নাগরিকত্ব বিল : ভারতের মুসলিম বিরোধী আগ্রাসন

মুনশী নাঈম :

ভারতে আইনে পরিণত হয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি)। এই বিলটির মাধ্যমে হিন্দু-রাষ্ট্রের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারত। এমনিতে ভারতে নাগরিকত্ব পেতে ১১ বছর সেখানে অবস্থান কিংবা ফেডারেল সরকারের পক্ষে কাজ করতে হয়। কিন্তু নতুন এই আইনে ছয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকত্ব পেতে আর ১১ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। মাত্র ৬ বছর অবস্থান করলেই হবে। ধর্ম ছয়টি হলো—হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খৃস্টান। আইনে বলা হয়েছে, তারা যদি প্রমাণ করতে পারে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান, আফগানিস্তান কিংবা বাংলাদেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে এসেছে, তাহলে তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদেরকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী বলা হবে না।

বিলটি বিতর্কিত কেন?

আপাতদৃষ্টিতে বিলটি নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার প্রশংসনীয় চেষ্টা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি এবং খৃস্টানদের নাগরিকত্বের পথ সুস্পষ্ট থাকলেও বিপাকে পড়বে মুসলিমরা। ভারতে ২০০ মিলিয়ন মুসলমানের বাস, যা তাদের জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ। বিলে সবার কথা উল্লেখ করা হলেও সংখ্যালঘু মুসলিমদের কথা বলা হয়নি।

সমালোচকরা বলছেন, সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার জন্যই যদি সত্যিকারার্থে বিলটি করা হয়, তাহলে মুসলিম ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্ত করার দরকার ছিল। যেমন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকার তো নির্যাতিত এইসব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তাড়াতে সুপ্রিমকোর্টে গিয়েছে। সুতরাং মুসলিমদেরকে যে ইচ্ছে করে বাদ দেয়া হয়েছে, তা এখানে স্পষ্ট।

ভারতের সংবিধান তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে। এবং সমস্ত নাগরিককে আইনের সামনে সমতা ও সমান সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে। নতুন নাগরিকত্ব বিলের মাধ্যমে সেই সমান সুরক্ষার নীতিকে খণ্ডিত করা হয়েছে।

নাগরিকত্ব বিলের সাথে এনআরসির সংযোগ

বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিলটির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি)। ইতোমধ্যেই আসামে এনআরসি হয়ে গেছে। তাতে নাগরিকত্ব হারিয়েছে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ। এদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ হিন্দু। এনআরসি থেকে বাদ পড়া এইসব মানুষের এখন একটাই উপায়—বিশেষ ট্রাইবুনালে গিয়ে তাদেরকে ভারতীয় প্রমাণ করতে হবে পুরোনো নাগরিকত্ব বিল অনুসারে। যেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ এর ২৪ মার্চের আগে যারা ভারতে গেছে, তারাই ভারতীয় বলে গণ্য হবে। সুতরাং নিজেদেরকে ভারতীয় প্রমাণ করতে তাদেরকে ১৯৭১ এর আগের ডকুমেন্টস দেখাতে হবে। না দেখাতে পারলে সোজা বন্দী করা হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে।

কিন্তু এই নিয়মে এখন আটকা পড়বে কেবল মুসলিমরা। অন্যদিকে নাগরিত্ব বিলের আওতায় পার পেয়ে যাবে ইসলাম ছাড়া আর সব ধর্মের লোকেরা। তাদেরকে ১৯৭১ নয়, ২০১৪ সালের আগের ডকুমেন্টস দেখালেই হবে।

আসামের পর পুরো ভারতে এনআরসির ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি। তার আগে সেরে নিয়েছে নাগরিত্ব বিলের কাজ। পুরো ভারতে এনআরসি হলে নাগরিত্ব বিলের নিয়মে খুব সহজেই নিজেদের ভারতীয় নাগরিত্ব বাগাতে পারবে হিন্দুসহ অন্য ধর্মের লোকেরা। কিন্তু মুসলিমদের দেখাতে হবে সেই ১৯৭১ আগের ডকুমেন্টস। এত আগের ডকুমেন্টস কয়জনেরই থাকে? থাকলেও আইনি লড়াই করে কয়জন পারবে নিজেদেরকে নাগরিক প্রমাণ করতে?

মূলত ভারতের বিশাল সংখ্যক মুসলিম, যারা সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি, নাগরিকত্ব হারিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী হবার ঝুঁকিতে আছে।

হিন্দু রাষ্ট্রের দিকে এগুচ্ছে ভারত

বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো একযোগে বলেছিলো, হিন্দুরাষ্ট্রের দিকেই এগুচ্ছে ভারত। প্রথমে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল, তারপর বাবরি মসজিদ মামলার রায়, এরপর এখন এল নাগরিকত্ব বিল। সবগুলো জায়গাতে মুসলিমদের প্রান্তিক করা হয়েছে। সামনে হয়ত ভারতীয় মুসলমানদের ওপর সবচে বড় ধাক্কাটা আসবে এনআরসির বাস্তবায়নের সময়। এনআরসি থেকে বাদ পড়া মুসলিমরা তখন অধিকারও চাইতে পারবে না। দেশ যাকে নাগরিক বলে অস্বীকার করবে, দেশের কাছে তার চাইবার অধিকারও থাকবে না।

জেসুইট পুরোহিত এবং মানবাধিকার আইনজীবী সিড্রিক প্রকাশ বলেছেন, ‘মুসলিম ব্যতীত আর সবাইকে নাগরিত্ব দেয়ার আইন করে আমাদের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধ্বংস করা হয়েছে।’

দিল্লির আইনজীবী গৌতম ভাটিয়া বলেছেন, ‘অভিবাসী মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে বিভক্ত করার মাধ্যমে ধর্মীয় বৈষম্যকে উসকে দিয়ে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে।’

আগের সংবাদবরিস জনসনের বিজয়ে উদ্বিগ্ন ব্রিটিশ মুসলিমরা
পরবর্তি সংবাদদিনাজপুরে এক মঞ্চে ২০ টি যৌতুকবিহীন বিয়ে