ঐক্যজোট ও জমিয়তের পাঁচপ্রার্থী, যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্ভাবনা দেখছে দলদুটি

ওমর ফারুক :

সারাদেশে এখন বইছে নির্বাচনী আমেজ। নমিনেশন সংগ্রহ ও জোট-ভোটের হিসাব করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। চলছে প্রচার আর অপপ্রচারের ইঁদুরদৌড়। মত-ভিন্নমত বাদ দিয়ে সংলাপের টেবিলে বসছেন নেতারা। দাবি সুষ্ঠু নির্বাচনের। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির সাথে জোট করেছে গণফোরাম, যুক্তফ্রন্ট, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী; নবগঠিত এই জোট ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করছে। ফলে, বিএনপির অংশগ্রহণ বা বর্জন নিয়ে যে কুয়াশা ছিলো, তাও কেটে গেছে। ফলে আগামী নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ব্যাপক তোড়জোড়।

নির্বাচনী প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোও। ইসলামি দলগুলো নিয়ে বড় দলগুলোর আগ্রহের কমতি নেই। ভোটের মাঠে ইসলামপন্থীদের বিপুল ভোট না থাকলেও, ইসলামপন্থীদের সমর্থনকে বড় দলগুলো ‘ডিসাইডিং ফ্যাক্টর’ হিশেবে দেখে। কারণ, সাধারণ জনগণের একটি বিরাট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে এই দলগুলো। আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থীদের প্রতি সর্ব সাধারণের ভক্তি ও শ্রদ্ধাই এই প্রতিনিধিত্ব তৈরি করে। তাই ভোটের মাঠে পিছিয়ে থাকলেও, এবারের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা দেখছে বেশ কয়েকটি ইসলামি দল। বিশেষ করে মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামির নেতৃত্বাধীন ঐহ্যিবাহী সংগঠন ‘ইসলামি ঐক্যজোট’ ও দুইভাগে বিভক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম তাদের একাধিক প্রার্থীর আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন। ফাতেহ২৪  ঐক্যজোট ও জমিয়তের এমন পাঁচজন করে প্রার্থী অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছে, যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্ভাবনা দেখছে দলদুটি।

ইসলামি ঐক্যজোট-সূত্রে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রার্থীরা যথাযথ প্রচারণার সুযোগ পেলে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে, কমপক্ষে পাঁচজন প্রার্থী এমন রয়েছেন যারা ভোটযুদ্ধে ভালো করবেন বলে তারা আশা করছেন। দলটির এমন প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন, ইসলামী ঐক্যজোট সহকারী মহাসচিব মাওলানা আলতাফ হোসাইন (কুমিল্লা-১), মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২),চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী (নরসিংদী-৩), মাওলানা মেহেদী হাসান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫) এবং দলটির মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ (চট্টগ্রাম-৭)। তবে মুফতী ফয়জুল্লাহ’র জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও তার আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিধর প্রতিদ্বন্দী থাকার বিষয়টিও ভুলে যাচ্ছে না দলের নেতৃবৃন্দ।

জয়ের সম্ভাবনার দিকটি উল্লেখ করে দলের একজন নেতা জানান, দলের পক্ষ থেকে জোড়ালো সমর্থন পাওয়া গেলে তারা জয়ী হবেন বলে আশা করছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে মূলত তিন ধরণের লোক প্রার্থী হয়ে থাকেন। এক. যারা গত কয়েকবছর যাবত কাজ করে আসছেন বা পূর্বে কোনো নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। দুই. যারা মাত্র কয়েক মাস যাবত নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। আর তিন. যারা মৌসুমী নির্বাচন করবেন। সেক্ষেত্রে আমি যদি মার্ক করি তাহলে দেখবো, আমাদের মনোনীত প্রার্থীরা প্রথম সারিতেই রয়েছেন।’ তবে এ নেতা মনে করছেন, তারা যদি জোটবদ্ধ নির্বাচন করতে পারেন তাহলে তাদের বিজয়ের সম্ভাবনা প্রায় নিরানব্বই ভাগ।

ইসলামি ঐক্যজোট আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহৎ কোনো জোটে যাচ্ছে কিনা, এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি সাখাওয়াত হোসাইনের কাছে। তিনি ফাতেহ২৪-কে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারেনি ইসলামি ঐক্যজোট।’ নীতি ও আদর্শের সঙ্গে মিলে যায় এমন কাঙ্ক্ষিত দল তারা এখনো পাননি বলেই এই সিদ্ধান্তহীনতা। তবে আদর্শের সঙ্গে মিলে যায় এমন দল পেলে তারা অবশ্যই জোটে যেতে আগ্রহী বলে জানান এই নেতা।

এদিকে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের দুটি অংশই। দলটি বিশদলীয় জোটের অংশীদার হওয়ায়, জোট যে সিদ্ধান্ত নেবে সেই সিদ্ধান্তেই নির্বাচনে লড়বে বলে জানিয়েছে দলের দুই অংশের একাধিক সূত্র। দলটির একাংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমী এবং অপর অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন মুফতি ওয়াক্কাস। দুটি অংশই বিশ দলের হয়ে নির্বাচনে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইতোমধ্যেই মুফতি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বাধীন জমিয়ত তাদের ছয়জন প্রার্থীর নাম জোটের কাছে জমা দিয়েছে বলে দলটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তাদের কারা কারা মনোনয়ন পাবে, আগামী ১৪ নভেম্বর জোটের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হবে। তবে যাদের নাম জমা দেওয়া হয়েছে তারা সকলেই যোগ্য, প্রবীন রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টের একাধিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কারণে এবারের নির্বাচনেও তাদের বিজয় সম্ভাবনা দেখছে দলটির নেতারা।

দলটির সম্ভাবনাপূর্ণ প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন, গত দুইবারের নির্বাচিত সাংসদ ও মন্ত্রী মুফতি ওয়াক্কাস। তিনি যশোর-৫ আসন থেকে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রবীন ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হওয়ার কারণে এবং এলাকায় যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য নেতা হওয়ার কারণে এবারের নির্বাচনেও তিনি জয় পাবেন বলে দলটির নেতারা মনে করছেন। এছাড়াও দলটির আশাবাদী প্রার্থীরা হচ্ছেন, গোলাম মহিউদ্দীন (কুমিল্লা সদর আসন), এ্যাডভোকেট সৈয়দ শামসুল ইসলাম (সুনামগঞ্জ-৩), মাওলানা আব্দুল মালেক চৌধুরী (হবিগঞ্জ-১), হাফেজ বশির আহমদ (সুনামগঞ্জ-১)।

অপরদিকে মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী নেতৃত্বাধীন জমিয়তের একাধিক প্রার্থীরও বিজয় সম্ভাবনা দেখছেন দলটির নেতারা। তাদের মাঝে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা শাহিনূর পাশা চৌধুরী। তিনি সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচনে লড়বেন। দলটির সহ-সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক লড়াই করবেন সিলেট-৬ আসন থেকে। দলটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি দাড়াবেন নীলফামারি-১ থেকে। এ তিন নেতাকে ঘিরেই প্রধাণত এই অংশের নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে।

কী কারণে জমিয়ত এসব নেতাদের প্রতি ভরসা রাখছেন বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছিল দলের কয়েকজন মুখপাত্রের কাছে। তারা ফাতেহ২৪-কে বলেছেন, জোটবদ্ধতাই তাদের শক্তি। তারা এমন একটি দলের সঙ্গে জোটে রয়েছেন যারা একাধিকবার জাতীয় সংসদে সরকার গঠন করেছে।

‘এ দলটি অন্যান্য দলগুলো থেকে অনেকটাই ক্লিন ইমেজ ও জনসমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছে। দেশের মানুষও তাদের ভবিষ্যতে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছেন। এছাড়া বাংলাদেশে এককভাবে ইসলামি রাজনীতি করে সংসদে ইসলামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করার পরিবেশ এখনো সৃষ্টি না হওয়ার তারা জোটের ওপর ভরসা করছেন বলে জানিয়েছেন।’ তারা বলেন, সংসদ থেকে দূরে থাকারও কোনো অবকাশ নেই। ফলে নীতি-আদর্শে এ দলটির সঙ্গে কিছুটা সহমত হওয়ার কারণে তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করছে দলটি। তাদের লক্ষ্য এ দেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঈমান আমল নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। দেশের প্রধান দুই দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন বিক্রি শুরু হয়ে গেছে, সেই মনোনয়ন বিক্রিকে কেন্দ্র করে জন্ম নিচ্ছে নানা আলোচনাও। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কওমি সনদ, শোকরিয়া মাহফিল ইত্যাদি নিয়ে এই মুহূর্তে কওমি অঙ্গণেও চায়ের কাপে উঠছে তুমুল ঝড়। সব মিলিয়ে, এই নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর ফলাফলের উপরে নির্ভর করছে অনেক হিশাব-নিকাশ৷ আর সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই নির্বাচনের মাঠে এবার বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইসলামি দলগুলি।

আগের সংবাদযেমন দেখেছি প্রিয় আল্লামা যাকারিয়া (রহ.) কে।। মাওলানা রফিকুল ইসলাম
পরবর্তি সংবাদশীতের ঋতুর অতিথি পাখি