
আবু জর
ওয়াজ মাহফিলের কার্যক্রম আমাদের দেশে নতুন নয়। বহুবছর যাবতই ভারত উপমহাদেশে এমন ধারার ওয়াজ মাহফিলের প্রচলন আছে।
ভারতবর্ষের ইতিহাস অনুযায়ী ওয়াজ মাহফিল মূলত মোঘল আমলে প্রচার ও প্রসার পায়। এর পূর্বে ইরানে বা তৎকালীন পারস্যে ওয়াজ মাহফিল বা ইসলামিক জলসা হতো। সেখান থেকে মোঘলদের মাধ্যমে ওয়াজ মাহফিল ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। মোঘল সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে তা সম্পূর্ণ ভারতবর্ষে ছড়ানোর পাশাপাশি আমাদের পূর্ব বাংলায়ও চলে আসে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কলকাতাতেও জৈনপুরি পীর বংশের পূর্বপুরুষেরা ওয়াজ মাহফিলে আলোচনা করতেন বলে প্রমাণ মেলে।
বাংলাদেশে নব্বইর দশকে বড় হওয়া প্রজন্ম দেখেছে ওয়াজ মাহফিলের সুদিন। শীতকাল জুড়ে গ্রামের মাঠে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হতো। তখন বাংলাদেশে মাদরাসার পরিমান ছিল এখনকার তুলনায় অনেক কম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত আলেমদের সংখ্যাও অনেক কম ছিল। ফলে এই বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব ছিল অনেক। এবং দীর্ঘদিনের প্রচলনের ফলে এক সময় তা বাঙালি মুসলিম কালচারের অংশে পরিণত হয়। এমনকি ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসার মতো ঘটনাও ঘটত। সেসব দিন এখন পিছে পড়ে গেছে। ওয়াজ মাহফিলের সংস্কৃতি এক বিব্রতকর রূপ ধারণ করেছে বর্তমানে। ইসলামের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনেক কিছু ঢুকে যায় ওয়াজ মাহফিলের আয়োজনে
ইতিহাসে মোঘল আমলের যেই ওয়াজের কথা বলা আছে, তার সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য বিস্তর। পূর্বে ওয়াজ মাহফিলগুলোতে দেখা যেত বক্তা দূর থেকে এসে বক্তব্য দিচ্ছেন কিন্তু এর কোনো বিনিময় নিচ্ছেন না। এছাড়াও বক্তব্য দেয়ার নামে জনমনে হুজুগ তৈরি, নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া, ধর্মকে রাজনীতিক স্বার্থে ব্যবহার করা ইত্যাদি বিষয় তখন ছিল না বললেই চলে। কিন্তু বর্তমানের ওয়াজ-মাহফিলগুলো হয়ে গিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বক্তা বক্তব্যই দেন অর্থ উপার্জনের অভিপ্রায় নিয়ে। কে কত সুরেলা কণ্ঠে ওয়াজ করল, কে কত উদ্ভট আচরণ করে লোকজন ধরে রাখতে পারল ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দরদামে বক্তাকে ‘উচ্চমূল্যে’ ভাড়া করে নিয়ে আসা হয়। ওয়াজের নামে দিন নেই রাত নেই চলে নানা রং ও ঢংয়ের আজগুবি আচার-অনুষ্ঠান, যা ইসলামের অংশ হিসেবে কোনো কালেই প্রতিষ্ঠিত ছিল না।
ওয়াজের নামে বর্তমানে এক শ্রেণির আলেম যা করে যাচ্ছেন, তা ভীষণ দৃষ্টিকটু। ইসলামের নন্দন রুচির সঙ্গে তা কিছুতেই মেলানো যায় না। ওয়াজ করার নামে ওয়াজের অনুষ্ঠানে সুরেলা কণ্ঠে, আজগুবি গল্প বলে লোক জমানোর চেষ্টা করা হয়। লোকজন এই আজগুবি কীর্তিকলাপ দেখতে যায় ঠিকই কিন্তু সেখান থেকে তারা প্রকৃত ইসলামের কোনো জ্ঞান লাভ করতে পারে না। এর ফলে ওয়াজ মাহফিলের মৌলিকত্ব আজ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। অপরদিকে তাদের এই সকল বাচনভঙ্গি তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মেশকাত শরিফের ৪১০ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ভাষার প্রাঞ্জলতা শিখে মানুষের অন্তরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোনো ফরজ ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না।’,
যারা টাকা নির্দিষ্ট করে, অর্থের বিনিময়ে ওয়াজ করতে আসে তাদেরকে দিয়েও ওয়াজ করানো থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ ধর্মীয় কাজের বিনিময় গ্রহণকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। ওয়াজ হবে মানুষকে হেদায়াতের পথ দেখানোর জন্য, মানুষের কল্যাণে, দেশ ও জাতির কল্যাণে, আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে। সেই ওয়াজে যিনি বক্তব্য দোবেন তাঁকেও হতে হবে নিঃস্বার্থ, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ। কিন্তু বর্তমানে যারা ওয়াজ করেন তাদের অধিকাংশই মোটা অংকের টাকা না হলে ওয়াজ করতে আসেন না। এতেই বুঝা যায় তাঁরা কোন শ্রেণীর আলেম। তারা যে হাক্কানি আলেম নন বরং ধর্মব্যবসায়ী তা স্পষ্ট হয়। আল্লাহ এ সকল ধর্মব্যবসায়ীদের অনুসরণ করতে স্পষ্ট নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন, “অনুসরণ কর তাদের যারা তোমাদের থেকে বিনিময় আশা করেন না (সুরা ইয়াসিন ২১)।” নবী রসুলগণ কখনো দীন প্রতিষ্ঠা করে পারিশ্রমিক আদায় করেননি। “হে জাতি! আমি তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চাচ্ছি না। আমার বিনিময় আমাকে আমার আল্লাহই দেবেন (সুরা হুদ ৫১)।” “বলুন, আমি তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না আর আমি লৌকিকতাকারীও নই (সুরা সোয়াদ ৮৬)।” “বলেদিন, আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এটি সারা বিশ্বের জন্য উপদেশ মাত্র (সুরা আনআম ৯০)।”
অনেক সময় ওয়াজ মাহফিলগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত খরচ করা হয় যা অপচয়ের পর্যায়ে পড়ে। এই অপচয় করা থেকেও আমাদের বিরত থাকতে হবে কারণ অপচয়কারী শয়তানের ভাই এবং যিনি অপচয় করেন আল্লাহ তাকে পছন্দ করেন না (সুরা বনি ইসরাইল ২৭)।
অতএব বর্তমানে ওয়াজ করার নামে যাদের ভাড়া করে আনা হচ্ছে তাদের থেকে আমাদের নিরাপদ থাকা উচিত। তাদের বদলে যারা ওয়াজ-মাহফিলের আয়োজন করছেন তাদের উচিত হক্কানি আলেমদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসা। কারণ হাক্কানি আলেমরা জানেন কোরআনে বহু আয়াতে মহান আল্লাহ দীনের সকল প্রকার বিনিময়কে হারাম ঘোষণা করেছেন। ওয়াজ মাহফিলের বিষয়গুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। ধর্মব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে যদি হাক্কানি আলেমদের দিয়ে ওয়াজ করানো নির্দিষ্ট করা যায় তবে তারা অবশ্যই এমন বিষয়ই চয়ন করবেন যাতে দীন, দেশ ও জাতির মঙ্গল হয়।
রসুলের সময় এ ধরনের ঘটা করে প্যান্ডেল টাঙ্গিয়ে, স্টেজ সাজিয়ে ওয়াজ মাহফিল না হলেও রসুল আলোচনা করতেন। রসুলের সামনে বসে নারী-পুরুষ সকলে নির্বিশেষে আলোচনা শুনত এবং সে অনুযায়ী কাজ করত। রসুলের সেই আলোচনায় দীনের বিষয় ছিল, দুনিয়ার কল্যাণে কী কী করণীয় সে বিষয় ছিল, পরকালে উন্নতির পথ ছিল। রসুলের আলোচনায় উপস্থিতগণ দেশ ও জাতির জন্য নিজেদের কোরবান করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। তারা মানুষের কল্যাণে, মানবতার কল্যাণে, ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত থাকতেন।
অতএব যদি প্রচলিত ওয়াজ মাহফিলগুলোকে সংস্কার করা যায় এবং সেগুলোকে ইসলাম, দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যবহার করা যায় তবে উত্তম, অন্যথায় ওয়াজ মাহফিল হওয়ার চেয়ে না হওয়াই ভালো। ধর্মব্যবসায়ীদের করা এ সকল ওয়াজ মাহফিলে দীন, দেশ ও জাতির উপকারের বদলে অপকারই বেশি হচ্ছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে আমাদের দেশে ওয়াজ মাহফিলের বেশ গুরুত্ব রয়েছে তাই ওয়াজ মাহফিলগুলো যদি সঠিক উপায়ে না হয় তবে তা আমাদের জন্য ঘোর অমঙ্গলের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই জনগণের উচিত এ বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং সরকারের উচিত জনগণকে নিয়ে এই সকল বিষয়গুলোকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওয়ায়েজিনদের বিষয়ে ছয়টি নেতিবাচক সুপারিশ উত্থাপন করা হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে এই পদক্ষেপকে ভালো মনে হলেও আলেমদেরকে সজাগ থাকতে হবে, এর যেন অপব্যবহার না হয়।
