মুসান্না মেহবুব:
নাটোর থেকে এসেছেন বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মুসল্লি। সফেদ দাড়িতে সরলতার অদ্ভুত এক দ্যোতি ছড়িয়ে আছে তাঁর মুখজুড়ে। ২২ নম্বর খিত্তায় যাতায়াতের রাস্তার কিনারে ‘তাবলিগি বেডিং’ পেতে বসে নীরবে বয়ান শুনছেন। শনিবার (১১ জানুয়ারি) বাদ ফজরের আম বয়ান। বয়ান তখন শেষ পর্যায়ে। শেষ হওয়া অবধি খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য।
বয়ান শেষ হতেই উঠে দাঁড়িয়েছেন, কোনো জরুরত সারবেন হয়তো। সামনে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলাম। সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞাসু নেত্রে চাইলেন, কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করব কি না…। বললাম, এম্নিই একটু গল্প শুনব, দোআ নেবো আপনার। একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটে, সারল্যে ভরা হাসি। হাত ধরে নিজের বিছানার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, বসুন।
আরও পড়ুন: ইজতেমায় বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে ভোগান্তি
আলাপচারিতায় জানতে পারলাম, ভদ্রলোকের নাম আবদুল খালেক। পঁচিশ-তিরিশ বছর হলো ধারাবাহিকভাবে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করছেন। নাটোর শহরে ইট-বালু-সিমেন্টের ব্যবসা আছে তাঁর। যৌবন কাটিয়েছেন এই ব্যবসার ব্যস্ততায়। দীন-ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। তারপর পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে তাবলিগের দাওয়াতে চৈতন্য ফেরে। মহল্লার মসজিদ থেকে প্রথমে তিনদিনের জন্য ‘আল্লাহর রাস্তা’য় বের হন। তারপর তিন চিল্লা। সেই থেকে ওতপ্রোতভাবে লেগে আছেন তাবলিগের ‘মেহনতে’। ব্যবসার দেখাশোনা এখন ছেলেরা করে, তিনিও বসেন মাঝে মাঝে, কিন্তু বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেন তাবলিগের কাজে।
জানতে চেয়েছিলাম গত পঁচিশ-তিরিশ বছর ধরে ইজতেমায় আসার অনুভূতির কথা। উত্তরে আবদুল খালিক বলেন, ইজতেমা কোনো আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, ‘আল্লাহর রাস্তায়’ ‘খুরুজে’র জন্য এই সমাবেশ। কীভাবে বেশি বেশি মানুষকে দীনের পথে নিয়ে আসা যায়, এই লক্ষ্য থেকেই আমি আসি প্রতিবছর। এলাকার অনেক মানুষজনকে তাশকিল করে নিয়ে আসি। ইজতেমায় এলে মুরব্বিদের বয়ান শুনে দিলের পরিবর্তন হয়, আল্লাহর রাস্তায় বের হবার হিম্মত তৈরি হয়, ফলে অনেকেই ইজতেমা থেকে নিয়ত করেন আল্লাহর রাস্তায় বেরোবেন।
কলকাতা থেকে এসে ইজতেমায় শরিক হয়েছেন কামাল হোসেন নামক এক প্রৌঢ় সাথি। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। শনিবার জোহরের আগ মুহূর্তে বিদেশি খিত্তার বাইরে দেখা হলো তাঁর সাথে। জরুরি প্রয়োজন সারতে বেরিয়েছেন। ইজতেমায় এবারই প্রথম এসেছেন। এতো বিশাল মজমায় এর আগে কখনো শরিক হননি তিনি। বৃহস্পতিবার বিকালে পৌঁছেছেন ময়দানে। মনোযোগ দিয়ে শুনছেন প্রতিটা বয়ান। ইজতেমার পর একচিল্লার জন্য বেরোবেন তাঁর দেশি একটা জামাতের সঙ্গে।
কামাল হোসেন বলেন, ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের ব্যবহার তাঁকে মুগ্ধ করেছে। এতো ভীড়, এতো অসুবিধা, তারপরও সকলের কাছ থেকে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ পাচ্ছেন তিনি। অপরকে ছাড় দেবার এমন সুন্দর মানসিকতা এতো ব্যাপকভাবে অন্য কোথাও তিনি দেখেননি।
ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসার ছাত্র হাফেজ ইবরাহিম আলির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা শেষ করতে করতেই। মেশকাত জামাতে পড়ছেন তিনি। ইজতেমা উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এ বছরও তাদের মাদরাসা ছুটি হয়েছে, ছাত্রদের অনেকেই এসেছেন ইজতেমায়, তিনিও। ইবরাহিম আগেও কয়েকবার এসেছেন ইজতেমা ময়দানে। এ বছর ইজতেমা শুরুর আগে মাঠ প্রস্তুতির কাজেও শরিক হয়েছেন। কখনো চিল্লায় যাননি, তবে মাদরাসা থেকে চব্বিশ ঘণ্টার জামাতে বেরিয়েছেন অনেক বার।
টঙ্গী ময়দানের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে মুচকি একটা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে এ মাদরাসাছাত্র বলেন, এখানকার পরিবেশটাই অন্যরকম। এতো ভীড়, খাওয়া-দাওয়া ওজু-ইস্তেঞ্জায় এতো সমস্যা, তারপরও কারও কোনো অভিযোগ নেই, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতা সবার মাঝে বিরাজমান।
তিনি বলেন, এ বছর লোকসমাগম অতীতের চেয়ে সবচেয়ে বেশি হওয়ায় মুসল্লিদের নানামাত্রিক অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ কারও প্রতি কারও অভিযোগ নেই। তাবলিগের এই জিনিসটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং চমৎকার। কোনো অভিযোগ থাকে না কারও প্রতি কারও। প্রত্যেকেই একে অপরের সুবিধার দিকটা আগেই বিবেচনা করেন।
