সলংগা বিদ্রোহের পুরোধাপুরুষ দেওবন্দি আলেম মাওলানা তর্কবাগীশ

রাগিব রব্বানি 

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। একাধারে তিনি ছিলেন প্রাজ্ঞ আলেম, দুর্দান্ত তার্কিক, লেখক এবং সংগ্রামী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ দুঃসাশন ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে যেমন লড়াই করেছেন, তেম্নি সংগ্রাম করেছেন পাকিস্তানি জালেম শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধেও। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাল, মাওলানা তর্কবাগীশ খবর পেয়ে তৎক্ষনাৎ প্রাদেশিক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। এবং তারপর ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট আওয়ামী লীগ-দলীয় সদস্য হিসেবে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে সর্বপ্রথম বাংলায় বক্তব্য দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার যৌক্তিকতাকে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

তারও আগে, ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়, ১৯২২ সালে মাওলানা তর্কবাগীশ যখন ২২ বছরের টগবগে তরুণ, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন ঐতিহাসিক সলংগা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার সর্ববৃহৎ হাট সলংগায় বিলেতি পণ্য বর্জন করার দাবিতে বহু মানুষ ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম নিষ্পেষণের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছিল। তিনি হয়েছিলেন বন্দী।

আরও পড়ুন : সলংগা গণহত্যা : বাঙালি মুসলমানের ভুলে যাওয়া রক্তাক্ত ও দ্রোহের ইতিহাস

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের জন্ম ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার তারুটিয়া গ্রামে। অভিজাত পীর বংশের লোক ছিলেন তিনি। তাঁর পূর্ব পুরুষ বড়পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহ.-এর বংশধর শাহ সৈয়দ দরবেশ মাহমুদ ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে আসেন।

শৈশব থেকেই মাওলানা তর্কবাগীশের মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে অসহায় দুধবিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেন। ১৯১৯ সালে খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

বৃটিশ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর পক্ষে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি যুক্ত প্রদেশের বেরেলি ইশতুল উলুম মাদরাসা, মাজাহেরুল উলুম সাহারানপুর মাদরাসা ও দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন। দেওবন্দ যেহেতু ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে লড়াই করছিল, তাই দেওবন্দ পড়াকালীন মাওলানা তর্কবাগীশের ব্রিটিশ-বিরোধী চেতনা এবং স্বদেশের জন্য প্রেম আরও শাণিত ও পাকাপোক্ত হয়।

লাহোরের এশাতুল ইসলাম কলেজেও অধ্যয়ন করেন তিনি। সেখান থেকে তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন।

মাওলানা তর্কবাগীশ পড়াশোনা শেষ করে পুরোদমে আত্মনিয়োগ করেন রাজনীতিতে। ব্রিটিশ-বিতাড়ন, স্বাধিকার ও গণমানুষের অধিকার রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করেন। ১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈড়ে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশি বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন তিনি। ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন তিনি। ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে নিজেকে জড়িয়ে নেন।

১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। অবিভক্ত বাংলার এমএলএ হিসেবে তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনা ক্ষতি পূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

পাকিস্তান আমলে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সভাপতিত্বে গঠিত ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন।

১৯৫২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি মুসলীম লীগ ত্যাগ করে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন এবং নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে যে সব মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ তিনি একজন সুসাহিত্যিকও ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে : শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ইত্যাদি।

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম ব্যক্তিত্ব, আলেম রাজনীতিক ও তুমুল সংগ্রামী এই মানুষটি ১৯৮৬ সালের ২০শে আগস্ট ইন্তেকাল করেন।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ স্মরণে প্রতিবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ২০০০ (মরণোত্তর)’ প্রদান করা হয়। এ ছাড়া তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তার নামে কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তিনি যে অবদান ও কীর্তি দিয়ে এ দেশ, মাটি ও মানুষকে ঋণী করে গেছেন সে তুলনায় তাঁর স্মরণ, চর্চা এবং মূল্যায়নের জন্য এসব উদ্যোগ খুবই সীমিত।

আগের সংবাদচেম্বারে একা পেয়ে ধর্ষণ, লজ্জায় আত্মহত্যা গৃহবধূর
পরবর্তি সংবাদডাকসু নির্বাচনে সরকারের কাছে কোটা আন্দোলনকারীদের দাবি