(জুনাইরা কোমল ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন। বর্তমানে তিনি সাইকিয়াট্রি, কোরানের চিকিৎসাবিদ্যা ও কাশ্মীর নিয়ে কাজ করছেন। কাশ্মীর নিয়ে তাঁর দুর্দান্ত এই লেখাটির অনুবাদ করেছেন তুহিন খান।)
‘বলা হয়—কাশ্মীর দুনিয়ার জান্নাত : কোন কাফের কখনও জান্নাত পায় নাই, আর পাবেও না কোনদিন
অবিশ্বাসীর দল, পিছু হটো, কাশ্মীর আমাদের, পুরা কাশ্মীরই আমাদের; আমি বলি—কাশ্মীরের আজাদি তক যুদ্ধ চলবে শুধু, যুদ্ধ!’
—আয়েশা সিতারা
পাকিস্তান সেনা হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি ওয়ার্ডে এডমিট রোগী আয়েশা সেতারা, আমার সাথে প্রথম আলাপেই এই পংক্তিগুলি আউড়ে যাচ্ছিলেন। আয়েশার ভাষায়, তিনি ‘মুজাহিদ পরিবারে’র সন্তান—এমন এক পরিবার যারা ইসলামের জন্য নৈতিক ও প্রত্যক্ষ আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে জড়িত। মৃত্যুর আগে তার দুই ভাই বিভিন্ন পর্যায়ে ‘কাশ্মীরকে স্বাধীন করার জিহাদ-এ অংশ নিয়েছেন। তার ভাইদের বিশেষ কাজ ছিল এই আন্দোলনের পক্ষে লেখালেখি করা। বড়বোন হওয়ায় আয়েশা তাদের বিভিন্ন আর্টিকেল ও প্যামফ্লেট লিখতে সহায়তা করতেন, আর দুই ভাইয়ের মৃত্যুর পর শেষমেশ নিজেই হয়ে গেলেন ফুল টাইম লেখক। আয়েশা প্রায়ই কবিতা আবৃত্তি করেন (তার নিজের, ইকবালের এবং অন্যান্য কাশ্মীরি কবির), কাশ্মীরের আজাদির গান ধরেন, সেসব গানে থাকে ইসলামের পথে অনিঃশেষ লড়াইয়ের কথা, কাশ্মীরে ইসলামের বিধিবিধান মোতাবেক চলা সহজ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা।
আয়েশার কবিতাগুলি পড়লে নিজের অসুস্থতা ও কাশ্মীরের যন্ত্রণার ব্যাপারে তার বোঝাবুঝিগুলো ধরতে পারা যায়। আয়েশার অসুস্থতা নিয়ে আলাপ করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য না, বরং তার কবিতা কাশ্মীর-সংঘাতের ব্যাপারে কী বার্তা দেয়, বিশেষভাবে সম্প্রতি আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫ এর A বাতিল করার পরে, তাই হবে আমাদের আলাপের বিষয়।
সম্প্রতি আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫-এর A বাতিল করাকে অনেকেই কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ও ভারতের সাথে এর সংযুক্তিতে ভাঙন বলে উল্লেখ করেছেন, যা আসলে ভুল। কাশ্মীরিরা—অ্যাক্টিভিস্ট, মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক—বহুদিন ধরেই বলে আসছেন যে, দখলাদারদের অধীনে একটা ‘আলাদা রাষ্ট্র’র কল্পনা মূলত একটা মর্মান্তিক ধূর্ত মিথ্যাচার। কাশ্মীরিদের এই দীর্ঘকালীন সংগ্রাম সাময়িক আর্টিকেলের ধারাগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য না। তাহলে যুদ্ধটা কিসের? এই আর্টিকেল বাতিল মূলত কিসের ইঙ্গিত তাহলে? এক্ষেত্রে, এই আন্দোলন এবং ভারতের মর্ষকামী উন্মাদনার সাথে ইসলামের সম্পর্ক কী, সেটা আগে ঠিকঠাক বুঝতে হবে। কাশ্মীরের ব্যাপারে ডানপন্থী এবং লিবারাল সেক্যুলারদের ডিসকোর্সে ইসলাম প্রায় অনুচ্চারিত থাকলেও, বর্তমানে এই প্রসঙ্গটি ক্রমেই শক্তভাবে উঠে আসছে।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৯৪৭-এ পাকিস্তান-ভারত ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসন সমাপ্তির কালে, কাশ্মীর ভাগ হয়, এবং দখলদারদের হাতে চলে যায়। বৃটিশ আমলে কাশ্মীর ছিল আধা-স্বায়ত্তশাসিত সেইসব প্রিন্সলি স্টেটের অন্যতম, পার্টিশানের সময় যাদের ভারত বা পাকিস্তান—যেকোন এক্টির সাথে যুক্ত হওয়ার স্বাধীনতা ছিল। কাশ্মীরের হিন্দু রাজা ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেন (ঘোষণাপত্রের প্রামাণ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং সেসময় কাশ্মীরের মেজরিটি মোসলমানের প্রতিবাদের ব্যাপারে এখানে আলোচনা করা গেল না)। সেই বছরই কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ হয়, এরপরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দ্বিপাক্ষিক শান্তি-আলোচনা হয় (কাশ্মীরিদেরকে এই দ্বন্দ্বের একটা প্রধান পক্ষ না ধরেই), যার ফলশ্রুতিতে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয় এবং একটা ‘যুদ্ধবিরতি রেখা’ দিয়া কাশ্মীরকে আলাদা করা হয়। সেসময় একটা গণভোটের আশ্বাসও দেয়া হয়, যার মাধ্যমে কাশ্মীরিরা স্বাধীন হবে, না ভারত বা পাকিস্তানের অংশ হবে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কাশ্মীরিদের হাতেই ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। গণভোটটা আর হয় নাই। কাশ্মীর নিয়ে বেশ কয়েকটা যুদ্ধও হয় (১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯), ক্রমেই কাশ্মীর ভারত-পাকিস্তানের জাতিয়তাবাদী আত্মশ্লাঘার বিষয় হয়ে ওঠে, ‘যুদ্ধবিরতি রেখা’র নাম হয় ‘লাইন অব কন্ট্রোল’, এটি দুই দেশের অটোমেটিক বর্ডারে পরিণত হয়।
১৯৮৯ সালে প্রথম ভারতের বিপক্ষে কাশ্মীরে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়। সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশ, ২০১০-এ কাশ্মীরে ভারতবিরোধী আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষত রাস্তাঘাটে যুবকদের পাথর ছোঁড়ার দৃশ্য (যা ইজরাইলি দখলতারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়) ‘কাশ্মীরি ইন্তেফাদা’র সূচনার ইঙ্গিত দেয়।
খুব আঁটোসাঁটো হিশেবেও, ১৯৮৯ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার কাশ্মীরি ইন্ডিয়ান মিলিটারি অভিযানে শহীদ হয়েছেন, প্রায় ৮০০ লোক গুম হয়ে গেছেন। প্রায় ৩০০০ গণকবর, যেগুলোর কথা ভারত সরকার বরাবরই চেপে গেছে, ২০০৯-এ সেগুলোর নিশ্চিত খোঁজ পাওয়া গেছে। এই দখলদারিত্ব উপত্যকায় প্রায় ৩২ হাজার নারীকে বিধকা বানিয়েছে, এতিম করেছে প্রায় ৯৭ হাজার শিশুকে। রয়েসয়ে হিশেব করলেও, প্রায় ১৫০০ নারী ‘আধা বিধবা’ অবস্থায় আছেন (যাদের জামাই নিখোঁজ, মৃত না জীবিত নিশ্চিত করা যায় নাই)। এই নারীরা নিত্যনতুন অর্থনৈতিক কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছেন, কারণ তারা পেনশন ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা পাচ্ছেন না। গত বিশ বছরে, প্রায় ১৭ হাজার মানুশ সেখানে আত্মহত্যা করেছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী। বর্তমানে ভারতীয় সেনাদের অধীনে, কাশ্মীর পৃথিবীর সর্বোচ্চ মিলিটারাইজড এলাকা (আফগান বা ইরাকের চেও বেশি)। মিলিটারি ক্যাম্প আর বাংকার বানাতে গিয়ে ফসলি জমি ও ফলের বাগানের বিরাট একটা অংশ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। ভারতীয় সেনাদের রাষ্ট্রীয় মদদে করা অত্যাচার আর ধর্ষণের কাহিনীই অসংখ্য, অঘোষিত এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা মানসিক ক্ষতির কথা নাইবা বললাম। তার উপর, ১৯৯০ সালে কার্যকর হওয়া ‘আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ (আফসাপা)-এ কাশ্মীরকে একটা ‘ডিস্টার্বড এরিয়া’ বলা হয়েছে এবং কোন রকম ওয়ারেন্ট ছাড়াই, মিলিটারি বাহিনীর যেকোন সদস্যকে কোন ধরণের সহিংস অ্যাকশনে যাওয়া, ঘরে ঘরে ঢুকে তল্লাশি, সন্দেহবশত গ্রেফতার, ইচ্ছামত শক্তির প্রয়োগের সম্পূর্ণ দায়মুক্ত অধিকার দেওয়া হয়েছে। আরো কঠিন আইন সেখানে আছে, যেমন: পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট, যার আওতায় আযাদি আন্দোলনের ‘সম্ভাব্য’ সংগঠকদের কোনরকম বিচার ছাড়াই, ‘আত্মরক্ষামূলকভাবে’ জেলে ভরে রাখার অধিকার সরকারের আছে।
ইসলামের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ : ‘মুখোশ উন্মোচন’ নয়, অন্যকিছু
সম্প্রতি কাশ্মীর বিষয়ক ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫-এর A বাতিল করার উদ্যোগ মূলত কাশ্মীরে ইসলামি চেতনা ও শক্তিকে দুর্বল করে ফেলার উদ্যোগেরই একটা অংশ। টিভিতে সম্প্রচারিত এক ভাষণে মোদি বলেছেন যে, ওই এলাকায় ‘সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’কে উস্কে দিতেই স্বায়ত্তশাসনের মুখোশ পরানো হয়েছে।
এই উদ্যোগ ভারতের অনেকগুলি ইসলামবিদ্বেষী পলিসিরই ধারাবাহিকতামাত্র। গণভোট না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকার শর্তে পাওয়া এই স্বায়ত্তশাসন বাতিল করা কাশ্মীরিদের এই আশঙ্কাকেই আরো জোরদার করেছে যে, এই অঞ্চলে মুসলিম মেজরিটিভিত্তিক ডেমোগ্রাফি পালটে ফেলা হবে। এই আশঙ্কা নিশ্চিতভাবেই সত্য প্রমাণিত হয়, যখন দেখা যায় যে, ভারতের মানুশ কাশ্মীরি মেয়ে বিয়ে করে কাশ্মীরে জায়গা-জমি কেনার ব্যাপারটিকে সেলিব্রেট করছে৷ এই হুমকি শুধু ডেমোগ্রাফি চেঞ্জের হুমকি না, কাশ্মীরের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি-কালচারের পক্ষেও হুমকি।
মুজাহিদ পরিবারগুলির ব্যাপারে কাবেরি রবিনসনের এথনোগ্রাফিতে দেখা যায় যে, মুজাহিদদের জিহাদ মূলত স্বাধীনতার লড়াই, পরিবার ও দেশের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার লড়াই। কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার জন্য ‘জেহাদ’ বিশ্বব্যাপী প্রচারিত ‘ওয়র অন টেরর’র নীচে চাপা পড়ে গেছে।
এই বছর জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা দিয়েছেন, কাশীরি মুজাহিদদের মৃত্যু-পরবর্তী সৎকারের ক্ষেত্রে নতুন কোন পদ্ধতি বের করবে সরকার। ইসলামে মৃতের সৎকার পদ্ধতির নাম ‘জানাযা’। মুজাহিদদের প্রত্যেকটা জানাযায় হাজার হাজার লোক সমাগম হয় এবং এরা সম্মিলিত মর্সিয়ার মাধ্যমে শহীদের শাহাদাত ও কীর্তি উদযাপন করে, এই মর্সিয়া শুধু শোকই নয়, বরং আন্দোলন ও প্রতিরোধ ধরে রাখার প্রত্যয়ও বটে। এজন্যেই মুজাহিদদের এই বিপুল জনসমর্থনের প্রত্যক্ষ প্রকাশ বন্ধ করার লক্ষ্যে বিজেপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছে যে, পুরো সৎকারের ব্যাপারটা হবে ‘অন ক্যামেরা’, এবং পাবলিক এঙ্গেজমেন্টও কন্ট্রোল করা হবে। ‘আইডিয়াটা এমন, মৃতদেহ প্রথমে তার ফ্যামিলির কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতেই দাফনের কাজ সম্পন্ন হবে। ১৪৪ ধারা জারি থাকবে, বাইরের কেউ এখানে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে না। এছাড়া এই পুরো প্রক্রিয়াটাই ভিডিও করা হবে’, নিরাপত্তা সংস্থার একটা সূত্র ‘দ্য প্রিন্ট’কে একথা জানায়। এই পদ্ধতি নিরাপত্তা সংস্থাগুলির আগের চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। তাদের আগের চিন্তা ছিল, মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে না। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত কাশ্মীরের জাতীয় ও ধর্মীয় স্মৃতি সংরক্ষণের যে মানবিক অধিকার, তাকেও ভারত সরকার নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসতে চাচ্ছে। ভারতের সেক্যুলার সরকার মূলত ইসলামকে সীমিত নিজস্ব পরিসরে বেঁধে রেখে, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরের ইসলামকে সবসময়ই থ্রেট হিশেবে দেখে এসেছে। নাইন ইলেভেনের পর থেকে, পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য সন্ত্রাস দমনের জন্য আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ বা হামলা পশ্চিমা দেশগুলোতে এবং ইজরাইলের প্রধান স্ট্রাটেজি হিশেবে গৃহীত হয়েছে৷ ভারত ঠিক এই অজুহাতটিই কাশ্মীরের মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যাবতীয় নির্যাতন জায়েজ করে নিতে চাচ্ছে।
ভারত, ইজরাইল ও আমেরিকার মধ্যে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, অস্ত্র সহায়তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা খুবই প্রকাশ্য ও প্রামান্য একটা ব্যাপার। ভারত বর্তমানে ইজরাইলের সবচে বড় অস্ত্র ব্যবসার মার্কেট, ওদিকে ইজরাইল আমেরিকার কাছ থেকে সবচে বেশি সামরিক সহযোগিতা পায়। ভারতও আমেরিকার কাছ থেকে অনেক বড় ধরণের সামরিক সহযোগিতা পায়, সম্প্রতিও তারা এক সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে যাকে ‘মাদার অব অল ডিফেন্স ডিলস’ বলা হচ্ছে। ইজরাইল-ভারত নেগেভে মরুভূমিতে যৌথ অস্ত্র মহড়ায় অংশ নিয়েছে, বলা হয়েছে, গাজা থেকে ইজরাইলের যে সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, ভারত তার ফায়দা নিতে চায়। সম্প্রতি কাশ্মীরিদের পাথর ছুঁড়ে প্রতিবাদের জবাবে ভারত যে জানে না মেরে পঙ্গু করে দেওয়ার ইজরাইলি নীতি অবলম্বন করেছে, এর ফলে বিশ্বের প্রথম ‘গণ-অন্ধত্ব’ তৈরি হয়েছে। ডিসকোর্স্টা এমন, ইজরাইল যেমন মিডল ইস্টের মত ‘টেররিস্ট’ রেজিওনে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা একমাত্র দেশ, ভারতও তেমনি সাউথ এশিয়ার মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে কথিত গণতন্ত্রের একমাত্র রক্ষাকর্তা।
সামরিক ও বাণিজ্যিক মৈত্রী এই দেশগুলোর মধ্যে এক ধরণনের কমন কালচারাল গ্রাউন্ড তৈরি করেছে, যার পরিণামে এরা সবাই মিলে একটা ‘এন্টি ইসলামিক’ ডিফেন্স সিস্টেম তৈরি করতে চাচ্ছে। এইসব দখলদার জাতিবাদী রাষ্ট্রগুলোর গভীর সম্পর্ক তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একটা কমন এনিমির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ‘হাউ দ্য ওয়েস্ট ক্যান উইন’ বইতে নেতানিয়াহু ইসলামকেই বলেছেন সেই ‘কমন এনিমি’। ফলে, জায়োনিজম আর হিন্দুত্ববাদের একটা গভীর সম্পর্ক আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। দেখা যাচ্ছে, ইজরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনে মানুশ খুনের পর ‘শান্তি’র খোঁজে হিমালয়ে আসছেন।
অনেকেই, ইন্ডিয়ার অনেক ক্রিটিক, অ্যানালিস্ট কাশ্মীরে ইন্ডিয়ার অবস্থানকে ‘অগণতান্ত্রিক’, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশেবে ভারতের ব্যর্থতা’ ইত্যাদি বলছেন। কিন্তু সত্যি বলতে, কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন তুলে দেওয়ার ব্যাপারটা ভারতের দীর্ঘকালীন রাষ্ট্রীয় পলিসিরই বাই প্রোডাক্ট। আন্তর্জাতিক ‘নিরপেক্ষ’ আদালতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে কোনই লাভ হচ্ছে না। আমেরিকা বরাবর কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাওয়ার’ বলে আসছে, অথচ কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে তারা যে সম্যক অবগত, উইকিলিকসের ফাঁস করা কিছু নথি দিয়েই তা বোঝা যায়।
কাশ্মীরে ভারতের দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় নীতির সারকথা হল, রাষ্ট্রের এক প্রান্তে ইসলামকে একটা ভয়াবহ শক্তি হিশাবে দেখানো এবং এর সীমায় থেকে যারা মুক্তি চায় তাদের ডেমোনাইজ করা। তালাল আসাদ তার লেখায় দেখাচ্ছেন, লোকে ভাবে মানবাধিকার ‘মানুশ’র জন্য, কিন্তু আসলে তা সত্য না, মডার্ন স্টেটে মানবাধিকার ‘সিটিজেন’ বা ‘নাগরিক’র জন্য। আগ বাড়িয়ে আসাদ আরো দেখাচ্ছেন, কীভাবে নাজিদের নৃশংসতার কারণে ‘মানবতাবিরোধী অওরাধ’কে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃতি দেওয়া হল। যেভাবেই দেখি না কেন, আসাদ বলছেন যে, মানবাধিকার চার্টার ‘অপরাধ প্রতিরোধের চাইতে অপরাধীকে চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার জন্য বেশি উপযোগী।’
আসাদের এই আলাপ থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের দ্বারা যা স্বীকৃত না, সেটার ব্যাপারে জানা আসলে অসম্ভব, আর যা জানা অসম্ভব তার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব না। ফলে, ইসলাম, যাকে প্রাইভেট লাইফে আবদ্ধ করা ছাড়া সেক্যুলার রাষ্ট্র সহ্য করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের আইনি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে ইসলামের ভেতর দিয়ে যন্ত্রণা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তাকে বোঝা যাবে না। এছাড়া ইসলামের যে নৈতিক স্বাতন্ত্রের বোধ, যা ভারত রাষ্ট্রের চিরকালের বৈরী, আইনের মাধ্যমে একে ভয়ানক ছাড়া আর অন্য কোনভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। এজন্যেই কাশ্মীরিদের জঙ্গি, সম্ভাব্য জঙ্গি বা জঙ্গিদের রক্ষাকর্তা বলা হয়। যেটাকে আমরা গণতন্ত্রের মুখোশ খুলে যাওয়া বলছি, সেটা আসলে এই সেক্যুলার গণতন্ত্রেরই বাইপ্রোডাক্ট ব্যাপার।
আয়েশার ইসলামি কবিতা
কাশ্মীরের বর্তমান আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই সংকট নতুন কিছু না। উগ্র ডানপন্থী বা সেক্যুলার লিবারাল—যেকোন শাসনই কাশ্মীর ও ইসলামকে সেক্যুলারিজম ও এনলাইটেনমেন্টের পথে হয়ত ‘থ্রেট’ অথবা ‘বাধা’ হিশাবে দেখেছে। এই ধরণের আইন বা বিচারব্যবস্থা আয়েশার কবিতাগুলিকে স্বাভাবিক যন্ত্রণার প্রকাশ ও অধিকার আদায়ের লড়াই হিশাবে কবুল করতে পারে না, তাদের এগুলোকে অস্বাভাবিক মনে হয়। কীভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্র তার এই পংক্তিগুলোর মোকাবেলা করবে—
‘যে ভারি পাথুরে বাধা আমাদের পথ রোধ করেছে
তা দূর করার আগে আমরা থামব না।
হে বিশ্বাসের পথে আগুয়ান লোকসকল, গন্তব্য না পৌঁছা পর্যন্ত আমরা থামব না… সারা দুনিয়ায় ইসলাম কায়েম হলে তবেই আমরা থামব,
প্রতিটি হৃদয়ে জ্বলবে প্রেমের মশাল।’
কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ঘটনায় অনেকেই আর্টিকেল ৩৭০ উচ্ছেদের সাংবিধানিক বৈধতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্রের ব্যর্থতা এসব ব্যাপারে ফোকাস করছেন। এসব করা হচ্ছে যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কাশ্মীরিদের প্রতি সুনজর দেয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কী এবং তারা কীভাবে কাজ করছে, তা পষ্ট৷ কাশ্মীরের আন্দোলন থেকে ইসলামকে বাদ দেওয়া হলে একটা দখলদারিত্বকে স্রেফ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’-এ নামিয়ে আনা যায়। কাশ্মীর থেকে আমরা শিখি, কীভাবে যেকোনো আন্দোলন থেকে ইসলামকে কেবল ‘ওয়র অন টেরর’র যুক্তি দিয়েই মুছে ফেলা হয়। কিন্তু ভারত সরকার সে ব্যাপারে ষোল আনাই সতর্ক, তাই তারা কাশ্মীরের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যভাবে দেখলে, কাশ্মীরে ভারতের এন্টি ইসলামিক এজেন্ডা আসলে কী? অথবা, একটা এলাকার লোকজনের মুসলমান হওয়ায় সমস্যাটা কী? কাশ্মীরিদের আন্দোলন থেকে ইসলামকে আলাদা করে, এটিকে মানবাধিকার ইস্যু হিশাবে দেখানোর ইঙ্গিতটা কী? কাশ্মীরিরা আজাদি অর্থ কী বোঝে, এটা কি গুরুত্বপূর্ণ না? তাদের শ্লোগান দেখুন—’আমরা কী চাই? আজাদি। আজাদি কী? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!’ প্রথাগত নারীবাদীরা এই শ্লোগান শুনলেই ভাববেন, ইসলাম আর আজাদি এক হয় কীভাবে, এ তো নারীর অধিকারের বিরুদ্ধে। ফলে, আয়েশার কবিতা এই সেক্যুলার নারীবাদী ও সেক্যুলার স্টেটের কাছে প্রলাপ মনে হবে। কাশ্মীরিদের এই আজাদির অর্থ শুধু স্বাধীনতা না, বরং তাদের মতে স্বাধীনতার পূর্বশর্ত যে শাহাদা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, এই পূর্বশর্ত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটিকেও সামনে নিয়ে আসা। কাশ্মীরিদের আন্দোলন বা আজাদি থেকে তাই ইসলামকে কিছুতেই আলাদা করে দেখা যাবে না।
