পরিবারের চোখে মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল

মুনশী নাঈম :

পরিবার হচ্ছে একটা মানুষের শেকড়। মানুষটি যত ব্যস্তই থাক, ব্যস্ততা কমলে ঠিক ফিরে আসতে হয় পরিবারে। যত বড়ই হোক মানুষ, যত দূর-আকাশেই ওড়ুক, শান্তির মেঘের খুঁজে তাকে নেমে আসতে হয় পরিবারে। যেখানে তার অপেক্ষায় থাকে বাবা-মা, স্ত্রী-পুত্র এবং আত্মার আত্মীয়জন। রাজনীতি, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতায় চরম ব্যস্ত একজন মানুষ ছিলেন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল সাহেব রহমতুল্লাহ আলায়হি। কিন্তু তবুও পরিবারকে বুকে আগলে রেখেছেন সবসময়। রাজনীতির ব্যস্ততায় ভুলে যাননি পরিবারের দায়িত্ব। শিক্ষকতার ব্যস্ততায় ভুলে যাননি আপন ছেলে-সন্তানের পড়ালেখার খোঁজখবর। সাংবাদিকতার ব্যস্ততায় হয়ে পড়েননি উদাসীন।

পরিবারের মায়াময় বন্ধনে সবসময় জড়িয়ে থাকা এই মানুষটির স্মৃতিচারণ শুনতে চেয়েছিলাম পরিবারের কাছে। তাঁর স্ত্রী, বড়ছেলে আতাউল মুনঈম লাবীব, ছোটছেলে রিয়াজুল মুনঈম নাবীল স্মৃতিচারণ করেছেন।

স্ত্রী মুহসিনা খাতুনের স্মৃতিচারণ

তিনি পরিবারে যথেষ্ট পরিমাণ সময় দিতেন। রান্নাবাড়া থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া, ঘর গোছানো ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সবসময় আমাকে সাহায্য করতেন। পরিবারের সকলকে একসাথে নিয়ে খাওয়া পছন্দ করতেন; একা একা কখনোই খেতে চাইতেন না। হয়তো দস্তরখানায় ভর্তার আয়োজন হয়েছে, খেতে বসে তিনি নিজ হাতে সেই ভর্তা বানাতেন এবং সকলের প্লেটে তুলে দিতেন। বাইরে কোনো জরুরী কাজে গেলে পর মুহূর্তে যদি তিনি জানতে পারতেন বাসায় যাওয়া তাঁর প্রয়োজন, তৎক্ষণাৎ তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রেখেও চলে আসার চেষ্টা করতেন।

ছেলেমেয়েদের লালন-পালন নিয়ে তিনি কী পরিমাণ চিন্তা করতেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ছেলেমেয়েদের শিশুকালে তিনি তাদেরকে কোলে নিয়ে রাত কাটিয়ে দিতেন আমার কষ্ট হবে বলে। তিনি না ঘুমিয়ে আমাকে ঘুমাতে দিতেন। ছেলেমেয়েদেরকে নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, গোসল করিয়ে দিতেন, কাপড় ধুয়ে দিতেন, বিশেষ করে ছোটমেয়ে তাহিয়াকে সবসময় নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন। তাহিয়া তাঁর একেবারে ছোটমেয়ে বলে তিনি তাঁকে অনেক বেশি আদর করতেন। অনেক রাত করে ঘরে ফিরে যখন দেখতেন তাহিয়া ঘুমিয়ে আছে, তাকে ডেকে তুলে নিজের সাথে বসিয়ে খানা খাওয়াতেন কিংবা তাহিয়ার জন্য যদি কিছু নিয়ে আসতেন, তাহলে তা দিতেন। সিজনাল ফল তিনি ছেলেমেয়েদের জন্য আগে আগেই নিয়ে আসতেন। ছেলেমেয়ে তাঁর কাছে কিছু আবদার করলে তিনি নিজে না খেয়ে-পরে হলেও তা পূরণ করার চেষ্টা করতেন। একজন বাবা হিসেবে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।

তিনি নিজের আমলের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। পাশাপাশি আমাকে এবং সন্তানদেরকেও সবসময় আমলের প্রতি তাগিদ দিতেন। তিনি নিজেও তাহাজ্জুদ পড়তেন, আমাকে এবং সন্তানদেরকেও তাহাজ্জুদ পড়ার প্রতি উৎসাহিত করতেন। মাঝে মাঝে কোনো মাহফিল থেকে অনেক রাত করে ঘরে ফিরে এসে আমাকে বলতেন, তোমার জন্য এবং তোমার সন্তানদের জন্য মন ভরে দোয়া করে এসেছি।

তিনি সবসময়ই আমাকে সঙ্গে নিয়ে সফরে যেতে খুব পছন্দ করতেন। আমি সাথে গেলে তিনি অনেক আনন্দিত হতেন। তাঁর সাথে আমার শেষ সফরটা ছিল তিনি মারা যাওয়ার এক-দেড় মাস আগে, ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে। ট্রেনে গিয়েছিলাম, তিনি আনন্দে পুরো একটা কেবিন ভাড়া করেছিলেন। গিয়েছিলাম তাঁর মামার বাড়ি। অনেক খুশি হয়েছিলেন আমি সঙ্গে গিয়েছিলাম বলে।

মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগ থেকে এত দায়িত্বশীল, এত হাসিখুশি মানুষটি কেমন যেন নীরব হয়ে গিয়েছিলেন। সবসময় তাঁর চোখে-মুখে থাকত বিষণ্নতার ছাপ। মাঝেমধ্যে যদি জিজ্ঞেস করতাম কোনো পেরেশানি আছে কিনা কিংবা কোনো টেনশন করছেন কিনা, তাহলে তিনি মুচকি হাসি দিয়ে বলতেন, নাহ, আমি তো ভালোই আছি। কোনো টেনশন নেই। সবসময় তিনি ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস নিজ দায়িত্বে নিয়ে আসতেন, কখনোই বলতে হতো না। কিন্তু মারা যাওয়ার কয়েক মাস আগ থেকে তিনি বলে দেওয়া জিনিসটা আনার কথাও ভুলে যেতেন। আমার সাথে এবং সন্তানদের সাথে শেষের দিকে খুবই কম কথা বলতেন। মাঝেমধ্যে এক-দুইটা কথার মাঝে এ-ও বলতেন, আমি হয়তো মারা যাব কিংবা আর বেশিদিন বাঁচব না। এই কথা শোনার পর মনখারাপ করতাম বা নিজেকে নিজে অনেক অসহায় মনে করতাম। তখন তিনি মুচকি হাসি দিয়ে বলতেন, আমি মারা গেলে তোমরা অনেক ভালোই থাকবে ইনশাল্লাহ, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালো রাখবেন।

আতাউল মুনঈম লাবীবের স্মৃতিচারণ

আমাদের খুব আদর করতেন বাবা। এতটাই আদর করতেন, পড়ালেখা নিয়ে কখনো কঠোর কথা বলতেন না আমাদের। মনে পড়ে না পড়ালেখার জন্য তিনি কখনো হাত তুলেছেন আমাদের উপর। শুধু পড়ালেখা কেন, কোনো কারণেই হাত তুলতেন না।

আমি যখন হেফজখানায় পড়ি, প্রথম দু’বছর রাতে বাসায় থাকতাম। সকালবেলা বাবা সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন, এবং রাতে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন।

বাবার সঙ্গে খুব বেশি বাইরে সফরে যাওয়া হয়নি আমার৷ আমার ছোটভাই নাবিল বাবার সঙ্গে সফরে যেত খুব। তাঁর সঙ্গে যতটুকু সময় কাটিয়েছি, এই ঘরেই। তবে তিনি সবসময় বলতেন, ভাল করে পড়ালেখা করো। লেখালেখির চর্চা করো।

মারা যাবার দু’দিন আগে কল্যাণপুর যে মাদরাসায় পড়ি আমি, সেখানে গিয়েছিলেন। কল্যাণপুর মাদরাসার প্রায় শিক্ষক বাবার সহপাঠী বন্ধু। এবং প্রায় শিক্ষকই অনাবাসিক থাকেন। মাওলানা ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী বাবার একবছর জুনিয়র হলেও বাবার সঙ্গে আচরণ বন্ধুর মতো। বাবাকে প্রায় তিনি বলছিলেন, কতদিন তুমি মাদরাসায় আসো না। একবার এসে দেখে যাও।

সেদিন বৃহস্পতিবার। ফজরের পর একটু ঘুমিয়েছিলাম। কে যেন ডেকে বলল আমার গার্ডিয়ান আসছে।  গিয়ে দেখি আব্বা মেহমানখানায় চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছেন। আমি অনেকক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে আলতো করে ডাকলাম—বাবা! বাবা! হঠাৎ বাবা ঝিমুনি ভেঙে সোজা হয়ে বসলেন। আমি বললাম, এখনো তো শিক্ষকগণ মাদরাসায় আসেনি। এত সকালেই এসে পড়েছেন? দারোয়ানকে বললাম চা দিতে। দারোয়ান রং চা দিলো। তারপর আমি ক্লাসে চলে আসি। এই ছিল আমার মাদরাসায় বাবার শেষ যাওয়া।

রেজাউল মুনঈম নাবীলের স্মৃতিচারণ

আব্বু যখন নুরিয়া মাদরাসায় পড়েন, তাঁর জীবন চলার পাথেয় হিসেবে মুরব্বি ছিলেন হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর অন্যতম খলিফা, তখনকার নুরিয়ার মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল হক দা.বা.। দাদা আব্বুর হাতে কোনো টাকা দিতেন না। টাকা দিয়ে যেতেন আব্বুর মুরব্বি আবদুল হক সাহেবের কাছে। প্রতিদিন যতটুকু প্রয়োজন হতো, হুজুরের কাছ থেকে নিয়ে লিখে রাখতেন। কিন্তু একবার দাদা আব্বুর হাতেও ৫০ নাকি ৬০ টাকা দিয়ে এসেছিলেন ৷ ওই টাকা দিয়ে আব্বু পাঁচ-ছয়দিন চললেন। ষষ্ঠ দিন যখন হুজুরের কাছে টাকা চাইতে গেলেন, হুজুর জিজ্ঞেস করলেন, এতদিন টাকা চাওনি কেন? আব্বু দাদার টাকা দিয়ে যাওয়ার কথা বললেন। হুজুর বললেন, আমাকে জানানোর প্রয়োজন ছিল কিনা? কেন জানাওনি? আব্বু বললেন ভুল হয়ে গেছে। হুজুর বললেন, ভুল হয়েছে না ভুল করেছ? আব্বু বললেন ভুল করেছি। হুজুর বললেন, আজ থেকে এক সপ্তাহ আমার কাছে টাকা চাইবে না ৷ এটা শাস্তি।

সত্যিই আব্বু এক সপ্তাহ কারো কাছে টাকা ধারও চাননি। আব্বু বলেছেন, ধার নিলেও হুজুর জানতেন ৷ তাই ধার নিইনি। কষ্ট করে এক সপ্তাহ টাকা ছাড়া কাটিয়েছি।

কেরাণীগঞ্জে রাজাবাড়ি মাদরাসায় পড়ার সময় আব্বু আমার হাতে টাকা দিতেন না, হুজুরের কাছে দিয়ে আসতেন ৷ এমন দু’বছর চলেছে। আমি হুজুর থেকে টাকা নিতাম, খাতায় লিখে রাখতাম।

আমাদের বলতেন, পড়ালেখার সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখি করো। বক্তৃতা শেখো। বক্তৃতা করলে মুখের জড়তা কেটে যাবে।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমির পর রাজাবাড়ি মাদরাসার মুরব্বি বানানো হয়েছিল আব্বুকে। শ্রম, সময়, কৌশল দিয়ে এতটাই উন্নত করে তুলেছিলেন মাদরাসাকে, মাদরাসার কর্তৃপক্ষ এখনো বাবাকে স্মরণ করে। মৃত্যু পর্যন্ত মুরব্বির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তিনি মাদরাসায় গিয়ে ক্লাসে ক্লাসে যেতেন পড়ালেখার খবর নেয়ার জন্য। কেউ কিছু না বুঝলে বুঝিয়েও দিতেন।

ওই মাদরাসায় আব্বু দাওরা খুলেছেন। কিন্তু প্রথম বছরও শেষ করতে পারলেন না। বছরের মাঝখানেই চলে গেলেন ওপারে। কদিন আগে রাজাবাড়ি মাদরাসায় গিয়েছিলাম। শিক্ষকরা সবাই বলছিলেন, তোমার বাবা যতটুকু করে গেছেন এই মাদরাসার জন্য, তা আর কেউ পারবে কিনা জানি না।

মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন আব্বু রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। আমিনী সাহেব হুজুরের সঙ্গেই সব জায়গায় যেতেন। তিনি মারা যাবার পর আব্বু টুকটাক ওয়াজ মাহফিল করতেন। আমি আব্বুর সঙ্গে অনেক জায়গায় যেতাম। জীবনের শেষদিকে যতগুলো মাহফিলে দোয়া করতেন, খুব লম্বা এবং দীর্ঘ মুনাজাত করতেন। খুব কান্না করতেন।

আগের সংবাদসিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি শিহাব, সাধারণ সম্পাদক সিরাজ
পরবর্তি সংবাদমাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল : বর্ণাঢ্য জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত