
আবু জর
জন্ম ও বংশ
মাওলানা শামছুল হুদা পাচঁবাগী সাহেব ইংরেজী ১৮৯৭ খৃষ্টাদ্ধে তথা বাংলা ১৩০৩ সালের ফাল্গুন মাসে ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিন মহকুমার অধীন গফরগাঁও থানার অর্ন্তগত মাইজবাড়ী নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কিছুদিন পরে তার পিতা গফরগাঁও এর পাঁচবাগ নামক গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে সেই পাঁচবাগ গ্রামটি এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের বাসস্থান হওয়ার জন্য বিখ্যাত হয়ে যায় । তিনিও এই গ্রামেই লালিত পালিত হয়ে বিশ্বের দরবারে মাওলানা পাচঁবাগী নামেই খ্যাতিলাভ করেছেন। জন্মসুত্রে তিনি এমন পিতার সন্তান ছিলেন যিনি শিক্ষা, সাধনায়, জ্ঞানে ও অধ্যাত্মিকতায় যথেষ্ট উৎকর্ষ সাধন করে ছিলেন। তার নাম মৌলভী ক্বারী রিয়াজ উদ্দিন। তিনি কিংবদন্তি আলেম রশিদ আহম্মদ গঙ্গুহীর খলিফা ছিলেন। অন্যাদিকে তার মাতা উম্মে কুলসুমও ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু একজন পরহেজগার নারী। এমনই পিতা মাতার ঘরে তার জন্ম।
শিক্ষা
শিশুকালে তিনি মাতার নিকট শিশু শিক্ষা শুরু করেন। কোন স্কুল বা মাদরাসায় ভর্তি না হয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। তিনি এতই মেধাশক্তির অধিকারী ছিলেন যে কোন বিষয়ই একবারের অধিক পরার প্রয়োজন হতনা। তবে এই অসাধারন স্মৃতিশক্তি ও তীক্ষ্ম মেধাকে আল্লাহ পাকের খাস দান বলে তিনি নিজেই বর্ননা করতেন।
মাদরাসায় ভর্তির পর হতেই শামছুল হুদার প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে। তিনি খুব আগ্রহের সাথে প্রতিটি শ্রেনীতে সিলেবাস বর্হিভুত নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকেন। প্রথম বিভাগে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে ছিলেন। তিনি জামাত ই উলার চুড়ান্ত পরিক্ষায় অংশ গ্রহন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ৯৮% নম্বর প্রাপ্ত হয়ে মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান অধিকার করত: স্বর্নপদক লাভ করেন। অতপর উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে তিনি শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ ক্রমে দীনি ইলমের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষা লাভের জন্য ভারতের রামপুর স্টেট মাদরাসায় ভর্তি হয়ে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে সেখানে গমন করেন। সেখানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বর্নপদকপ্রাপ্ত ছাত্রকে দেখার জন্য শিক্ষিত মহলে সাড়া পড়ে যায়। এবং রামপুর স্টেটের নবাব বাহাদুরও তাকে ডেকে নিয়ে সাক্ষাৎ করে তার প্রতি সম্মান জানান।
মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পুর্বেই হাদিসের ক্লাসে স্বেচ্ছায় যোগদান করে ছিলেন। মুহাদ্দিস সাহেব একটি হাদিস পড়ানোর পর মাওলানা শামছুল হুদা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মুহাদ্দিস সাহেবকে বললেন যে এই প্রসংগে হযরত আলী রা. থেকে বর্নিত আরেকটি হাদিস রয়েছে যা উল্লেখ করলে বিষয়টি অধিকতর বোধগম্য ও পরিস্কার হতে পারে। অতপর তিনি সেই হাদিস খানা মুহাদ্দিস সাহেবের অনুমতিক্রমে বিশুদ্ধভাবে বর্ননা করলেন। মুহাদ্দিস মহোদয় বিস্মিত হয়ে বললেন যে ছাত্র হাদিসের এমন উচ্চ পর্যায়ের কিতাব পড়াশোনা করেছে তার আর এখানে ভর্তি হয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের দেশে গিয়ে জনগনের সেবা করাই উত্তম।
তখন রামপুরের অধ্যক্ষ ছিলেন মাওলানা আব্দুল আজিজ সাহারানপুরী। তিনি ছিলেন দর্শনশাস্ত্রের উঁচু স্তরের পন্ডিত। মাওলানা শামসুল হুদা তার কাছ থেকে দর্শনের পাঠ গ্রহণ না করে দেশে ফিরতে চাচ্ছিলেন না। তবে মাওলানা সাহারানপুরীও ছিলেন কিঞ্চিৎ কঠোর স্বভাবের। ফলে তিনি মনে মনে কিছুটা ভীতও ছিলেন। এরপরেও সাহস সঞ্চার করে মাওলানা সাহারানপুরীর কাছে দর্শনপাঠের আবেদন জানান৷ সেখানেও তিনি সফল হন। একের পর এক দর্শনশাস্ত্রের বড় বড় সব কিতাব আত্মস্থ করে ফেলেন। মাওলানা সাহারানপুরী তার উপর আশ্বস্ত হলেন৷ এবং বললেন, তোমার পড়ালেখা সম্পন্ন বলেই আমি আশা করি। তুমি এখন দেশে ফিরে জনসেবায় নিয়োজিত হওয়াই বেশী মঙ্গলজনক হক।
মাওলানা শামসুল হকের জ্ঞান অন্বেষণের নেশা তখনো কাটেনি। তিনি ইংরেজি শিক্ষার জন্য লাহোরের অরিয়েন্টাল কলেজে চলে যান। অরিয়েন্টাল কলেজ থেকে মাওলানা শামসুল হকের তেমন কিছু শেখার ছিল না। তিনি তখনো ভাল মানের ইংরেজি জানতেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর দেশ থেকে বাবার টেলিগ্রাম পান। এবং দেশে ফিরে আসেন।
সংগ্রামমুখর কর্মজীবন
মাওলানা শামছুল হক দেশে ফিরে আসার পর সামাজিক অবস্থা ও জনগনের করুণদশা দেখে ব্যাথিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে জমিদারদের অত্যাচারে দেশের জনগন সর্বশান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করত৷ এবং মুসলমান প্রজারা গরু কোরবানী করতে পারতনা। যদি কোন মুসলমান গরু কোরবানী করত তা হলে জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনী জরিমানা আদায় করত। মাওলানা শামছুল হুদা এর প্রতিবাদে আন্দোলনের ডাক দেন এবং হোসেনপুর এলাকায় ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করে প্রকাশ্যে গরু কোরবানী করেন। এরপর হতেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন সহ দেশের মেহনতি কৃষকদের মুক্তির জন্য সারা জীবন আন্দোলন সংগ্রাম করে গেছেন। আন্দোলন করার কারণে ব্রিটিশ সরকার, জমিদার সংগঠন এবং পাকিস্তান সরকার সব মিলিয়ে ১০১৭টি মামলা দায়ের করে তার বিরুদ্ধে। তিনি সকল মামলা সাহসীকতার সাথে মোকাবেলা করেন। এসব মামলার কারনে তাকে ময়মনসিংহ শহরে ৮বছর নজরবন্ধী হিসাবে আটকে রাখে। তিনি সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য সর্ব প্রথম পাচঁবাগ গ্রামে একটি প্রেস স্থাপন করেন। উক্ত প্রেস হতে ইস্তেহারের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করতেন। তিনি একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, জনপ্রতিনিধি, অধ্যাত্মিক পীর ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব ছিলেন। ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে সকল জনগনের মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। যে সময় মাদরাসায় শুধুমাত্র আরবি ছাড়া অণ্য কোন বিষয় সিলেবাসে অর্ন্তভুক্ত ছিলনা তখনকার সময়ে তিনি তার প্রতিষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান, গনিত সহ সিলেবাস বর্হিভুত পড়াশোনা করাতেন। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষা আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নীত হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা শেষে সারা বাংলাদেশে অসংখ্য ছাত্র নিজ নিজ এলাকায় আধুনিক আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শিক্ষার প্রসার করে। যা বর্তমানে মাদরাসার রোডম্যাপ হিসাবে পরিচিত আধুনিক শিক্ষায় পরিনত হয়েছে। তিনি নারী শিক্ষার অগ্র পথিক ছিলেন। তিনি নিজ বাড়ীতে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তদানিন্তন পাকিস্থানে সর্ব প্রথম তার দুই মেয়ে কামেল পাশ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধে তিনি সরাসরি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ গ্রহণ করেন । কেননা ভারত বর্ষ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকেই মাওলানা শামছুর হুদা পাকিস্থানের বিরোধীতা করেন। এবং বঙ্গভঙ্গ রদের পক্ষে অবস্থান নেন। ১৯৭১ সালে তিনি রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্থানী হায়েনাদের হাত থেকে হিন্দু, মুসলমান পুরুষ ও মা বোনদের রক্ষা করতে তার বাড়ীতে মসজিদে ও মাদরাসায় আশ্রয় দান করেন। তাদের ইজ্জত ও জীবন রক্ষা করে সকলের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধে তার বাড়িতে শরণার্থীদের তিনি খাবারের ব্যবস্থা করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধে আগ্রহী যুবকদেরকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের জন্য নির্দেশ দিতেন।
ইন্তেকাল
১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এই প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, বাংলার প্রথম সারির স্বাধীনতাকামী রাজবন্দী, তিন দশক ধরে নির্বাচিত এমএলএ ও এমএনএ মাওলানা শামছুল হুদা পাঁচবাগী ময়মনসিংহ শহরের ব্রাহ্মপল্লীতে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
