
মুসান্না মেহবুব
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের (কাসেমি গ্রুপ) কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক মাওলানা ফয়যুল হাসান খাদিমানীর একটি বক্তব্য নিয়ে কদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। জমিয়তের প্রশিক্ষণমূলক একটি অনুষ্ঠান থেকে ধারণ করা ওই ভিডিওর একটি অংশে তাঁকে বলতে দেখা যায় যে, ‘যাঁরা দেওবন্দি দাবি করে আবার জমিয়ত করবে না, তাঁরা দেওবন্দের জারজ সন্তান।’
তাঁর এমন কঠোর মন্তব্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাদরাসার সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের আলেম-ওলামা প্রতিবাদমূলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে দেওবন্দের সাবেক ও বর্তমান বাংলাদেশি ছাত্রদের পক্ষ থেকেও। তবে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেকে বাড়াবাড়ি ও তীর্যক মন্তব্যও করছেন। এ প্রবণতাটা সাধারণ শ্রেণির মাদরাসা-পড়ুয়া ও অন্যান্য ইসলামি রাজনীতিক দলের কোনো কোনো ছাত্র-সংগঠনের অনেক কর্মীর মধ্যে বেশি মাত্রায় লক্ষ করা গেছে।
জমিয়তের বাইরের রাজনীতি যাঁরা করেন বা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন এমন অনেক আলেম এ মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে খাদিমানী সাহেবকে তা প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু জমিয়তের কর্মী থেকে নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দেখা গেছে মাওলানা খাদিমানীর এ বক্তব্যকে সমর্থন করে বক্তব্যের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে৷ তাঁরা বলছেন, জমিয়ত না করলে দেওবন্দের জারজ সন্তান হবার অর্থ হলো দেওবন্দের সুসন্তান না হওয়া। দেওবন্দের চেতনাকে সঠিকভাবে লালন না করা। তাছাড়া মাওলানা খাদিমানীর শিষ্য ও ছাত্র জমিয়তের উগ্র কিছু কর্মীকে দেখা গেছে তাঁর সমালোচনাকারীদের আক্রমণাত্মক ভাষায় হেয়প্রতিপন্ন করতে।
মাওলানা খাদিমানীর এ বক্তব্যের প্রতিবাদ ও নিন্দাকারীরা বলছেন, দেওবন্দের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। দেওবন্দ পড়লে বা দেওবন্দি চিন্তাধারা লালন করলে জমিয়ত যে করতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা দেওবন্দের নীতিমালায় কখনও ছিল না, এখনও নেই। দেওবন্দের অনেক বড় বড় উসতাদ এমন ছিলেন, জমিয়ত তো দূরের কথা রাজনীতির সঙ্গেই যাদের কোনো সম্পৃক্তি ছিল না। এখনও অধিকাংশ উসতাদ সব ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছেন। তাছাড়া দেওবন্দের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চর্চাও নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ।
সমালোচকরা প্রশ্ন রেখে বলছেন, বাংলাদেশের অনেক দেওবন্দি আকাবিরই এমন ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বর্তমান জমিয়তের রাজনীতির কোনো সম্পৃক্তি ছিল না, এখনও এমন অনেক আকাবের আছেন, তো খাদিমানীর বক্তব্য অনুযায়ী তাঁরাও তো দেওবন্দের ‘জারজ’ সন্তান, সুসন্তান না!
এ ব্যাপারে মাওলানা খাদিমানীর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোর থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন, পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন। ঘণ্টা তিনেক পর আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি অন্য আরেকটি মিটিংয়ে আছেন বলে প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে প্রতিবেদক দুইমিনিট সময় তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে জানতে চান, ‘জারজ সন্তান’ শব্দটা উল্লেখ করে তিনি যে কঠোর মন্তব্য করেছেন, যে মন্তব্যে অনেকে আহত হয়েছেন এবং যা নিতান্ত শ্রুতিকটু, নিজের অবস্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক রেখে শুধু এই কঠোর কথাটুকুর জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশ করবেন কি-না?
উত্তরে মাওলানা খাদিমানী বলেন, আপনি শুধু এই কথাটি শুনলে তো হবে না, সেদিনকার আমার পুরো বক্তব্যটি শুনুন, তারপর প্রশ্ন করুন।
প্রতিবেদক পুরো বক্তব্যটি শুনেছেন এবং বক্তব্যের এই কঠোর অংশটুকু তাঁর কাছে শ্রুতিকটু মনে হয়েছে এবং অনেকেই তাতে আহত হয়েছেন উল্লেখ করলে মাওলানা খাদিমানী বলেন, যা সত্য আমি তাই বলেছি, তাতে কেউ আহত হলে আমার তো কিছুই করার নেই।
এই বলে তিনি প্রতিবেদককে পাল্টা কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নেন।
এদিকে এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (কাসেমি গ্রুপ) বক্তব্য জানতে চেয়ে ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরের পক্ষ থেকে দলের কেন্দ্রীয় অফিসে যোগাযোগ করা হলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক মাওলানা আবদুল গাফফার ছয়ঘরি’র। মাওলানা ছয়ঘরি বলেন, মাওলানা ফয়যুল হাসান খাদিমানী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দলীয় কোনো বক্তব্য নয়। নিজের ব্যক্তিগত মতামত। এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা তিনিই দেবেন।
মাওলানা ফয়যুল হাসান খাদিমানী জমিয়তের পুরনো ও সিনিয়র নেতা এবং গবেষক আলেম উল্লেখ করে মাওলানা আবদুল গাফফার আরও বলেন, তাঁর যে বক্তব্য, তা দলের কর্মীদের আভ্যন্তরীণ একটি প্রশিক্ষণ সভায় প্রদত্ত, এটা বাইরে প্রচার করা ঠিক হয়নি। আমাদের এক কর্মী না বুঝে বক্তব্যটির লাইভ করেছিল ফেসবুকে, সেখান থেকেই এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যা নিতান্ত দুঃখজনক।
মাওলানা খাদিমানীর এ বক্তব্য এবং কঠোর উক্তি দল সমর্থন করে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সিনিয়র নেতারা কোনো কিছু বলেননি, এটা সিনিয়র নেতাদের ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু বলতে পারব না।
