্ত জনপ্রিয় ইসলামি পত্রিকা মাসিক রহমত ও বর্তমান মাসিক ইসলামি পয়গামের সম্পাদক মাওলানা মনযূর আহমাদের সঙ্গে।
মাওলানা মনযূর আহমাদের ভাষ্য অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবস্থান তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। সর্ববৃহৎ অংশটি ছিল দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে। কারণ, পাকিস্তানের জুলুম-নিষ্পেষণের কারণে সেই সময়টা যদিও উত্তাল ছিল, যদিও এ দেশের আপামর জনতা রাজপথ কাঁপাচ্ছিল পাকিস্তানি বঞ্চনার বিরুদ্ধে, নিয়মিত সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভ হচ্ছিল, কিন্তু কেউই তখন ধারণা করতে পারেনি এত দ্রুত যুদ্ধ বেঁধে যাবে। পাকিস্তানি বাহিনী এত নৃশংস আর নির্মম হবে কল্পনাও করতে পারেনি কেউ। যুদ্ধটা বেঁধে গিয়েছিল হঠাৎ।
এই হঠাৎ যুদ্ধের কারণে আলেমদের এই অংশটি নিজেদের করণীয় নির্ধারণে দ্বিধায় পড়ে যান। কারণ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মহৎ একটি কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে, জাত-পাত ভেদ করে আপামর মুসলমানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এখানে। যদিও পাকিস্তান-প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসব উদ্দেশ্যকে থোড়াই কেয়ার করা হয়েছে, কিন্তু দেশটি না ভেঙে এক থাকলে একদিন হয়তো এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হতেও পারে—এই চিন্তা থেকে তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাক, চাচ্ছিলেন না। কিন্তু পাকিস্তানিরা যে হারে নির্যাতন করছে, নিয়মিত যুদ্ধই বাঁধিয়ে দিয়েছে, এমতাবস্থায় তাদেরকে সমর্থনও করতে পারছিলেন না। কারণ ইসলাম সর্বদা সব রকমের জুলুমের বিপক্ষে সোচ্চার। এই দ্বিধার মধ্যে তাঁরা ঘোরপাক খেতে খেতেই নয় মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়ে যায়।
মাওলানা মনযূর আহমদ বলেন, ‘তাঁদের এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব যে খুবই যৌক্তিক ছিল, তা স্বাধীনতা-পূর্ব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগের নেতারাও যুদ্ধ বাঁধার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বাধীন করার ব্যাপারে পরিস্কার কিছু বলেননি। যুদ্ধ বাঁধার আগ পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম ছিল স্রেফ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জুলুমের বিরুদ্ধে। তারপর যুদ্ধ যখন বেঁধে গেল, তখন ঘোষণা এল স্বাধীনতার।’
মাওলানা মনযূর আরও বলেন, ‘আলেমদের এই অংশের নিস্ক্রিয়তার জন্য আমি আওয়ামী লীগকেই দায়ী করব৷ কারণ, যেহেতু তারাই স্বাধীনতা-যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাই তাদের উচিত ছিল, স্বাধীনতার গুরুত্ব সবার কাছে পরিস্কার করা। যারা দ্বিধায় ভুগছিলেন তাঁদের দ্বিধা কাটিয়ে দেওয়া। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই জায়গাটায় ব্যর্থ হয়েছে, যার কারণে আলেম সমাজের এই অংশটা মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় চুপ থেকেছে।’
মাওলানা মনযূর আহমাদের ভাষ্যমতে আলেমদের দ্বিতীয় অংশটি তখন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। তাঁরা মনে করেছিলেন, পাকিস্তান থেকে যদি মুসলিম অধ্যুষিত আমাদের এ ভূখণ্ডটা পৃথক হয়ে যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ভারতের আগ্রাসনের মুখে পড়বে। ভারতের কাছে নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হবে এই ভূখণ্ড। এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে তাঁদের এই চিন্তাধারা যে অমূলক ছিল না, বিবেকবান যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন।
মাওলানা মনযূর আহমাদ বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি, ওলামায়ে কেরামের এ অংশটা যদিও পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু কোনোভাবেই বাঙালিদের ওপর নির্যাতনে অংশগ্রহণ করেননি। রাজাকার হিসেবে যে রূপটা আমাদের সামনে বর্তমানে দাঁড় করানো হয়েছে, তার সঙ্গে আলেমদের কোনো সম্পর্কই ছিল না তখন। এমন একটি ঘটনাও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে, আলেমদের কেউ কোনো বেসামরিক বাঙালিকে নির্যাতনে অংশগ্রহণ করেছেন বা পাক বাহিনীকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। বরং পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক লোকজনকে বাঁচাতে যুদ্ধের পুরো নয়টি মাসজুড়েই তাঁরা তৎপর ছিলেন।’
মাওলানা মনযূর আহমাদের ভাষ্যমতে আলেমদের তৃতীয় যে অংশটি, তা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে তাঁরা এই সত্যটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, আর যাই হোক পাকিস্তানের হাতে বাঙালি মুসলিম-অমুসলিম কেউই আর নিরাপদ নেই। এরা নিজের স্বার্থটাই দেখে, বাঙালি মুসলমানদের প্রতি সামান্য দরদ-ভালোবাসা দেখানো তো দূরে থাক, উল্টো আরও নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে ছিল। অতএব মুসলিম ঐক্যের দোহাই দিয়ে এদের অধীনে থাকা নিজেদের ওপর জুলুম করারই নামান্তর। তাই তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক তৎপরতা থেকে নিয়ে অস্ত্র হাতে সরাসরি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পর্যন্ত পড়েছেন।
মাওলানা মনযূর আহমাদ বলেন, ‘পাকিস্তানিরা সর্বপ্রথম সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়েছিল চট্টগ্রামে, আর আলেমদের এই অংশের মূল ঘাঁটি ছিল সেখানেই। উপমহাদেশের অন্যতম ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসা এবং পটিয়া মাদরাসা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দুটো দুর্গ। বাংলাদেশ বেতারের সম্প্রচার প্রথম প্রথম পটিয়া মাদরাসা থেকেই করা হয়েছিল। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার নিরাপদ আশ্রয় ছিল এ মাদরাসাটি।’
আলেমদের এ অংশটির তৎপরতা সম্পর্কে জানতে কথা বলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে’-এর লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক মাওলানা শাকের হোসাইন শিবলির সঙ্গে।
শাকের হোসাইন শিবলি বলেন, ‘আমি যখন আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে বইয়ের কাজ শুরু করি, আমার ধারণা ছিল, মুক্তিযোদ্ধা আলেমদের সংখ্যা বোধহয় খুব বেশি হবে না। হাতেগোনা কয়েকজনকে অবলম্বন করে কাজে হাত দিই। কিন্তু কাজে হাত দেওয়ার পর নতুন এক দিগন্ত আমার কাছে উন্মোচিত হতে শুরু করে। আমি একে একে পুরো দেশ চষে বেড়িয়েছি, এবং এখনও এ কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি, মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের তৎপরতা এতই ব্যাপক যে একের পর এক এখনও নতুন নতুন সব তথ্য আমার কাছে এসে হাজির হচ্ছে। নামোল্লেখ করে করে তাঁদের বর্ণনা দেওয়াটা এখন আমার জন্য দুরূহ হয়ে উঠেছে।
‘বাংলাদেশের উম্মুল মাদারিস এবং দেওবন্দের পরে উপমহাদেশে যে মাদরাসাটির অবস্থান, চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসা, মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় এই মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন আল্লামা আবদুল ওয়াহহাব রহ.। আল্লামা আশরাফ আলি থানভি রহমতুল্লাহি আলায়হির অন্যতম খলিফা ছিলেন তিনি। আমি যখন আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ শুরু করি, তখন একটা ধারণা ছিল যে মাদানি রহমতুল্লাহি আলায়হি যেহেতু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ছিলেন, অতএব বাংলাদেশে মাদানি ঘরানার ওলামায়ে কেরামই বোধহয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, আর থানভি রহমতুল্লাহি আলায়হি যেহেতু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন, অতএব বাংলাদেশে তাঁর খলিফা ও ভক্ত-মুরিদানরা বোধহয় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু আবদুল ওয়াহহাব রহ.-এর কর্মতৎপরতা সম্পর্কে যখন আমি জানতে শুরু করি, একের পর এক তথ্য আমাকে বিস্মিত ও অবাক করে তোলে। আলেম মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে দ্বিতীয় খণ্ডে বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণসহ ব্যাপারটা আমি ক্লিয়ার করব।
‘সংক্ষেপে শুধু এতটুকু বলি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে এগারোটি সেক্টরে ভাগ করে সংঘটিত হয়েছিল, তেম্নি মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব রহমতুল্লাহি আলায়হিও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা থানভিধারার ভক্ত-মুরিদানকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তৎপরতা চালানোর জন্য সাতটা সেক্টরে ভাগ করে দিয়েছিলেন। থানভি সিলসিলার বাইরের অনেক আলেমও এ তৎপরতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বরিশালের চরমোনাইয়ের মূল পীর সৈয়দ এসহাক রহমতুল্লাহি আলায়হি। হজরত আবদুল ওয়াহহাব রহমতুল্লাহি আলায়হি গঠিত বরিশাল সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছিলেন চরমোনাইয়ের ভক্ত-মুরিদেরা। সৈয়দ এসহাক রহ.-এর জামাতা মাওলানা ইউসুফ সাহেবকে বিচারক নির্ধারণ করে স্থানীয় রাজাকারদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা। স্থানীয় যারাই মানবতাবিরোধী অপরাধ করত, ইউসুফ সাহেবের কাছে তাদের ধরে নিয়ে আসা হতো। তিনি তাদের উপযুক্ত ও কঠোর বিচার করে দিতেন।
‘আরেকটা তথ্য বলি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে হাটহাজারী মাদরাসা এতটাই শক্ত অবস্থানে ছিল যে, যুদ্ধ যখন শেষ হলো, মাদরাসার নোটিশ বোর্ডে ঘোষণা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই কথা লিখে—কোনো রাজাকার বা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের কেউ আজ থেকে এ মাদরাসায় অবস্থান করতে বা ভর্তি হতে পারবে না।
‘মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের অবদান ও তৎপরতার এমন অসংখ্য গল্প আছে, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিহিংসার কারণে ইতিহাসের অলিখিত অধ্যায়ে হারিয়ে গেছে। আর এই সুবাদে একটা ট্র্যান্ড দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দাঁড়ি-টুপিধারী আর আলেম মানেই রাজাকার। অথচ টুপি-দাড়ি পরে রাজাকারি যারা করেছিল, তাদের সিংহভাগই জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত লোক এবং আলেমদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।’
