আব্বাসী মাদানী : সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি ইসলামপন্থী নেতার জীবন ও চিন্তা

হুজায়ফা আওয়াদ

(শায়খ আব্বাসী মাদানী আলজেরিয়ার ইসলামপন্থিদের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। একাধারে একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ও সাহসী মুজাহিদ হবার পাশাপাশি ছিলেন ইলমি ব্যক্তিত্বও। প্রখর চিন্তা ও উন্নত রুচির অধিকারী ছিলেন। আলজেরিয়ার স্বাধীনতার জন্য দুঃসাহসী ভূমিকা নিয়ে লড়েছেন ফরাসি দখলদারদের বিরুদ্ধে। জীবনের বড় একটা সময় কাটাতে হয়েছে তাঁকে কারাগারে। আশির দশকের শেষের দিকে আলজেরিয়ার স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছিলেন তিনি ও তাঁর দল। কিন্তু ক্ষমতা তাঁর হাতে হস্তান্তরের বদলে দীর্ঘ দিনের জন্য পুরা হয় তাঁকে জেলে। গত ২৪ এপ্রিল এ মহান সংগ্রামী ইন্তেকাল করেন। ফাতেহের পাঠকদের জন্য তাঁকে নিয়ে লিখেছেন দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষার্থী হুজায়ফা আওয়াদ। –হামমাদ রাগিব) 

এ নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে কিছু মানুষ চলে যান ঠিকই, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সমুদ্রসম কর্ম মানুষের হৃদয়ে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখে তাঁদেরকে। আব্বাসী মাদানী আল-জাযায়েরী ছিলেন এসব ক্ষণজন্মা মনীষীদের একজন। মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেও যিনি পৃথিবীর সামনে আজও স্ব-মহিমায় ভাস্বর।

গত ২৪ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার সন্ধ্যায় আলজেরিয়া গণমাধ্যম ঘোষণা করে, কাতারের রাজধানী দোহায় ইসলামিক স্যালভেসন ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতাপুরুষ আব্বাসী মাদানী ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেছেন। মুহূর্তেই ইসলামি দুনিয়ার চতুর্দিকে শোক-ছায়া নেমে আসে। আশাবাদী মানুষগুলোও মুষড়ে পড়েন নিমিষেই।

আব্বাসী মাদানী শুধু একজন বিদ্যানই ছিলেন না, কিংবা শুধু ‘বিপ্লবী’ লকব দিয়েও তাঁর চিন্তার ব্যাসার্ধকে পরিমাপ করা সম্ভব নয়, তাঁর দৃষ্টান্ত কেবল তিনিই। বুদ্ধিমত্তার সাথে যেমন লড়েছেন চৈন্তিক যুদ্ধে, রাজনীতির ময়দানেও ঠিক তেমনি বিপ্লবী অশ্বে সওয়ার হয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন আমরণ।

ইউনিভার্সিটির অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন জীবনের বড় একটা সময়, প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামিক স্যালভেসন ফ্রন্ট। এসব কিছুর ভেতর দিয়ে আব্বাসী মাদানী হয়েছেন কালের এক মহাবিপ্লবের সাক্ষী। মধ্যপ্রাচ্য-ভিত্তিক অনলাইন নিউজপোর্টাল ‘বাউয়াবাতুশ শুরুক’-এর নিয়মিত কলামিস্ট তিহামি মাজুরি লেখেন–‘আব্বাসী মাদানী এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন ৮৮ বছর বয়সে, তিনি জন্মেছিলেন ২৮ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৩১খ্রিষ্টাব্দে, আলজেরিয়ার বিসকারা শহরের সিদি উকবা অঞ্চলে। জীবনের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি তথা প্রায় একুশ বছর কারারুদ্ধ জীবন যাপন করতে হয়েছে তাঁকে। এর দুই-তৃতীয়াংশ কেটেছে স্বাধীনতার মহাবিপ্লবী প্রশ্নে। অবশিষ্ট তিন-চতুর্থাংশ ব্যয় হয়েছে শৈশব, কৈশোর এবং তারুণ্যে জ্ঞান-সাধণা ও রাজনীতির সবক হাসিলের মধ্য দিয়ে…।’

ইলমি অবদান
মানুষ আব্বাসী মাদানীকে জানে একজন রাজনীতিজ্ঞ, বিপ্লবী হিসেবে; সর্বোচ্চ ইউনিভার্সিটিতে প্রদত্ত হাতেগোনা কিছু লেকচার ছাড়া তাঁর হয়তো তেমন কোনো কীর্তিই নেই! কিন্তু বাস্তবিক অর্থে আলজেরিয়ায় সমসাময়িকদের মাঝে জ্ঞান-প্রজ্ঞায় তাঁর সমমনা ক’জন ছিলেন সে পরিসংখ্যান বের করে আনা কঠিন হবে। আব্বাসী লিখিত বিখ্যাত গ্রন্থ- ‘النوعية التربوية للمراحل التعليمية’। কেবল এ গ্রন্থটিই তাঁর পাণ্ডিত্য প্রমাণে যথেষ্ট। এখানে তিনি বিশেষত পশ্চিমের ভয়াবহ থাবার মুখে প্রাচ্যের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার অরক্ষা, ও ঝুঁকির দিকগুলো নিয়ে আলাপ তুলেছেন। ব্যক্তি ও চিন্তা গঠনে সমাজ ও সভ্যতার ভূমিকার কথা বলেছেন। এ কিতাবে বর্ণিত সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বাস্তবায়নের তাগিদে ইসলামি স্যালভেসন ফ্রন্টের পাঠ্য-পুস্তকের তালিকায় একে যুক্ত করেছেন। এ ছাড়াও রয়েছে তাঁর একাধিক রিসালাহ এবং বিষয়ভিত্তিক আর্টিকেল। যা তাঁর জ্ঞান ও চিন্তার বিশালতার প্রতিনিধিত্ব করে।

সমকালীন ইসলামি রাজনীতির সাথে আব্বাসীর বোঝাপড়া
গতানুগতিক কোনো ইসলামি আন্দোলনে কিংবা সংঘে আব্বাসী আস্থা রাখতে পারতেন না (যদিও তিনি প্রথম দিকে জমইয়্যাতুল কায়্যিম আল-ইসলামিয়া’র একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।)। তাঁর এ অনাস্থা এ কারণে নয় যে, তিনি রাজনীতিতে ইসলামি ভাবধারার সাফল্যে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং তিনি বলতেন–‘ইসলাম তো চিন্তার প্রবলতর উন্মত্ত একটা ধারার নাম, একে কোনো নির্দিষ্ট দল কিংবা মতাদর্শের সংকীর্ণ গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা অসম্ভব, অথচ আমাদের দেশে রাজনীতি বলতে তাঁরা মূলত এসব ব্যক্তি-চিন্তা ও দলগত-আদর্শের চর্চাকেই বোঝেন কেবল। কিন্তু আমি মনে করি সমুদ্রকে কোনো কূপ দিয়ে বিচার করা সুনিশ্চিত বোকামি।’

এসবের কারণে প্রচলিত কোনো ধারার সাথে তাঁর খুব একটা সখ্যতা ছিল না কখনোই; এমনকি ইখওয়ানের সাথেও না। তবে আলি বালজাহ–যিনি ইখওয়ানের উচ্চপদস্থ নেতা ছিলেন–তাঁর সাথে মাদানীর সম্পর্ক ভালো ছিল। এক পর্যায়ে আলি বালজাহও তাঁর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে একই দা’ওয়াহ আরম্ভ করেন।

ইসলামি অন্দোলনের অন্যান্য নেতাদের মতো আব্বাসী কখনোই ওয়াজ করে বেড়াতেন না। তিনি যতটুকু বলতেন, খুব চিন্তা করে বলতেন। জ্ঞানগর্ভ, সংশোধনীয়, সবশেষে বিশ্ব-রাজনীতি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ও তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন সেমিনারগুলোতে। ব্রিটেন থেকে ফিরে আসার পর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮ এই সময়টাতে তাঁর সভা-সেমিনারগুলোর ধারায় কিছুটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। বিশেষত ১৯৮২ সনের ঐতিহাসিক কিছু দিনে, শেইখ আহমাদ সিহনুন, শেইখ আব্দুল লতিফদের সাথে ড. আব্বাসী মাদানীর নামটাও যখন জ্বলজ্বল করতে শুরু করে আলজেরিয়ার ইসলামি রাজনীতির দিগন্তে। সড়কে মহা-সড়কে তাঁর তেজস্বী বক্তব্যগুলোর ক্যাসেট বাজতে থাকে। ফলে ওই সময়ের কোনো এক শুক্রবারে জুমার নামাজের পর শত-সহস্র বিক্ষুব্ধ মানুষ মহাসড়কে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখান থেকেই আলজেরিয়ার ইসলামি রাজনীতির নতুন দিগন্তের ভূমিকা সূচিত হয়।

রাজনীতিতে সরব উপস্থিতি
ফরাসি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একাধিক সংগঠনের সাথে আব্বাসী জড়িয়ে পড়েন ভরা যৌবনেই। ১৯৪৮ সালে যখন Algerian People’s Party এবং Movement for the Triumph of Democratic Liberties আলজেরিয়ান সাধারণ নাগরিকদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করছিল, ঠিক তখনই আব্বাসী এদের সাথে উদ্যাম স্পৃহায় স্বশরীরে যোগ দেন। স্বাধীনতা অন্দোলনের অন্যতম নেতা আরাবি বিন মাহিদি’র হাতে হাত রেখে কাজ শুরু করেন। ঠিক এ সমইয়টাতে মুজাহিদদের একটি গ্রুপ আলজেরিয়ার রাজধানীস্থ ফরাসি রেডিও সদর দপ্তরে গভীর রাতে বোমা হামলা করে। তাদের নেতৃত্ব দেন তরুণ এ আব্বাসী। এর কিছুকাল পরেই তাঁকে কারাগারে যেতে হয়। একাধারে সাত বছর কারা যাপন করেন তিনি। ফরাসি দখলদারদের থেকে আলজেরিয়া স্বাধীনতা লাভের পরে মুক্তি পান।

ইসলামিক স্যালভেসন প্রতিষ্ঠা
আব্বাসী মাদানী শক্তিশালী রূপে রাজনীতিতে আবির্ভূত হন সম্ভবত ১৯৮২ সনের উত্তাল সেই সময়ে, যখন বামপন্থিদের রাজনৈতিক আক্রমণের প্রতিবাদে আলজেরিয়ান সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে জুমার নামাজের পর ছাত্র-সমাজকে একত্রিত করবার কঠোর প্রচারাভিযান শুরু হয়। এর কিছুকাল পর ১৯৮৮ সনের ৫ ই ফেব্রুয়ারি রচিত হয় ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। এ দিন আলজেরিয়ান সরকার-বিরোধী গণবিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে শত সহস্র সাধারণ জনতা। ঠিক এমন সময় শক্তিশালী ফোর্সের মাধ্যমে তাদের ওপর অতর্কিত হামলার আদেশ দেয় তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার।

রাষ্ট্রীয় গণনা অনুযায়ী এদিন নিহত হয় ১৬৯ জন, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে নিহতের সংখ্যা ৫০০ অতিক্রম করেছিল বলে জানা যায়। এ ঘটনার পর ১৯৮৯ সনে ড. আব্বাসী রাজনৈতিক কিছু বরেণ্য ব্যাক্তিবর্গ নিয়ে গঠন করেন ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট। এই পার্টির স্বতন্ত্র কিছু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বৈশিষ্ট্যাবলি ছিল, যার ফলে তারা খুব কম সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা কুড়াতে সক্ষম হয় এবং স্থানীয় ও জাতীয় ইলেকশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে জয়লাভ করে। কিন্তু আলজেরিয়ার শত্রুপক্ষ এদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি, প্রকৃত অধিকারটুকুও ছিনিয়ে নিয়েছে, এমনকি ড. আব্বাসীসহ অন্যান্য নেতাদেরকেও প্রতিরোধমন্ত্রী জেনরেল খালেদ নেজারের আদেশে কারারুদ্ধ করা হয়, যে উপাখ্যান আজ ‘রক্তাভ দশকী’ নামে লোকমুখে পরিচিত।

যাইহোক, এরপর আব্বাসী আল মাদানী আল-জাযায়েরী ১৯৯৭ সনে এ যাত্রার কারাবাস থেকে মুক্তি পান।পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সনে কাতার-প্রিন্সের আমন্ত্রণে রাজধানী দোহায় গমন করেন এবং গত ২৪শে এপ্রিল মৃত্যুকাল পর্যন্ত এখানেই রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় তিনি দিনাতিপাত করেন।

আল্লাহ তাঁর ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা করুন, তাঁকে জান্মাত নসিব করুন। আমিন।

আগের সংবাদরমজান প্রতিদিন- ৩ ।। সাহরি খাওয়ার উত্তম সময়
পরবর্তি সংবাদচট্টগ্রামে গলিত লোহায় ৩ শ্রমিক দগ্ধ