গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আহমদ আবদুল্লাহ’র মুখোমুখি

ইসলামি সংগীতাঙ্গনের উদীয়মান তারকা আহমদ আবদুল্লাহ একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং কণ্ঠশিল্পী। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গাইছেন। শুরুতে আঞ্চলিকভাবে কেবল সিলেটের ইসলামি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সমাদৃত হলেও ক’বছর ধরে কলরবে কাজ করার সুবাদে তাঁর লেখা, সুর করা ও গাওয়া অনেকগুলো গান এখন সারা দেশে সুপরিচিত। বিশেষত মুসলিম সংস্কৃতির চিরায়ত পরিভাষাগুলোকে ফোকাস করে লেখা গানগুলো তুমুল সাড়া ফেলেছে। কলরবের শিশুশিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর ‘সালাত’, ‘সালাম’, ‘শবে বরাত’ এবং নিজের কণ্ঠে ‘জাযাকাল্লাহ’, ‘ইনশাআল্লাহ’, ‘আফসোস’ শিরোনামের গানগুলো ইসলামি সংগীত-শ্রোতাদের দারুণ মুগ্ধ করেছে। ফাতেহের ‘সংগীত সাপ্তাহিকী’ আয়োজনে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন হামমাদ রাগিব।

কেমন আছেন, কী করছেন?

আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। এই মুহূর্তে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, এর বাইরে আপাতত খুব কিছুতে ব্যস্ত না।

ঈদে কোন গানটা ভালো লাগলো?

সাইমুমের চার দেয়াল আর হলি টিউনে আমার লেখা ও সুর করা ‘ইকরা’ ভালো লেগেছে।

প্রিয় গায়ক কে?

জুনাইদ জমশেদ।

সঙ্গীত নিয়ে আপনার বেড়ে ওঠা এবং ক্যারিয়ারের গল্প শুনতে চাই।

ছোটবেলা আব্বুর কাছে শুনে অনুপ্রাণিত হই। তখন থেকে মাথায় ভনভন শুরু। অবশ্য কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না। কেবলই ভালোলাগতো বিষয়টা। আর ভালোলাগা থেকেই টুকটাক অগ্রসর হওয়া। এই পর্যন্ত এসে এখনও মনে হয় না আমি কোনো প্রকার ক্যারিয়ার গড়তে পেরেছি। কেবলই কিছু একটা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা, এই যা।

নিজের লেখা সুর করা এবং গাওয়া কোন গানগুলোতে বেশি সাড়া পাচ্ছেন?

আসলে আমি মনে করি আমার শ্রোতা সীমিত। সেই হিসেবে আমার সব গানেই শ্রোতাদের ভরপুর সাড়া পাচ্ছি।

আপনার প্রিয় গীতিকার এবং প্রিয় সুরকার কে?

প্রিয় গীতিকার কবি মুহাম্মদ রাইহান এবং প্রিয় সুরকার মশিউর রহমান।

ইসলামি ঘরানার বিদেশি গায়ক কাকে বেশি ভালো লাগে, কেন?

জুনাইদ জমশেদ। কারণ, ইসলামি নাশিদ কীভাবে গাইতে হয়, কীভাবে গাওয়া উচিত–তাঁকে মনোযোগ দিয়ে শুনলে ব্যাপারটা পুরোপুরি ধরা যায়। এর বাইরে তাঁর খুলুসিয়তটাও ভালোলাগার অন্যতম কারণ।

সংগীত জগতে কাউকে আইডল হিসেবে নিয়েছেন? নিলে কে?

যাঁরা ভালো করেন সবাইকে ফলো করি, শিখি, অনুপ্রাণিত হই। বিশেষ করে জুনাইদ জামশেদ।

কার গান শুনে ঈর্ষা হয়?

অনেকের; যাঁরা প্রতিনিয়ত ভালো করেন। ভয়ানক ঈর্ষা জাগে তাঁদের প্রতি।

ইউটিউবের দর্শক-ভিউ কি গানের গুণগত মান নির্দেশ করে?

অবশ্যই না।

বাংলাদেশের ইসলামি সংগীতের গুণগত মান নিয়ে আপনার মন্তব্য?

মানের বিচারে পর্যাপ্ত পরিমাণ মানসম্মত কাজ হচ্ছে না। গানের গুণগত মানের চেয়ে প্রেজেন্টেশনের দিকেই আমাদের বেশি মনোযোগ, যার দরুণ গুণগত মান সেভাবে রক্ষিত হচ্ছে না। আমি মনে করি, প্রেজেন্টেশনের আগে যদি গানের কথা ও সুর নিয়ে আরেকটু মনোযোগী হওয়া যেত, তাহলে অনেক দূর এগোতে পারতাম আমরা।

‘ইসলামি সংগীত’ পরিভাষাটা নিয়ে বিতর্ক আছে। সংগীতের সাথে ‘ইসলামি’ শব্দ যোগ করা নিয়ে। আপনি কীভাবে দেখেন?

আমি ব্যক্তিগতভাবে সংগীতের সাথে ইসলাম জুড়ে দিতে পছন্দ করি না। সংগীত তো বাদ্য, নৃত্য এবং গীতের সমষ্টিকে বলে। এই কারণে আমি ইসলামি সংগীতের সাথে ইসলাম ব্যবহার করতে সাহস পাই না। যদিও ‘ইসলামি সংগীত’ পরিভাষাটাই এখন প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।

গীতিকার যখন গান, সেই গানে কি আলাদা সৌন্দর্য তৈরি হয়? বা আলাদা এডভান্টেজ পাওয়া যায়?

অবশ্যই। গীতিকার যখন ভালো কণ্ঠের অধিকারী হবেন, তখন তিনি সবচেয়ে বেশি বুঝবেন এই গানের সুর ভাব আবেগ কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। একজন শিল্পীর চেয়ে একজন গীতিকার শিল্পীই নিজের গানকে অন্যের তুলনায় অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন।

কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গানগুলো আমাদের ইসলামি অঙ্গনে যতটা আলোচিত ও সমাদৃত হবার কথা, সেভাবে হচ্ছে না। কারণটা কী?

‘আমাদের ইসলামি অঙ্গন’ বলতে আমি কওমি ঘরানাকেই ধরছি। কওমি ঘরানায় নজরুলের ইসলামি সংগীতের চর্চা, দুই-একটা সংগীত বাদ দিলে, একদম ছিলই না। এর কারণ আসলে বাংলা সাহিত্য পঠন-পাঠন থেকে এ ঘরানার লোকজনের দূরত্বটাই দায়ী। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার কারণে কওমি ঘরানার যাঁরা সংগীত চর্চা করেছেন, নজরুলের সংগীত সম্পর্কে, বলতে গেলে, তারা বেখবর ছিলেন। দুই-একটা যা-ও শুনেছেন, সেগুলোতে মিউজিক থাকবার কারণে আরও অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। মিউজিক ছাড়াও যে গানগুলো নিজেদের মতো করে গাওয়া যায়, সে চিন্তায় তারা পৌঁছাননি। ফলত, আমাদের কাছে নজরুল এতদিন অচর্চিতই ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক কালে কওমি ঘরানায় লেখালেখি ও বাংলা সাহিত্য চর্চার একটা জোয়ার তৈরি হবার ফলে কিন্তু এখন ধীরে ধীরে নজরুলের সংগীত আমাদের কাছে চর্চিত হওয়া শুরু হয়েছে। এবং নজরুলগীতির দিকে নতুন প্রজন্মের ইসলামি সংগীতানুরাগীরা ও চর্চাকারীরা দারুণভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন।

আজ থেকে ১০ বছর পর নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান?

এতো দূর চিন্তা করতে সাহস হয় না। মানুষ হিসেবে আমি মোটেও পরিশ্রমী না।

ফাতেহকে সময় দেয়ার জন্য অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতা।

আপনাকে, ফাতেহকে এবং ফাতেহের পাঠকদের প্রতি শুভেচ্ছা এবং জাযাকাল্লাহ…

আগের সংবাদইসলামী সভ্যতায় শিল্পীরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন?
পরবর্তি সংবাদমুর্শেদী, মারেফতি ও জারি : বাংলা ভাষায় ধর্মীয় গানের ধারা