মনোবিদ নিয়োগে হাইকোর্টের রুল: ধর্মীয় শিক্ষকে নেই মনোযোগ

রাগিব রব্বানি:

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন করে কাউন্সিলর (পরামর্শক) ও একজন করে সাইকোলজিস্ট (মনোবিদ) কেন নিয়োগ দেওয়া হবে না জানতে চেয়ে বিশেষ এক রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়ার এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এম. এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ গেল ৫ জানুয়ারি রোববার এ আদেশ দেন।

কাউন্সিলর ও মনোবিদ নিয়োগে নিস্ক্রিয়তা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, একই সঙ্গে তা বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭ (ক ও খ), ১৮ (১ ও ২) ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উল্লেখ করা হয় আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়ার ওই রিট আবেদনে। ফলে রিট আবেদন আমলে নিয়ে আদালত এই রুল জারি করেন।

সচেতন মহল বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিদ নিয়োগে হাইকোর্টে রিট আবেদন ও রুল জারি হলেও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে কোনো আলোচনা পরিলক্ষিত হয় না কখনোই। অথচ মনোবিদ নিয়োগের প্রয়োজন যতটা না, তারচেয়ে ঢের বেশি দরকার প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ধর্ম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ।

ইসলাম শিক্ষার ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দু শিক্ষকেরা

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা পাঠদানের জন্য বিশেষজ্ঞ কোনো শিক্ষক নেই। ফলে অনেক স্কুলে ইসলাম শিক্ষার ক্লাস নিতে দেখা যায় হিন্দু শিক্ষককে, আবার হিন্দু শিক্ষার ক্লাস নিতে দেখা যায় মুসলিম শিক্ষককে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ফলে সেখানকার মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলাম শিক্ষার ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দু শিক্ষকরাই। জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও আরও বেশ কয়টি স্কুল এমন আছে, যেখানে মুসলিম শিক্ষক না থাকার দরুণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্ম শিক্ষার ক্লাস হিন্দু শিক্ষকরাই নিচ্ছেন। এদিকে ফরিদপুরের মানিকদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৭ ভাগ শিক্ষার্থী মুসলিম, কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সকলেই হিন্দু, ফলে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মশিক্ষার ক্লাস সম্পন্ন হচ্ছে হিন্দু শিক্ষকদের মাধ্যমে।

ধর্মীয় শিক্ষকের অভাবে বন্ধ ধর্ম শিক্ষার ক্লাস

রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বারুগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে ধর্ম বিষয়ক শিক্ষকের অভাবে ধর্ম শিক্ষার ক্লাস বন্ধ। স্কুলটিতে প্রায় তিনশো শিক্ষার্থীর অধিকাংশই মুসলিম পরিবারের সন্তান, কিন্তু শিক্ষকদের সকলেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

এ ছাড়া দেশের অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইসলাম শিক্ষার ক্লাস মুসলিম শিক্ষকেরা নিলেও তাঁদের অধিকাংশই ধর্ম বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী না। ফলে নামকাওয়াস্তে দায়সারাগোছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে ধর্ম বিষয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে।

প্রতিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে পাঁচজন করে শিক্ষক থাকেন। গণিত, ইংরেজি, বাংলাসহ অন্যান্য বিষয়ের মতো ধর্ম শিক্ষাও প্রাইমারির প্রতিটা ক্লাসে বাধ্যতামূলক। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষক থাকলেও ধর্ম বিষয়ে পারদর্শী কোনো শিক্ষক থাকেন না প্রাইমারি স্কুলগুলোতে। ফলে ধর্মশিক্ষার বিষয়টা বরাবরই অবহেলার শিকার হয়ে আসছে। স্কুলগুলোতে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিলে এই সমস্যা থেকে সহজেই উতরে ওঠা যেত বলে বিভিন্ন সময়ে বলে আসছেন সচেতন মহল।

বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে একটা ঘোষণা জারি করেছিল প্রায় ১০ বছর আগে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তাঁর সরকার সারা দেশে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে আরও নানাতর ঘোষণা বাস্তবায়িত হলেও এ ঘোষণা আজও আলোর মুখ দেখেনি।

ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ কতটা জরুরি?

সম্প্রতি মনোবিদ নিয়োগে আলোচনা-পর্যালোচনা চললেও ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের কোনো আলোচনা নেই কোথাও। এ বিষয়ে আলাপ হয়েছিল চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইনের সঙ্গে। তিনি ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, মনোবিদ নিয়োগের ব্যাপারে আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে, হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন, এটা অবশ্যই ভালো একটা দিক। প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মনস্তাত্ত্বিক পরিচর্যার জন্য একজন শিক্ষক জরুরি। তবে তারচেয়েও বেশি জরুরি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ। কারণ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা চর্চা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অর্জনের জন্য প্রাথমিক স্তরের ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, এই ক্লাসগুলো ধর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ শিক্ষকগণ কর্তৃক নেওয়া অপরিহার্য। সাধারণ কোনো টিচার এ ক্লাস নিলে সেটা দায়সারানো বৈ কিছুই হবে না। তাছাড়া ইসলাম শিক্ষার ক্লাস হিন্দু শিক্ষকের দ্বারা করানো অনুচিত একটি কাজ; অনরূপ হিন্দু বা অন্য ধর্মের ক্লাসও মুসলিম শিক্ষক দ্বারা করানোও উচিত নয়। তাই আমি মনে করি এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে ওলামায়ে কেরাম রাষ্ট্রপক্ষকে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করাতে পারেন উচ্চপর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে। রাষ্ট্র পক্ষকে ভালো করে বুঝালে আশা করি তাঁরা বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন।

ড. আ ফ ম খালিদ আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে কওমি মাদরাসা ফারেগ আলেমদেরকে কাজে লাগাতে পারে সরকার। এখানে বিরাট একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে কওমি ছাত্রদের জন্য। এ সুযোগ সরকার তাদেরকে দিলে সরকারিভাবে দাওরার যে সনদ প্রদান করা হয়েছে সেটার বাস্তবিক একটা কার্যকারিতা পরিস্ফুটিত হবে, যা কওমি আলেমদের পাশাপাশি সরকারের জন্যও ইতিবাচক একটা দিক।

আগের সংবাদ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণ বাড়ছে’
পরবর্তি সংবাদজম্মু-কাশ্মীরে ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হয়েছে