
ইফতেখার জামিল
মুক্তিযুদ্ধের সাথে ইসলামের সম্পর্ক কী, এটা নিয়ে এখন নানা রকমের লেখাজোখা হচ্ছে। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের সেকুলার বয়ানের যেসব সমস্যাগুলো ছিল, এই লেখাজোখাগুলোতেও সেরকম অনেক সমস্যা থেকে যাচ্ছে। সেকুলারদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কল্পনা ও বাসনাগুলো বুঝে নেওয়া তাই অত্যন্ত জরুরী।
সেকুলাররা পশ্চিমের ইতিহাস, সংগ্রাম ও শিক্ষার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। ফলে তারা মুক্তিযুদ্ধকেও একেকটা ফ্রেঞ্চ বিপ্লব, রুশ বিপ্লব বা আমেরিকান বিপ্লবের বিষয়ে তারা যে পড়াশোনা করেছেন, ইশতেহার ও শ্লোগান পাঠ করেছেন, সেগুলোই তারা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যায় পেশ করেছেন। সেকুলারদের নানা রকমের বাসনা থাকতেই পারে। তবে সরকারপন্থী ব্যক্তিবর্গ যখন পশ্চিমা বিপ্লবের লালসা মুক্তিযুদ্ধের বয়ানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে গেছেন, তাতে পুরো বিষয়টাতেই জটিলতা বেড়েছে।
পশ্চিমা বিপ্লবগুলো কিন্তু একদিনে হয়নি। বিপ্লবের জন্য যে রকম সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতি গঠনের দরকার ছিল, সেটাও বিপ্লবের সাথে সাথেই গঠিত হয়েছে। সেখানে একইসাথে উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তন হয়েছে। সবাই একইভাবে সংগ্রামে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এর কিছুই হয়নি। সংগ্রাম ছাড়াই শুধু সেকুলার কল্পনা ও বাসনার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও আইনি প্রতিষ্ঠানে এই ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এবং এর ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের সংঘর্ষ তৈরি করা হয়েছে। ঘৃণা তৈরি করা হয়েছে। অথচ জনগণের মধ্যে তাদের কোন সমর্থন তৈরি হয়নি। তাদের চিন্তার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি। তার আগেই তারা রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়েছেন। ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের তত্ত্বকেও তারা এর সাথে শরীক করেছেন। এর পরিণামেই আসলে শাহাবাগ ও শাপলার সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধকে ‘মুসলমান’ বানাতে চাচ্ছেন, তারা কি ভুল করছেন? তারা সেকুলার বাসনা ও লালসার ক্রিটিক করতে পারছেন না। লালসার মাধ্যম তথা রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রিটিক করতে পারছেন না। মুক্তিযুদ্ধকে ‘মুসলমান’ বানানো শাহাবাগে বসে কোরআন শরীফ পড়ার মত বিষয় কিনা, এটা বুঝার দরকার আছে।
বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। ফলে এখানকার সংগ্রামও মুসলমানি সংগ্রামই হবে। এটা নতুন করে ব্যাখ্যা করার কিছু নাই। তারচে বরং বাংলাদেশ গত একশো বছরে যে বিশাল সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখামুখি হয়েছে, তাকে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্যাখ্যা করাটা আরও জরুরী বিষয়। বাংলাদেশ সভ্যতাগতভাবে পিছিয়ে পড়েছে। এটা মেনে নেওয়া জরুরী। একইভাবে এই পশ্চাদপদতার জন্য আমরা সবাই দায়ী এটাও মেনে নেওয়া জরুরী।
লেখকঃ আলেম ও বিশ্লেষক
