মুসলিম চিন্তকদের মাঝে শিবলী নোমানীর প্রভাব

আবদুল্লাহিল বাকি

উপমহাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পূর্বলগ্নে যেসকল মনীষীর অক্লান্ত সাধনা ও সংগ্রামে পথহারা ঐতিহ্যবিস্মৃত মুসলমানগণ সঠিক পথের দিশা পেয়েছে, সেসব মনীষীদের অগ্রে রয়েছেন আল্লামা শিবলী নোমানী। উপনিবেশবাদী ইংরেজরা যখন মুসলমানদেরকে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে পদলেহনকারী গোলামে পরিণত করেছে, ঠিক সেই সময় এই মহান মনীষী গোলামীর জিঞ্জির ভেঙে তাদেরকে শুনিয়েছেন গৌরবময় ঐতিহ্যের গল্প। দেখিয়েছেন রেনেসাঁর স্বপ্ন। পশ্চাতপদ জাতির সামনে তুলে ধরেছেন তিনি শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতির নতুন বিন্যাস।

তাঁর যুগে কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুসলিম চিন্তাবিদগণ একপেশে ও অধিকাংশে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিলেন নব যুগের মোকাবেলায় টিকে থাকার জন্য। কেউ পাশ্চাত্য সভ্যতার চাকচিক্য দেখে ঝুঁকে পড়েছিলেন সেদিকে। কেউবা আবার পাশ্চাত্যের ঢল দমন করতে বাঁচ-বিচারহীন আঁকড়ে ধরেছিলেন পূর্ববর্তীদের পথ ও মত। কিন্তু এই দলের সাময়িক ও সীমাবদ্ধ কিছু সমাধান থাকলেও বৃহত্তর মুসলিম প্লাটফর্মের অগণিত সমস্যার সমাধান দেয়া তাদের পক্ষে ছিলো অসম্ভব। এ দিক থেকে শিবলী নোমানী ছিলেন নতুন এক পথের আহ্বায়ক, যা জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে দিতে পারে। শিবলী নোমানী একদিকে যেমন ইসলামী বিশ্বাস ও দর্শনের সার্বজনীনতা ও চিরন্তন কার্যকারিতায় অটল বিশ্বাস রাখতেন, অন্যদিকে পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানকে পর্যালোচনার সাথে গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তার মনে হয়েছিল, এ দুয়ের সমন্বয়েই বর্তমানের মুসলমান স্বতন্ত্র ভাবধারা ঠিক রেখে আধুনিক যুগের উপযোগী হতে পারবে। তিনি আপন চিন্তার আলোকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচিত্র কর্মপ্রচেষ্টা ও সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তার এই ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাধারার প্রসার ঘটেছে ভারত ও এর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ভূখণ্ডে। সংক্ষিপ্তভাবে নিন্মে আমরা এই প্রসারের চিত্র তুলে ধরব। এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জীবনগঠনে তার চিন্তাধারার কী গভীর প্রভাব ছিল, তার আলোচনা করব।

ভারত পাকিস্তানে শিবলীর চিন্তার প্রভাব

এই ভূখণ্ডে তাঁর শিষ্যদের মাঝেই তাঁর চিন্তাধারার প্রভাব পড়েছে বেশি। অন্যান্য চিন্তাবিদদেরও চিন্তার বিন্যাসে তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সৈয়দ সুলাইমান নদভী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, সাইফুদ্দিন কিচলু প্রমুখ।

সৈয়দ সুলায়মান নদবীর শিষ্যত্বের সম্পর্ক আল্লামা শিবলী নোমানী সাথে কত গভীর ছিল তা যুগশ্রেষ্ঠ আলেম আশরাফ আলী থানবী রহমাতুল্লাহি আলাইহির মন্তব্য দ্বারা অনুমান করা যায়। তিনি বলতেন, ‘শিবলী নোমানী এবং সুলাইমান নবীর মধ্যে তেমন মিল পাওয়া যায় যেমন মিল পাওয়া গিয়েছিল ইবনে তাইমিয়া এবং ইবনুল কাইয়ুম এর মাঝে।’ অর্থাৎ শিষ্য ইবনুল কাইয়ুম যেমন করে গুরু ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারায় নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন তেমনভাবেই শিবলীর চিন্তাধারায় সোলায়মান নদভী নিজেকে গড়ে নিয়েছেন।

সৈয়দ সুলাইমান নদভী বিশেষজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন ইতিহাসে ও সিরাতে। দর্শন ও ইলমুল কালাম দ্বারা সেই সব ইতিহাসকে করেছেন যুক্তিযুক্ত, জ্ঞানের মানে উত্তীর্ণ। সেই সাথে আবুল হাসান নদভী সাক্ষ্য অনুযায়ী, কুরআনের জ্ঞান বিজ্ঞানের ছিলেন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ। ইলমুল কালাম ও কোরআনের বিভিন্ন শাস্ত্রে কী করে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন সেটার ইতিহাস তার মুখ হতে শোনা যাক। তিনি বলছেন, ‘ইলমে কালামের প্রতি যেটুকু আগ্রহ ছিল তার সবটুকুই ছিল মাওলানা শিবলী নোমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি সান্নিধ্যের প্রভাবে। তখন তাঁর রচনার পড়তাম। তাঁর উদ্বৃত কিতাব খুলে দেখতাম। সেই সাথে শাহরাস্তানী রহমতুল্লাহি আলাইহির ‘আল মিলাল ওয়ান নিহাল’ এবং ইবনে হাজম রহমতুল্লাহি আলাইহির ‘আল ফিসাল ফিল মিলালি ওয়ান নিহাল’ অধ্যয়ন করতাম। এরপর যখন ইবনে রুশদ রহমতুল্লাহি আলাইহির ‘কাশফুল আদিল্লা’ আর শাহ ওলিউল্লাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহির ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ অধ্যয়ন করলাম তখন এই কিতাবগুলো যেন আগের অধ্যায়নকে আরো রাঙিয়ে দিল। এক সময় আল্লামা ইবনে তাইমিয়া ও হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রহমতুল্লাহি আলাইহির রচনাবলী অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। তখন মনে হল যেন তাদের রচনাগুলো আগের সব অধ্যয়নের রং মলিন করে দিয়েছে। এক পর্যায়ে কুরআনের আলো আমার চোখে পড়ল, এই আলো প্রথম দেখালেন মাওলানা শিবলী নোমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি।’

সৈয়দ সুলাইমান নদবীর মতই মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শিবলীর ছাত্র ছিলেন। ছিলেন তাঁর ভাবধারার অনুসারী। অবিভক্ত ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হবার পর মাওলানা আজাদ ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে শিবলীর শিক্ষাদর্শনের প্রতিষ্ঠায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। মাওলানা আজাদ রাজনীতি পুরোপুরি সক্রিয় থেকেও কলম ছাড়েননি। সাংবাদিকতা করেছেন, গবেষণা করেছেন। অনেকগুলি জ্ঞান-পুষ্ট গ্রন্থ মুসলিম জাতিকে উপহার দিয়েছেন তিনি। আর এই গবেষণার পদ্ধতি আয়ত্ত করেছেন শিবলীর সংস্পর্শে থেকে। নদওয়ায় শিবলী মেধাবী ছাত্রদেরকে আলাদা ভাবে আধুনিক গবেষণা পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন। চর্চা করাতেন। এভাবে একসময় মৌলিক গবেষণায় তাদের হাত পাকা হয়ে উঠত। মাওলানা আযাদ সেই দরসগাহের এক কোণে বসতেন। অল্প দিনেই আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন কাঙ্খিত বিদ্যা। আল্লামা শিবলী কখনো কখনো ছাত্রদেরকে নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করতে বলতেন। ছিল পাঠাগার, অফুরন্ত তথ্য ও রেফারেন্সের ভান্ডার। বিভিন্ন ছাত্র অনেক বইপত্র ঘাটাঘাটি করে তথ্যপূ্র্ণ কোন রচনা তাকে দেখালেও তার মন সন্তুষ্ট হত না, কাঙ্ক্ষিত মানে না পৌঁছানোর কারণে। পরে যখন মাওলানা আজাদ প্রবন্ধ তৈরি করে দেখাতেন তখন তিনি বলতেন, ‘এটাই তো আমি চেয়েছিলাম।’

শুধু তাঁর ছাত্রই নয় বরং সহকর্মীদেরকেও আপন চিন্তাধারা ও রচনার অভিনবত্ব দ্বারা প্রভাবিত করেছিলেন। ১৩২২ হিজরীতে যখন নদ‌ওয়াতুল উলামার মুখপাত্র হিসেবে ‘আননদ‌ওয়া‌‌’ প্রকাশিত হয় তখন এর সম্পাদক ছিলেন আল্লামা শিবলী। তার সহকর্মী হিসেবে ছিলেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ন‌ওয়াব সদর ইয়ার জংগ মাওলানা হাবিবুর রহমান শের‌ওয়ানী। উর্দু ভাষার বিস্তৃত সাহিত্যআসরে তার প্রিয় লেখক মাত্র তিনজন। এদের প্রধান হলেন আল্লামা শিবলী। শিবলীর রচনা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব সম্পর্কে তার মুখ থেকে শোনা যাক। তিনি বলেছেন, ‘সেখানে (আলীগড়ে) আমার জন্য বড় একটি নেয়ামত ছিল মাওলানা শিবলী নোমানী রহমতুল্লাহি আলাইহির সান্নিধ্য। সেটা ছিল হযরতের আলিগড়ে আসার প্রথম সময়। সে সময় তার কাছে এলে ইতিহাস ও সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা হতো। আমি তার কিতাব ‘মুসলমানূঁ কি গুজাশতা তালিম’, ‘আল মামুন’ , ‘সীরাতুন নোমান’, ‘শেরুল আজম’ মোতালাআ করে পর্যালোচনা লিখলাম। এই কিতাবগুলো মোতালাআ করতে গিয়ে বিশেষ করে বাক্যের সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক বর্ণনা আর ঘটনা বলার শক্তি সত্যিকারার্থেই হৃদয়ের গভীরে প্রভাব ফেলল।”

আল্লামা শিবলী নোমানী প্রায় ষোল বছর আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে আপন বন্ধু স্যার সৈয়দ আহমদ খানের সহিত অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু দুজনের চিন্তাধারা এক খাতে প্রবাহিত ছিল না। বরং একের চিন্তা অন্যের প্রতিপক্ষ ছিল। সৈয়দ আহমদ খান আধুনিক মুসলিম সমাজের জন্য উপকারী মনে করতেন পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে। তাই তিনি সমস্ত ইসলামী বিশ্বাস, আচরণ ও আদর্শকে সাজিয়েছেন পাশ্চাত্য সভ্যতার ধাঁচে। ব্যাখ্যা করেছেন প্রাশ্চাত্য দর্শনের আলোকে। কিন্তু শিবলী ভাবতেন ইসলামী বিশ্বাস ও আদর্শকে ঠিক রেখেই আমাদের জাতীয় জীবনে আধুনিকতা ও যুক্তির প্রতিষ্ঠা সম্ভব। যেমনটা সম্ভব হয়েছিল ইসলামের গৌরবান্বিত অতীতে। কোরআন সুন্নাহর শিক্ষা আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের বিরোধী তো নয়ই বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমর্থক। আর কতক ক্ষেত্রে সামান্য সংশোধন ও পরিমার্জনই যথেষ্ট। সৈয়দ আহমদ খান শিবলির চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হননি মোটেও ঠিক। কিন্তু তার পরবর্তী অধ্যক্ষ সৈয়দ আমীর আলীকে শিবলির চিন্তাধারার ধারক‌ই বলা যায়। এই সত্যটাকে ইসলামী চিন্তাবিদ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ‘ইসলামী আন্দোলন : যুগে যুগে’ বইয়ে তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘শিবলীর চিন্তা থেকে প্রেরণা পেয়ে আমির আলী অতীতের মুসলিম জগত থেকে নজির উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছেন, ইসলামের অতীত ইতিহাস গৌরবময় এবং ইসলাম আবার তার লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তিনি তার ‘history of saracens’ এবং ‘the spirit of Islam’ নামক বিখ্যাত পুস্তকদ্বয় প্রণয়ন করেন।

স্যার সৈয়দের পদ্ধতি ছিল নেতিবাচক (negative)। যেমন, ইসলামকে নারীর অধঃপতন এর জন্য দায়ী বলে তিনি মনে করতেন না। আমির আলী ধারণা ছিল ইসলামিক সর্বপ্রথম নারীকে মুক্তি দিয়েছে, কেবল নারীকে মুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। সে যুগেও দাসপ্রথা (slaveiy) বন্ধ না করলেও সে প্রথাকে বন্ধ করার জন্য পরোক্ষ মানবমনকে উৎসাহিত করেছে।

তিনি আফসোস করতেন যে, ইসলামে মানবতার বিকাশের এমন সুযোগ বর্তমানে ইজতিহাদের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে সেই ইসলামে মানব-মনকে একেবারে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সৈয়দ আমীর আলী শিবলীর মতোই অতীতের মুসলিম প্রাধান্যের দৃষ্টান্তস্বরূপ আব্বাসীয় তথাকথিত খলিফাদের খিলাফতের আদর্শকে গ্রহণ করেছেন।’

এখানে আমরা দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের শেষ কথাটির সহিত পুরোপুরি একমত হতে পারছি না। আমির আলী কোন খেলাফতের আদর্শকে গ্রহণ করেছেন তা এখানে থাক। শিবলী কোন আদর্শকে গ্রহণ করেছেন তা আলোচনা করা যাক। এখানে লেখকের ব্যবহৃত ‘আব্বাসীয় তথাকথিত খলিফাদের’ বাক্যাংশ নিয়ে একটু পর্যালোচনা করি। মূলত এখানে তার ব্যবহৃত শব্দগুলো থেকে কয়েকটি প্রশ্ন জাগে। শিবলী কি আব্বাসীয় কাউকে গ্রহণ করেছিলেন? যদি গ্রহণ করে থাকেন তাহলে সে ক্ষেত্রে কি ‘খলিফাদের’ অর্থাৎ বহুবচন ব্যবহার সঙ্গত? যাকে গ্রহণ করেছেন তিনি কি প্রকৃতই তথাকথিত ছিলেন? যদি এতসব দাবি সত্য না-ই হয় তাহলে কোন কারণেই বা লেখক এত সব উদ্ভট দাবি করতে যাবেন?

প্রশ্নগুলোর জবাবে আমরা বলব প্রথমত আধুনিক মুসলিম বিশ্বের আদর্শ খলিফা রূপে যাকে তিনি নির্বাচন করেছিলেন তিনি কস্মিনকালেও আব্বাসীয় কেউ ছিলনা। তিনি ছিলেন মহানুভব, ন্যায়ের প্রতীক আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু। তার জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করেই তিনি লিখেছিলেন তার অমর গ্রন্থ ‘আল ফারুক’। মুসলিম বিশ্বের চারিদিকে যখন মহাজাগরণ শুরু হয়েছে, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে, মুসলিমগণ ব্রিটিশ বেনিয়াদের গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করে স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন ঠিক তখনই তিনি বিভিন্ন দেশের বিপ্লবীদের হাতে তুলে দেন ‘আল ফারুকের’ সওগাত। রাজনৈতিকভাবে আধুনিক মুসলিম বিশ্বের জন্য ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর আদর্শকেই তিনি বাস্তবে দেখতে চাইছিলেন। এবং এর পাশাপাশি আব্বাসী আমলে মুসলিমদের জাতীয় জীবনে যে জ্ঞান বিপ্লব ঘটেছিল তার পুনরুত্থান চাইতেন; আধুনিক বিশ্বের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখেই। এবং সেই জ্ঞানবিপ্লবের তত্ত্বাবধানে ছিলেন খলিফা আল মামুন। যিনি ছিলেন বিদ্যোৎসাহী, ধীমান ও দার্শনিক। মুসলিম জীবনে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠায় তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও হাত থাকার দরুন তার জীবনীও শিবলী নোমানী তুলে ধরেছেন। তার জীবনের হাতে গোনা যেসব বিচ্যুতি রয়েছে—প্রশংসার পাশাপাশি সেগুলোও তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সততার সাথে। সুতরাং আব্বাসী যুগের বিজ্ঞানবিপ্লব ও তার হোতাদেরকে সমর্থন করা সে যুগের রাজনীতি ও তথাকথিত খলিফাদের সমর্থন করা হয় কি করে!

মহাকবি ইকবালের জীবনেও শিবলীর আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে। সাময়িক অধঃপতন থেকে যে মুসলিম জাতি পুনরায় বিশ্বের নেতৃত্বে যেতে পারবে, এ বিষয়ে ইকবালের কোনো সন্দেহ ছিল না। এজন্য মুসলিম সমাজে প্রয়োজন ছিল গতিবাদের। সেই গতিবাদ দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন ইকবাল। এই গতিবাদকে মুসলিম জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ইকবাল লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান। মুসলিম বিশ্বের যথার্থতা সাব্যস্ত করতে লেকচার দিয়েছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে। ইসলামী জীবন ও দর্শনের উপযোগিতা, সার্থকতা তুলে ধরার জন্য তিনি চিঠি পাঠিয়েছিলেন এমন একজনের কাছে যিনি ছিলেন শিবলীর‌ই হাতে গড়া এক পরশপাথর। ইকবাল এক্ষেত্রে যোগ্য মনে করেছিলেন শিবলীর এক ছাত্র সৈয়দ সুলাইমান নদভীকে।

‘ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় গতিবাদ’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘আব্বাসী যুগে মুসলিমদের অবাধ জ্ঞান চর্চার অফুরন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল এবং এই জ্ঞান চর্চায় মদদ যোগাচ্ছিল ইসলামের‍ই অন্যতম অনুষঙ্গ ইজতিহাদ। আব্বাসী যুগের পরে তাতারীদের হামলায় যখন মুসলিমদের রাজনৈতিক পতন ঘটল তখন তারা চিন্তাগতভাবে নিম্নস্তরে নেমে এলো। তারা ভাবল, পূর্ববর্তীদের যে যোগ্যতা ছিল আমাদের তা নেই। সুতরাং ইজতিহাদের দরজা খোলা থাকার কোন অবকাশ আর থাকে না। এভাবেই বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে মুসলিম সমাজ ক্রমেই অধঃপতিত হতে লাগলো।’ বলাবাহুল্য ইকবালের এই চিন্তাটি শিবলীর চিন্তারই প্রতিধ্বনি মাত্র।

সৈয়দ আহমদের ইন্তিকালের পর শিবলী আলিগড় কলেজ ত্যাগ করেন। এরপর কিছুকাল হায়দারাবাদ রাজ্যের শিক্ষা বিভাগে উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত থাকেন। তখন তিনি সেখানে নিউস্কীম শিক্ষাপদ্ধতি চালু করেন; যাতে মুসলিম শিশু কিশোররা ধর্ম ও কর্মের সমন্বয়ে উপযুক্ত শিক্ষা পেয়ে মুসলিম জাতির হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। হায়দারাবাদের একটা নিউস্কীম মাদ্রাসা হতেই জন্ম নিয়েছিলেন উপমহাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলনের পথিকৃৎ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী; যার লেখা পড়ে যথেষ্ট সংখ্যক নাস্তিক অথবা পথভোলা তরুণ ইসলামের দিশা পেয়েছে। মওদুদি সাহেব তার এক লেখায় বলেছিলেন, ‘প্রাচীন মাদ্রাগুলোতে পড়ে ছাত্ররা সাধারণত প্রচুর সময় খরচ করেও ভালো মানের আরবি শিখতে পারে না। অথচ নিউস্কিম পদ্ধতিতে ভালোভাবে ছয় মাস আরবিতে কাজ চালানোর মত দক্ষতা অর্জিত হয়ে যায়।’ বলাবাহুল্য এ কথা বলে প্রকারান্তরে তিনি শিবলী প্রবর্তিত নিউস্কীম পদ্ধতির প্রতি আপন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন।

যারা জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন তাদের মধ্যেও কারো কারো জীবনে শিবলী নোমানী গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী; যিনি সম্পূর্ণ শিক্ষাই অর্জন করেছেন পাশ্চাত্য শিক্ষাধারায়। যখন তিনি ছোট ছিলেন তখনই শিবলী সম্পাদিত মাসিক ‘আলকালাম’ পড়তেন নিয়মিত। শিবলীর অনুসরণে আর্যসমাজী হিন্দুদের বিরুদ্ধে লিখতেন বিভিন্ন প্রবন্ধ। কিন্তু পরবর্তী জীবনে ঘটনার চক্রবাকে ধর্মবিরোধী বই-পুস্তকের মাধ্যমে যখন নাস্তিকতায় তিনি পুরোপুরি ডুবে গেছেন, তখন শিবলী হেকমতের সাথে তাকে ইসলামের পথে ডাকতেন। বলতেন, ‘আপনি তো আরবি পারেন। ধর্মের জন্য না হোক অন্ততপক্ষে সাহিত্যের জন্য হলেও তো কোরান পাঠ করতে পারেন। এর জন্য ওজু হয়তো নাইবা করলেন। শুনেছি, জার্মানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোরানের শেষ পনের পারা সাহিত্যকলা অনুষদে পড়ানো হয়।’ এরকম দরদি কথা ধীরে ধীরে তার মনকে ইসলামের প্রতি পুনরায় আকৃষ্ট করেছিল। কিছুদিন পর যখন শিবলী বিরচিত সিরাতুন্নবী প্রকাশিত হল তখন আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি হাতে আসা মাত্রই তা পড়ে ফেললেন। পড়া শেষ করে তার অনুভূতি ছিল, তিনি সারা অন্তরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কুফুরির চিহ্ন পেলেন না। এভাবেই শিবলীর অসিলায় নাস্তিকতার সাগরে নিমজ্জিত এক অন্ধ ইসলামের আলো দেখতে পেল; শুধু তাই নয় বরং পরবর্তীকালে আলেম হিসেবেও বরিত হয়েছিলেন।

আরব ও আজমের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, দায়ী ও ইসলামী চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল হাসান নদবী। তার হৃদয়জগতে, সাহিত্যে ও গবেষণায় শিবলী নোমানী কেমন প্রভাব ফেলেছিলেন তা তার মুখ থেকেই শোনা যাক। তিনি বলছেন, ‘এর কিছুদিন পর হাতে এল মাওলানা শিবলী মরহুমের কিতাব আল ফারুক, কানপুর মাতবা নামী থেকে প্রকাশিত। এ কিতাবও বারবার পড়েছি। ইরাকের বিভিন্ন যুদ্ধে বুয়াইব, জিসর কাদিসিয়া প্রভৃতি রণাঙ্গনে মুসলিম মুজাহিদিনের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের যে চিত্র মাওলানা অঙ্কন করেছেন তার সহজ সাবলীল ছোট ছোট বাক্যে, তা বোধ করি ইরানী কবি ফেরদৌসী শাহনামা কাব্যের পংক্তিমালায় কঠিন কঠিন শব্দ আর রুপকথার আতিশয্য দিয়েও অংকন করতে পারেননি।

আল ফারুকের জীবন্ত বাক্যমালা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করত ধারালো তরবারির মত। রচনাটির ঘটনা অংশের প্রভাব এখনো দিল দেমাগে অনুভব করি।…

তার দ্বিতীয় রচনা যা সেসময় পড়েছি– ‘সফরনামা‌য়ে রুম ও মিশর ও সাম’ এদুটো রচনাই আমাদের পল্লীর সংক্ষিপ্ত কুতুবখানায় বিদ্যমান ছিল। শেষোক্ত রচনা আমার জ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত করেছে আর হয়তো এ কিতাবের পৃষ্টা থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছিল কিশোরমনে মুসলিম জাহানে ভ্রমণের অভিলাষ; যা পূরণ হয়েছে অনেক বছর পরে।

কিছুদিন পর হাতে পেলাম মাওলানার জীবনীমূলক রচনা ‘আল গাজালী’, ‘সাওয়ানেহে মাওলানা রুম’, ‘আল মামুন’ ইত্যাদি। সম্ভবত সে সময় থেকেই আমার অনুভূতি– জীবন রচনায় এর চেয়ে উত্তম শৈলী আধুনিক উর্দু ভাষায় আর নেই। ফলে অবচেতনভাবেই অনুসৃত হয়েছে আমার রচনা ‘তারিখে দাওয়াত ওয়া আযিমত’ এবং অন্যান্য জীবনীগ্রন্থে।

দুঃখের বিষয় এই যে, মাওলানা ‘শেরুল আজম’ পড়ার সুযোগ হয়েছে অনেক পরে। আমি মনে করি এটি এ বিষয়ে অতুলনীয় রচনা এবং মাওলানার জীবন্ত কীর্তি।’

পাকিস্তানের বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাসিক নাসিম হিজাজির প্রসঙ্গও বাদ দেয়া যায় না। কারণ নসীম হিজাযির প্রিয় ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ হাসানুল বান্না, জামায়াতের ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদী, আল্লামা ইকবাল ও আল্লামা শিবলী নোমানী। নসীম হিজাযী বলেন, ‘আমি যদি কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকি তাহলে তিনি হলেন মাওলানা মওদুদী। এমনিভাবে আল্লামা ইকবালের সার্বজনীন ও বৃহত্তর চিন্তা চেতনায় ও আমি স্নাত। আমার চিন্তাধারা যদি পরিস্কার পানি হয়, তাহলে তার দুই তীর হলেন মাওলানা মওদুদী এবং আল্লামা ইকবাল। তাদের দান এই যে, এই পানিকে তারা বাইরে যেতে দেননি। আমার এ চিন্তাধারার পেছনে আল্লামা শিবলী নোমানীর অবদান ও যথেষ্ঠ। আর হাসানুল বান্না, তার শহীদী রক্ত এখনো আমার কাছে অম্লান, তরতাজা।’

মধ্যপ্রাচ্যে শিবলী নোমানীর প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের শিবলী নোমানীর প্রভাব ছিল কি ছিল না, থাকলেও কতটুকু ছিল,– এ বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে নিশ্চিত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, কারণ আরবি আধুনিক সাহিত্যে শিবলীর মত চিন্তাধারার ধারক অনেককেই দেখা যায়। কিন্তু উদ্ধৃতি বা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত না থাকায় উৎসস্থল নির্ধারণ করা জটিল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে শিবলী নোমানীর পূর্বেই আরও বেশি সাড়া জাগিয়েছিলেন জামাল উদ্দিন আফগানি ও তার সুযোগ্য শিষ্য মুহাম্মদ আবদুহু। শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে জামাল উদ্দিন আফগানির চিন্তাধারা ও তার আন্দোলন এতটাই প্রভাবদীপ্ত ছিল যে, শিবলী নোমানীর চিন্তাধারা আরব বিশ্বে প্রচারিত হবার কোন প্রয়োজন ছিল না। এতকিছুর পরও শিবলীর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর আরবি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং নতুন নতুন সংস্করণ বেরোচ্ছে। এতে তার বইয়ের পাঠকপ্রিয়তা উপলব্ধি করা যায়। বড় বড় আরবি চিন্তাবিদ তার রচনার প্রশংসা করেছেন। যেমন সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভীর সাক্ষাতের সময় আল্লামা যাহেদ কাউসারী শিবলী নোমানীর সিরাতুন্নবীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

প্রথমদিকে শিবলী নোমানী আরবি ভাষায় বইপুস্তক রচনা করতেন। তিনি যখন মধ্যপ্রাচ্যে সফরে গিয়েছিলেন তখন আবদুল ফাত্তাহ নামের এক আলেম শিবলি রচিত ‘ইসকাতুল মুতাআদ্দী’ নামক গ্রন্থের প্রশংসা করেছেন।

শিবলি নোমানীর সাথে লেবাননের বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ জুরজি যায়দানেরও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। শিবলি নোমানি জুরজি সম্পাদিত ‘আল হেলাল’ পত্রিকায় কখনো কখনো স্বরচিত আরবি প্রবন্ধ পাঠাতেন। এই ঘনিষ্ঠতার তাগিদেই, জুরজি যায়দান যখন ‘তারিখুত তামাদ্দুনিল ইসলামী’ (ইসলামী সভ্যতার ইতিহাস) বইখানা রচনা করলেন তখন শিবলি নোমানীকে সেই বইয়ের একটা কপি হাদিয়া দিলেন। কিন্তু সেই বইয়ে ইসলাম বিরোধিতা ও আর বিশুদ্ধ ইতিহাসের বিকৃতি তাকে ব্যথিত করল। এর জবাবী গ্রন্থ হিসেবে তিনি লিখলেন ‘আল ইনতেকাদ আলাত তামাদ্দুনিল ইসলামী’ (ইসলামী সভ্যতার সমালোচনা)। সে সময় মিসরের বিখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক আল্লামা রশিদ রেজা চাইছিলেন, জুরজি যায়দানের বইটার পর্যালোচনা কেউ লেখবে। এজন্য বিভিন্ন জ্ঞানীর কাছে তিনি এ বিষয়ে অনুরোধ করছিলেন। শেষে উপায়ান্তর না দেখে নিজেই এর জবাব লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিবলী নোমানীর বইটা যখন তার হাতে আসে তখন তা দেখে তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলেন। এবং তার সম্পাদিত ‘আল মানার’ পত্রিকায় ছেপেছিলেন। পরবর্তীতে তা সেখান থেকে কিতাব আকারেও প্রকাশিত হয়েছিল।

তাছাড়া যখন আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হল ১৮৯৯ সালে, তখন আল্লামা রশিদ রেজা তার সম্পাদিত পত্রিকা ‘আল-মানার’ (সংখ্যা: ৩০ জুমাদাস সানি ১৩১৭ হি.) এ তিনজন শিক্ষাসংস্কারকের নাম প্রস্তাবনা হিসেবে পেশ করেন। ১. শায়খ আহমদ জান রূশী ২. শায়খ আহমদ শানকিতী মাগরিবী ৩. শায়খ শিবলী নোমানী আল-হিন্দী।

এবার একটু পরোক্ষ প্রভাবের কথা না বললেই নয়। একবার এক প্রাচ্যবিদ মুসলিম রসায়নবিদ আবূ রায়হান আল বিরুনী প্রশংসায় একটি প্রবন্ধ লিখলেন; একটি ইংরেজি পত্রিকায় তার প্রকাশিত হলো। সেখানে তিনি আল বিরুনীর বিভিন্ন কর্মকীর্তির আলোচনা শেষে বললেন, ‘এই মনীষী দিনে দিনে মানুষের কাছে বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছেন। তাই একদল মুসলিম তরুণদের উচিত তার নামে একটি গবেষণাগার স্থাপন করা, যেখানে তার কর্মকীর্তি নিয়ে শেকড়সন্ধানী গবেষণা করা হবে। পত্রিকাটি প্রখ্যাত আরব সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক ড, আহমদ আমিনের হাতে পৌঁছল। তিনি প্রবন্ধটি পড়লেন এবং তার ছাত্রদের সামনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, ছাত্রদের কেউই নাকি আল বিরুনীকে চেনে না। বিষয়টি আহমদ আমিনকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি আপন চিন্তার আলোকে একটি প্রবন্ধ লিখলেন, যা পরবর্তীতে ‘ফাইজুল খাতির’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়। যার সারকথা ছিলো বর্তমানের আধুনিক যুবকরা পূর্ববর্তী মুসলিম মনীষীদের চেনেনা, তাদের অবদানের কথা জানেনা; কারণ আমরা ধর্মীয় শিক্ষা ও জাগতিক শিক্ষাকে আলাদা করে ফেলেছি। আধুনিক যুগের কোন ব্যক্তিত্বের মধ্যে এ দুয়ের সমন্বয় সাধারণত দেখা যায় না– বিশেষ করে আরবদের মাঝে। কিন্তু হিন্দুস্তানে এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যেমন মহাকবি ইকবাল ও সৈয়দ আমীর আলী। এরা দুদিকের জ্ঞানই আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। আহমদ আমিন এরপর এই দুই মনীষীর প্রভূত প্রশংসা করেছেন। তারা দুজন যতটা প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন নিশ্চয় শিবলী নোমানী ততটা প্রসিদ্ধ নন তবু আমরা জানি এই মনীষীদ্বয় তাদের চিন্তাধারার নির্যাসে শিবলী চিন্তাধারার প্রভাব প্রতিভাত হয়। সুতরাং এটা বলা তো দূরবর্তী কিছু নয় যে, তাদের চিন্তাধারা ও জ্ঞান পদ্ধতির প্রশংসা প্রকারান্তরে শিবলী নোমানীর প্রশংসার সমার্থক।

বাংলাদেশের শিবলী নোমানী চিন্তাধারার প্রভাব

ভারত ও পাকিস্তানে শিবলী নোমানী যতটুকু আপন চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছিলেন, বিস্তৃতির দিক থেকে বাংলাদেশ ততটুকু না হলেও স্বল্প ছিল বলা যায় না। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তার প্রভাব অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তমদ্দুন মজলিস। কবি ফররুখ আহমদের স্নেহধন্য তরুণরা ছিল এ মজলিসের সদস্য। এই কবি ও তার স্নেহধন্য তমুদ্দুন তরুণদের কর্ম ও চিন্তাধারায় শিবলী নোমানীর প্রভাব কেমন ছিল, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান থেকেই শোনা যাক তা। তিনি ফররুখ আহমাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার প্রথম অনূদিত বই আল্লামা নোমানীর ‘আল ফারুক’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। বাঁধাইখানা থেকে প্রথম বইটি নিয়ে যখন তাঁর (কবি ফররুখ আহমদ) হাতে তুলে দেই সেদিনের সে বিশেষ মুহূর্তটির স্মৃতি চিরদিন আমার জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সুদৃশ্য মলাটশোভিত এই বৃহদাকার বইটি হাতে নিয়ে তিনি আনন্দে এমন আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন যে, আবেগে কিছুক্ষণের জন্য তাঁর বাক রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ নিরব থেকে তিনি ভরা গলায় বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শুকুর আমার বহুদিনের আকাঙ্খিত এ বই পড়বার সুযোগ হয়েছে।’

তার আকাঙ্ক্ষা ছিল এদেশের জমিনে ফারুকী খিলাফতের প্রতিষ্ঠা। তার ভক্ত-অনুরক্তদের সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ফারুকী খিলাফতের স্বপ্নকেন্দ্রিক। সে কারণেই আল্লামা শিবলী নোমানীর লেখা গবেষণাগ্রন্থ ‘আল ফারুক’ বইটির প্রতি তাদের কৌতূহল ছিল। আমি এদের মুখেই বইয়ের আলোচনা শুনে বইটি তরজমা করতে শুরু করি।’

বিখ্যাত সাংবাদিক ও গবেষক মৌলানা আবুল কালাম আজাদ গবেষণামূলক বেশ কিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শিবলী নোমানীর নিজস্ব মতামত থেকে। যেমন, কথিত আছে, নবীজির জন্মের সময় পারস্য বাদশাহর সৌধগুলো ভেঙে পড়েছিল ও অগ্নিপূজারীদের হাজার বছরের জ্বলন্ত আগুন নিভে গিয়েছিল। শিবলী নোমানী তার সীরাতুন্নবীতে এসব ঘটনাকে ভিত্তিহীন বলে মত প্রদান করেছেন। কিন্তু সে সময় মাওলানা ইদ্রিস কান্ধলবিসহ অনেকেই শিবলীর বিরোধী অবস্থানে ছিল। একটি মাত্র দুর্বল সনদ এনে ইদ্রিস কান্ধলবি এসব ঘটনাকে সাব্যস্ত করার প্রয়াস চালিয়েছেন, কিন্তু মৌলানা আকরাম খাঁ স্বরচিত ‘মোস্তফা চরিত’ বইয়ে শিবলি নোমানীর মতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বলেছেন, ‘কথিত আছে যে, হযরত যখন মাতৃগর্ভে অবস্থান করিতেছিলেন, সেই সময়… পারস্যের বাদশা নওশেরওয়াঁর সৌধচূড়াগুলি ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল। অগ্নিপুজকদের যুগ-যুগান্তরের সঞ্চিত অগ্নিকুণ্ডগুলি অবলীলাক্রমে নির্বাপিত হইয়া গিয়াছিল।… এই গল্পগুলি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কল্পিত উপকথা ব্যতিত কিছুই নহে। ধর্মের কথা ত দূরে থাকুক, ইতিহাসের হিসাবেও এই কিংবদন্তিগুলির কানাকড়িরও মূল্য নাই।’ বর্তমান যুগে এসে বিখ্যাত হাদিসশাস্ত্রবিদ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ, এই ঘটনার ব্যপারে ভিত্তিহীনতার সিদ্ধান্তমূলক মত দিয়েছেন। আল্লামা সালিহ আহমদ শামী তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মিম মাঈনিশ শামাইল’-এ এ কথাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

ব্রিটিশ বাংলায় শিবলির শিক্ষাদর্শন ধারণ করে নিউ স্কিম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সর্বপ্রথম শামসুল ওলামা আবু নছর মোহাম্মদ ওয়াহিদ (১৮৭৮-১৯৫৩), তিনি একজন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আবু নসর ওহীদই সর্বপ্রথম আরবিতে অনার্স ও এমএ পাস করার গৌরব অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রিফর্ম মাদ্রাসা স্কিম বা নিউ স্কিম (১৯২৪) প্রবর্তন করে ইসলামী শিক্ষার ক্ষেত্রে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯১৯ সালে মাদ্রাসাটি নিউ স্কিমের আওতায় ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে উন্নীত হলে তিনি তার অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং ১৯২৭ সালে অবসর গ্রহণের পূর্বপর্যন্ত ওই পদে বহাল ছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান-ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে ফলপ্রসূ সমন্বয়ের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়কে শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করা; নিউ স্কিমের মাধ্যমে ইসলামী ভাবধারাসম্পন্ন একদল বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও সরকারি চাকরিজীবী তৈরি করে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি গোঁড়া মুসলমান সমাজের বিদ্বেষ প্রশমন করা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে আরবি চর্চার মজবুত ভিত রচনা করা।

আল্লামা শিবলী নোমানী যখন হায়দারাবাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কাজ করছিলেন তখন প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা উর্দুকে নির্বাচন করেছিলেন। এটা ধর্মীয় পরিমণ্ডলে একটা সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষাধারায় এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন মাদানী নেসাবের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ সাহেব। তিনি বলেছেন যে, ‘প্রতিটি শাস্ত্রের অন্তত প্রথম কিতাবটা মাতৃভাষায় শিক্ষা দেয়া উচিত। এতে করে একটি ভিন্ন ভাষার মারপ্যাঁচে না পড়েই শিক্ষার্থীর জন্য বিষয় আত্মস্থ করা সহজ হবে।’

সবশেষে বলব, মহান ব্যক্তিদের চিন্তা ও দর্শন পরবর্তীদের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলে থাকে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। একটা জাতি ও ঐতিহ্যবাহী সংঘের উন্নতির ধাপে প্রতিটি পদক্ষেপ তার অতীত চিন্তাবিদ ও সংস্কারকের দিকে পূণরায় ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। অগ্রগতি যতটা গতিমতয়তা পায় তত বেশিই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে মহান ব্যক্তিবর্গের সাধনা ও কীর্তি। শিবলী নোমানি একটা পতনোন্মুখ জাতির পশ্চপদতাকে দেখেছেন, তাদেরকে স্বর্ণোজ্বল অতীতের গৌরবগাঁথা শুনিয়েছেন। দেখিয়েছেন ভবিষ্যত সম্ভাবনার আলো। আগত সংস্কারমনা চিন্তাবিদের জন্য তার প্রভাব অনস্বীকার্য।

আগের সংবাদমক্কায় আরও এক বাংলাদেশি হাজির মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদজৈন ধর্মের রীতি মানতে গিয়ে টানা ৮ দিন না খেয়ে তরুণীর মৃত্যু