
হামমাদ রাগিব
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা—মাত্র আধা ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ৬৩টা জেলার প্রায় ৩০০টি স্পট বোমা বিস্ফোরণের ভয়ানক প্রকম্পনে কেঁপে উঠেছিল। ভয় ও শংকায় কেঁপে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষও। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল অজানা আতঙ্ক।
সারা দেশে একযোগে চালানো এ বোমা হামলায় দুজন নিহত এবং আহত হয়েছিলেন পাঁচ শতাধিক। হামলার পরপরই বিস্ফোরণ স্থলগুলো পরিদর্শন করতে গিয়ে পাওয়া যায় ছড়ানো-ছিটানো বেশ কিছু লিফলেট। লিফলেটগুলোতে একটি সংগঠনের নাম। সিরিজ বোমা হামলার দায় স্বীকার করে বেশ কিছু কথা সংযোজিত লিফলেটগুলোতে। সংগঠনটির নাম জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।
এই সিরিজ বোমা হামলা এবং এর দায় স্বীকারে ছড়ানো লিফলেট থেকেই আলোচনায় আসে জেএমবি। দেশে-বিদেশে আলোচিত হতে থাকে সংগঠনটির নাম। জঙ্গি সংগঠন হিসেবে তা তৎক্ষণাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কালো তালিকাভুক্তও হয়। একই সঙ্গে সংগঠনটি আতঙ্কের অন্য নাম হিসেবে পরিগণিত হয় সাধারণ মানুষের কাছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযানের মধ্য দিয়ে গ্রেপ্তার শুরু করে জেএমবি-সদস্যদেরকে।
এদিকে সিরিজ বোমা হামলা ও জেএমবি’র উত্থানের পর বাংলাদেশের আলেম সমাজ ও মাদরাসাগুলোর ওপর জঙ্গি-তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠানোর অপচেষ্টা শুরু করে একটি মহল। জেএমবির শীর্ষ কয়েক নেতা দাঁড়ি-টুপিধারী হবার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতেও আলেম-শ্রেণিকে ব্যাপকভাবে ‘জঙ্গি’ ও উগ্রবাদী ট্যাগ দেওয়া শুরু হয়।
যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জেএমবি
জেএমবি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ছিলেন লা মাজহাবি (আহলে হাদিস) ঘরানার আলেম। বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে কামিল পাশ করার পর তিনি সৌদি আরবের মদিনা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যান। বলা হয়ে থাকে, সেখান থেকেই তিনি জিহাদি ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হন।
২০০৬ সালের ২ মার্চ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হবার পর নিজের যাবতীয় কর্মতৎপরতা সম্পর্কে জবানবন্দি দিয়েছিলেন শায়খ আবদুর রহমান। সেই জবানবন্দী থেকে জানা যায়, মদিনা থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর দেশে ফিরে তিনি ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে ‘বিভোর’ ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে প্রচলিত কোনো ইসলামি সংগঠনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে পারছিলেন না তিনি। জামায়াতে ইসলামীসহ নিবন্ধিত ইসলামি দলগুলো গণতান্ত্রিক ধারায় কাজ করার কারণে তাদের সঙ্গে মিশতে পারছিলেন না, আর অনিবন্ধিত অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধ থাকার দরুণ তাদের সঙ্গেও কাজ করতে পারছিলেন না। ফলে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার পর ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠা করেন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)।
জেএমবি প্রতিষ্ঠা করে নিজেই আমির হন শায়খ আবদুর রহমান। ঢাকার খিলগাঁওয়ে একটি ভাড়া বাসায় বসে প্রথম শুরা কমিটি হয়। তাতে শায়খ আবদুর রহমান ছাড়া বাকি সদস্যরা ছিলেন খালেদ সাইফুল্লাহ, হাফেজ মাহমুদ, সালাউদ্দিন, নাসরুল্লাহ, শাহেদ বিন হাফিজ ও টাঙ্গাইলের রানা। অবশ্য পরে শাহেদ বিন হাফিজ ও রানা মতবিরোধের কারণে দল ছাড়েন। ২০০১ সালে শুরা কমিটিতে যুক্ত হন ফারুক হোসেন ওরফে খালেদ সাইফুল্লাহ, আসাদুজ্জামান হাজারী, আতাউর রহমান সানি (শায়খ রহমানের ভাই), আবদুল আউয়াল (জামাতা) ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। তাঁদের মধ্যে ২০০২ সালে নাসরুল্লাহ রাঙামাটিতে বোমা বিস্ফোরণে মারা যান। ২০০৩ সালে আসাদুজ্জামান হাজারী অসুস্থতার কারণে সংগঠন ছেড়ে দেন। অন্যদের মধ্যে এখন সালাহউদ্দিন ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। সালাহউদ্দিনকে ২০১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা করে ছিনিয়ে নেন জেএমবি-সদস্যরা। আর আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ অন্যান্য ছয় নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০০৭ সালের ৩ মার্চ।
জেএমবি’র অন্ধ সহিংসতা
২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার আগেও তিন-চার বছরে দেশের বেশ কয়েকটি সিনেমা হলে বোমা হামলা চালিয়েছিল জেএমবি। তবে সেসব হামলায় তাদের নাম ওভাবে উঠে আসেনি। কিন্তু ২০০৫ সালের আগস্টে সিরিজ বোমা হামলার পর আত্মঘাতী আক্রমণে তৎপর হয়ে ওঠে তারা। ঝালকাঠি, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নেত্রকোনায় পাঁচটি আত্মঘাতী হামলা চালায়। ওগুলোই ছিল দেশের প্রথম আত্মঘাতী হামলা। সাড়ে ৪ বছরে জেএমবি পরিচালিত ২৬টি হামলায় ৭৩ জন মানুষ নিহত। আহত হন প্রায় ৮০০ জন।
অন্ধ বিশ্বাসী এ গোষ্ঠীটির এমন সহিংসতা একদিকে যেমন নিরীহ মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অপরদিকে ইসলামের নাম ভাঙিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালানোর দায়ে তা ধর্মীয় সমাজের ভাবমূর্তিতেও আঘাত হানছিল। এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম জুমার বয়ান, ওয়াজের ময়দান, বক্তব্য বিবৃতি ইত্যাদির মাধ্যমে এই অন্ধ সহিংসতা যে ইসলাম সমর্থিত নয়, তা গুরুত্বের সঙ্গে মানুষের সামনে পেশ করতে থাকেন।
কেন বিরোধিতা করেছেন ওলামায়ে কেরাম?
গ্রেপ্তারের পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন সময় যে জবানবন্দিগুলো দিয়েছিলেন শায়খ আবদুর রহমান, সেখানে তাঁর এই সহিংস তৎপরতা চালানোর পেছনে প্রধানত চারটি কারণ উল্লেখ করেছিলেন। কারণগুলো হলো ১. বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমত কায়েম নেই, ২. ভারতের আগ্রাসী মনোভাব, ৩. বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের তৎপরতা, ৪. সারা দেশে বিভিন্ন পশ্চিমা মিশনারির ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড।
কারণগুলোর সবকয়টিই যুক্তিযুক্ত এবং প্রয়োজনীয়, কিন্তু এগুলোর প্রতিকারের জন্য যে অন্ধ সহিংস পন্থা অবলম্বন করেছিলেন শায়খ আবদুর রহমান এবং তাঁর সংগঠনের সদস্যরা, তা কোনোভাবেই ইসলাম-সমর্থিত নয়। আর এ জন্যই ওলামায়ে কেরাম জেএমবি’র যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। এমনটাই বলছেন দেশের বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।
ড. খালিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠিত নেই, ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা জরুরি, কিন্তু এর জন্য নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া আছে। শান্ত-সমাহিত একটা দেশে বোমাবাজি আর অরাজকতা তৈরি করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা শরিয়ত অনুমোদিত নয়। নিরীহ মানুষের জীবন নাশ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কোনো নজির নেই ইসলামের ইতিহাসে।
ড. খালিদ বলেন, শায়খ আবদুর রহমান ও তাঁর দল অপরিণামদর্শী যে সহিংসতা শুরু করেছিলেন, সেটা ইসলাম প্রতিষ্ঠা তো দূরে থাক, ইসলামকে আরও কলুষিত করেছে সাধারণ মানুষের চোখে। ইসলামের নামে তিনি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। এ জন্যই মূলত ওলামায়ে কেরাম তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছেন এবং মানুষকে এ ধরনের সহিংসতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছেন।
আ ফ ম খালিদ আরও বলেন, ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে জেএমবি যে সহিংসতা ছড়িয়েছিল পুরো দেশ জুড়ে, এর দীর্ঘ মেয়াদী একটা প্রভাব পড়েছে আমাদের মাদরাসাগুলো এবং আলেম শ্রেণির ওপর। জেএমবি’র সহিংস কর্মকাণ্ডের অজুহাতে একটি মহল ঢালাওভাবে মাদরাসা ও মাদরাসা-সংশ্লিষ্টদের ‘জঙ্গি’ ও উগ্রবাদী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে সাধারণ সমাজে। এমনকি জঙ্গি তৈরির অজুহাতে মাদরাসাগুলো বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও তোলা হয়েছিল জোরেশোরে। কিন্তু ওলামায়ে কেরাম বারবার বলে এসেছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে এটা প্রমাণিতও হয়েছে যে, সহিংসতা, বোমাবাজি ও উগ্রপন্থার সঙ্গে এ দেশের মাদরাসা-অঙ্গন এবং শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের কোনো সম্পর্ক ও সম্পৃক্তি নেই।
