
মাওলানা নাসীম আরাফাত :
আশির দশকের আগের কথা। আমি তখন হযরত হাফেজ্জী হুজুরের প্রতিষ্ঠিত নূরিয়া মাদরাসায় পড়ি। মকতব থেকেই সেখানে পড়া শুরু। আমার মামাত ভাই মাওলানা নুরুজ্জামান সেখানে পড়ত। তাই আব্বা ও মামা আমাকে সেখানেই ভর্তি করে দিলেন। ভর্তি পরীক্ষায় আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আরবী হরফ কয়টি? আমি উত্তর দিতে পারিনি। মকতব ও তাইসীরুল মুবতাদী জামাতে দুই বছর পড়লাম। তৃতীয় বছর মীযান জামাতে আমাদের মিযান কিতাবটি পড়ানো হল না। হযরত আবু তাহের মিসবাহ সাহেব হুজুর আমাদের ‘এসো আরবী শিখি’ কিতাবটি পড়ালেন। তখন তা ছাপানো ছিল না। পাণ্ডুলিপি থেকেই আমাদেরকে পড়ালেন। সীগা বলা ও মাসদারের গর্দান টেনে যাওয়া ইত্যকার বিষয়ে দুর্বলতা থাকলেও আরবী কথোপকথনের কারিশমা সবাইকে হতবাক করে দিত। আমি অবশ্য ক্লাসের ভাল ছাত্র ছিলাম না। তবুও পারতাম। তখন থেকেই যুগ ও সমাজের প্রয়োজনে পুরাতনকে ঘষে-মেজে নতুন কিছু সমাজকে দেয়ার চেতনা আমার মস্তিষ্কের কোষে কোষে ঢুকে পড়েছিল।
নূরিয়া মাদরাসায় জাগ্রত মস্তিষ্কের আরো বেশ কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন। তাদের দিক নির্দেশনামূলক কথা আমার মাঝে দারুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই সময় একটি নাম আমাদেরকে অনেক উজ্জীবিত করত। আরো অনুপ্রাণিত করত। নামটি ছিল ‘লাজনাতুত ত্বালাবা’। একটি ছাত্র সংগঠন। ছাত্রদের সর্বযোগ্যতায় বলিষ্ঠ করে তোলার প্রোগ্রাম নিয়ে এ সংগঠন কাজ করছিল। এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের সাথে হযরত আবু তাহের মেসবাহ দামাত বারাকাতুহুমের নামও যুক্ত ছিল। তাই এই সংগঠনের বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতাম। কাজী সাহেব হুজুর, নুর হোছাইন কাসেমী সাহেব হুজুর, আরো অনেক বিদগ্ধ আলেম এ সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। শহীদবাগের প্রোগ্রামে মাঝে মাঝে অংশ নিতাম। রমযানেও প্রোগ্রাম হতো। এসব প্রোগ্রামে যে দু’জন চেতনাদীপ্ত ব্যক্তির কথায় উজ্জীবিত হতাম, রঙ্গিন স্বপ্নের জগতে ছুটে চলার শক্তি পেতাম তারা হলেন আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. ও ইসহাক ফরিদী রহ.। তবে আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.-কেই আমার বেশি পছন্দ হত। নিরহঙ্কার সদা সহাস্য চেহারার এই মানুষটিকে আমি ভুলতাম না। প্রত্যেকটি তরবিয়াতি মজলিসে যেন তিনিই ছিলেন ছাত্রদের প্রাণ পুরুষ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হত। সামাজিক জীবনে উলামায়ে কেরামের করণীয় বিষয়ে আলোচনা হত। সিদ্দীকে আকবর রা. -এর সেই বাণী-أينقص الدين وأنا حي؟- এর চেতনার কথা বারবার বলা হত।
কিন্তু সেই ‘লাজনাতুত ত্বালাবা’ আর নিজের স্বকীয়তা নিয়ে চলতে পারেনি। তাই প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই নানা কারণে তা থেকে দূরে সরে পড়েছেন। আদীব হুজুরও আর লাজনার কোন প্রোগ্রামে আসতেন না। কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. দূরে সরে গেলেন। তবে লাজনার কারণে আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া সাহেব হুজুর যে উদারতা, সদাহাস্যময়তা, ভিন্নমত ও পথের লোককেও বুকে জড়িয়ে নেয়া, কটু কথাকে সয়ে গিয়ে নিজের সঠিক মত প্রতিষ্ঠা করার অনুপম যোগ্যতাসহ আরো অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন তা তাকে মহান থেকে মহানতর করে তুলেছিল।
তাই মাঝে-মধ্যে শহীদবাগের মসজিদে গিয়ে জুমুআর নামায পড়তাম। তাঁর বয়ান খুব ভালো লাগত। তাঁর কী ছিল চেহারা! কী ছিল কন্ঠ! আর কী ছিল সাবলীল বক্তব্য! সমাজের চলমান চিত্র তুলে ধরে ইসলামের বিধান তুলে ধরতেন। জ্ঞানী-গুণীদের মতামত তুলে ধরতেন। শ্রোতারা হা করে তাঁর বক্তব্য শুনত। তাঁকে নিয়ে গর্ব করত।
ছাত্র জীবনে আমি একেবারে শীর্ণকায় ছিলাম। দুর্বল ছিলাম যথেষ্ট। এক রমযানে আমি নূরিয়া মাদরাসায় যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিলাম। তখন ছিল খুব গরম। আকাশ চিরে যেন আগুন ঝরছিল। বায়তুল মুকাররমে যোহরের নামায পড়লাম। দেখা হল আদীব হুজুর ও ইসমাঈল বরিশালী হুজুরের সাথে। তারা বললেন, আমাদের বাসায় চল। পথে নামলাম। খদ্দের মার্কেটের সামনে গিয়ে মনে হয় মশারী কেনার জন্য এক দোকানের সামনে তারা নামলেন। আগুন ঝরছিল আকাশ থেকে। আমি তা সহ্য করতে পারলাম না। আমর চোখের তারায় গোটা দুনিয়া ঘুরতে লাগল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। তারপর আদীব হুজুর আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, না, আর নূরিয়াতে পড়ব না। স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাই নূরিয়া থেকে বিদায় নিয়ে উস্তাযদের সম্মতিতে মালিবাগ ভর্তি হলাম। সম্ভবত তা ছিল ১৯৮৫ ইং. সাল।
মালিবাগের দেয়াল পত্রিকা ছিল এক অনন্য বিষয়। বিশাল বোর্ডে তা সেটে দেয়া হত। চমৎকার হস্তাক্ষরে লেখা হত। শৈল্পিক দৃষ্টিতে তা ছিল অভাবনীয়। সাধারণত হেদায়া, জালালাইন জামাতের ছাত্ররা এর সম্পাদক হত। আর বৃহস্পতিবার রাতে হত বক্তৃতা প্রশিক্ষণের অনুষ্ঠান। সে কী আবেগঝরা বক্তৃতা হত। ছাত্ররা তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে একটুও অলসতা করতনা। তাই মালিবাগ জামিয়া থেকে যেমন লেখক তৈরী হয়েছে, তেমনি বক্তাও তৈরী হয়েছে অনেক। তারাই জামিয়ার সুখ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছে দেশময়। আবুল ফাতাহ সাহেব হুজুর ছিলেন দেয়াল পত্রিকার যিম্মাদার। তার অধীনেই তা প্রকাশিত হত। মালিবাগে ভর্তির কিছুদিন পর দেয়াল পত্রিকার সম্পাদক যাচাইয়ের পরীক্ষা হল। প্রতিভাধর অনেকেই তাতে অংশ নিলেন। আমি নতুন। কিন্তু সাহস আমার অদম্য। কুচ পরওয়া নেহি। আমিও খাতা কলম নিয়ে হাযির হলাম।
আবুল ফাতাহ সাহেব হুজুর এসে বক্তব্য রাখলেন। বললেন মনে কর তুমি এক সফরে গিয়েছে। ট্রেনে সফর হয়েছে। হই-হুল্লোড় করে একদিন কাটিয়ে ফিরে এসেছ। এক কি দুই পৃষ্ঠায় তা লিখে জমা দাও। তখন বানিয়ে একটি ভ্রমণ কাহিনী লিখে জমা দিলাম। হুজুর আমার লেখাটি পছন্দ করলেন। আমাকেই দেয়াল পত্রিকার সম্পাদক বানালেন। জামিয়া মালিবাগে হুজুরের কাছে হেদায়া ছালেছ পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই কিতাবের জটিল থেকে জটিলতম বিষয়গুলো হুজুর আমাদের এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে আমরা তার কাঠিন্য অনুভবও করতাম না। প্রথম দিন হুজুর ক্লাসে এসে বললেন, কিতাবটি তো কাজী সাহেব হুজুর পড়ানোর কথা। তিনিই এর যোগ্য ব্যক্তি। যাক আমার ভাগ্যে যখন এসে গেছে আশা করি খারাপ হবে না, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের সাথে খোলামেলা পরিবেশে হাস্যরসিকতার সাথে থাকতেন। তার চরিত্রে কখনো কৃত্রিমতার কোন লেশ ছিল না। কারো প্রশ্নেই তিনি উপেক্ষা করতেন না। মেশকাত ছানীও তিনিই আমাদের পড়িয়েছেন। বছরের শুরুতে কিতাবুন নিকাহ -এর আলোচনায় এক বিস্ময়কর ভূমিকা বর্ণনা করেছিলেন। পরিবার কী? বিবাহ ও তার অপরিহার্যতার কথা তুলে ধরেন। নারীর সম্মান ও ইজ্জতের ভাবনার কথা বলেছেন। সুখময় সুন্দর সমাজ গড়ার বুনিয়াদী আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে সামাজিক ভুল-ভ্রান্তির প্রাসঙ্গিক আলোচনা করাতেও ভুলে যাননি। আমরা সর্বদা তার ক্লাসের অপেক্ষায় থাকতাম। আমাদের পিয়াসা যেন শেষ হত না। আনন্দের আবেশেই আমাদের সময় কেটে যেত। দারুল উলূম দেওবন্দ কী? কী তার লক্ষ্য? কী তার উদ্দেশ্য? আকাবীরে দারুল উলূমের তাকওয়া-পরহেযগারী ও মুজাহাদার আলোচনা করে আমাদের আপ্লুত করে ফেলতেন। তারপর যখন নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে শিক্ষক হয়ে মালিবাগে এলাম তখন আবুল ফাতাহ সাহেব হুজুর ছিলেন আমার আলোকিত মুরব্বী। জটিল থেকে জটিলতম বিষয়ের সমাধান তিনি সহজেই দিয়ে দিতেন।
একবার এক বিষয়ে একটি প্রতিবাদীপত্র লিখে হুজুরকে দেখালাম। হুজুর তা আগাগোড়া পড়লেন। তারপর বললেন, মাওলানা আমিও তো আপনার সাথে একমত। তবে লিখিত আকারে প্রতিবাদ হওয়ার কারণে এটা একটা দলীল হয়ে যাবে। যা আপনি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারবেন না। আর তা আপনার ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই লিখিত আকারে কিছু না করাই আমার পরামর্শ। এরপর ইশা পর্যন্ত আমাকে হুজুর তাঁর জীবন কাহিনী শুনিয়ে অনেক উপদেশ দিলেন। বাসায় ফেরার পথে সেই পত্রটি ছিঁড়ে ফেললাম। প্রশান্ত হয়ে গেল আমার হৃদয়ের ওজন।
তিনি একজন অসম্ভব রকম গবেষক মানুষ ছিলেন। তাঁর চিন্তাশক্তি খুব প্রখর ছিল। জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষিত সমাজের প্রয়োজনকে তিনি সহজেই অনুধাবন করতে পারতেন। মাদরাসার ছাত্ররা যুগ ও সময়ের প্রয়োজনে অর্থনীতিতে দক্ষ হওয়া দরকার তা অনুধাবন করে ইসলামী অর্থনীতির উপর এক চমৎকার গ্রন্থ লিখলেন। তা বেফাকুল মাদারিসের সিলেবাসভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, অদৃশ্য এক শক্তির সুতার টানে তা বাদ হয়ে গেল। তার ইন্তেকালের পর সে শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এবার তাঁর রচিত ‘দারুল উলুম দেওবন্দ: ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান’ শীর্ষক গ্রন্থটি বাদ দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানের উপর ও ইসলামে যৌনবিধান সম্পর্কেও তাঁর অমর গ্রন্থ রয়েছে।
হুজুর যখন এসব অসাধারণ গ্রন্থগুলো লিখতেন তখন সবার সাথে বিতর্কিত বিষয়গুলো আলোচনা করে নিতেন। তিনি তার উস্তাযদের সাথে, ছাত্র-ভাইদের সাথে, সমবয়সী সমমেধার আলেমদের সাথে এমনকি আমার মত ছাত্রদের সাথেও আলোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। প্রায়ই দেখতাম, আবু সাবের আব্দুল্লাহ সাহেব হুজুর, আহমদ মায়মুন সাহেব হুজুর ও অন্যদের সাথে আলোচনা করছেন। যেসব ক্ষেত্রে আলেম সমাজের কেউ এগিয়ে আসতে সাহস করত না, তিনি সে সব ক্ষেত্রে বীর বিক্রমে কলম তুলে নিতেন। অমর কোন গ্রন্থ রচনা করে ফেলতেন।
তিনি যথেষ্ট অতিথি পরায়ণ ছিলেন। অর্থের লোভ কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। রাজার হালে চলতেন। দু‘হাতে খরচ করতেন। সাহসী ও স্পষ্টভাষী ছিলেন। ন্যায় কথা বলতে পরোয়া করতেন না। হযরত কাজী সাহেব রহ. কে অন্তর থেকে মহব্বত করতেন। কখনো তাঁর ক্ষতির চিন্তা করতেন না, বরং অনেক প্রতিকুল সময়েও কাজী সাহেব হুজুরকে সমর্থন করেছেন। স্বপদে দৃঢ় রেখেছেন।
পিতার ইন্তেকালের পর থেকে ছোট সব ভাইয়ের লেখাপড়ার সার্বিক ইন্তিজাম করেছেন। পারিবারিক জটিল বিষয়গুলোর সমাধান অতি দক্ষতার সাথে সহজে সমাধান করতেন। পিতার অবর্তমানে পিতার ভূমিকা পালন করে তিনি এক উজ্জল আদর্শ দেখিয়েছেন। ফলে তার ইন্তেকালের পর তাঁর ভাইয়েরা হারিয়েছেন এক আদর্শ অভিভাবক। আর আমরা হারিয়েছি এক রূহানী পিতাকে। হারিয়েছি এক চিন্তাশীল দূরদর্শী দরদী রাহবারকে। এক জলদগম্ভীর শক্তিশালী কন্ঠস্বরকে।
মালিবাগ জামিয়ার চত্বরে যখন তার লাশ রাখা হয় তখন গুমরে কাঁদছিল মালিবাগ জামিয়ার গোটা অস্তিত্ব। সবার প্রিয় ব্যক্তিটি আর নেই। চলে গেছেন পরপারে। আমার অন্তরে বইছিল অব্যক্ত বেদনার ঝড়। অদূরে এসে দাঁড়ালাম। মনে হল এক রাজপুত্র ঘুমিয়ে আছেন। কী সুন্দর তার চেহারা। কী সুন্দর অবয়ব। চোখ জোড়া যেন আরো চমৎকার। এক টুকরো বিমল হাসি জুড়ে আছে তার অধর কোলে। মোমেনশাহী ফুলপুর তারাকান্দার গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন করা হবে। অনেকেই গেল লাশের সাথে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমি যেতে পারলাম না।
মুহাম্মদের অসুস্থতার কারণে আমি পশ্চাতে রয়ে গেলাম। ঈদুল আযহার পর মোমেনশাহী গেলাম। তাঁর ভাতিজা মাওলানা রশিদ আহমদ আমাদের পেয়ে যারপর নাই খুশি হল। আমাদের সাথে ছিল ইবরাহীম, মাহফুজসহ আরো কয়েকজন। দিনমনি তখন যাই যাই করছিল। আবহাওয়া ছিল শীতল সিগ্ধ। আমি যখন হুজুরের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম তখন আমার মনে হচ্ছিল, অভিমানে ভরা হুজুরের কন্ঠ যেন ইথারের কোলে কোলে ভেসে আসছে। তিনি বলছেন, আরাফাত, এতদিন পর তুমি আমাকে দেখতে এলে! এত অল্প সময়েই আমার কথা ভুলে গেলে?
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা
সাহিত্যিক ও বহুগ্রন্থ প্রণেতা
