মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা : নেই কোনো নীতিমালা

মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা : নেই কোনো নীতিমালা

রাগিব রব্বানি :

বাংলাদেশে ছোট-বড় প্রায় ২০ হাজারের মতো বেসরকারি মাদরাসা রয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় গড়ে উঠছে আরও অনেক নতুন মাদরাসা। কিন্তু এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। দেশের বৃহত্তম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের কিছু নীতিমালা থাকলেও তা অনেক মাদরাসাই অনুসরণ করছে না। যারা অনুসরণ করছে, তারাও বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করছে না এ নীতিমালাকে। ফলে শৃঙ্খলা বজায় থাকছে না অনেক ক্ষেত্রেই।

কওমি মাদরাসাগুলোর অধিকাংশই স্থানীয় লোকজনের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। বেফাকের নীতিমালাতেও এলাকাবাসীর সমন্বয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠনের কথা আছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদরাসায় কমিটির ক্ষমতা ও প্রভাব এতো বেশি থাকে যে, মাদরাসার দায়িত্বশীল উসতাদরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। কোনো কোনো মাদরাসায় মাদরাসার পরিচালক বা মুহতামিমের ক্ষমতা ও প্রভাব থাকে বেশি। এসব মাদরাসার অনেকটাতেই সাধারণ শিক্ষকরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত থাকেন।

রাজধানীর কমিটি পরিচালিত একাধিক মাদরাসার শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উসতাদদেরকে কমিটির লোকজন এক ধরনের ‘চাকর’ই মনে করেন। ছাত্রদেরকে স্বাধীনভাবে তরবিয়ত প্রদানেও বাধা দেন কমিটির দায়িত্বশীলেরা। আবার পান থেকে চুন খসার মতো ঘটনায়ও উসতাদদের নাজেহাল করা হয়। এমনকি বেতন ভাতা দেওয়ার সময় শোনানো হয় ‘এখলাসের বয়ান’।

মুহতামিম প্রভাবিত একাধিক মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরাও একই সমস্যার কথা জানান।

বিগত এবং চলতি দশকে ভাড়া বাড়িতে প্রাইভেটভাবে এক ধরনের মাদরাসা গড়ে উঠছে। প্রতি বছরই এই ধরনের মাদরাসার সংখ্যা বাড়ছে। মাদরাসাগুলো গড়ে উঠছে ব্যক্তি উদ্যোগে। দাওরা পাশ যে কেউ এ ধরনের মাদরাসা খুলতে পারছে। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে এ ধরনের মাদরাসা বেশি দেখা যায়। একই এলাকায় এমনকি একই বিল্ডিংয়ে একাধিক মাদরাসা গড়ে ওঠার মতো ঘটনাও আছে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় একই বিল্ডিংয়ে একাধিক মাদরাসা দেখা গেছে। আবার একই এলাকায় কয়েক মিনিটের দূরত্বে আছে অনেকগুলো মাদরাসা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এসব মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় নির্দিষ্টভাবে কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না।

প্রাইভেট এসব মাদরাসার অধিকাংশই প্রতিষ্ঠা হয় নিছক ব্যবসায়ী মনোভাব থেকে। ছাত্রদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ফি গ্রহণ করা হয়। অনেক মাদরাসায়ই ইফতা ও তাখাসসুসের নামে মানহীন পড়াশোনা করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সার্টিফিকেট। ছাত্রদের যোগ্যতা যাচাই না করেই নেওয়া হয় তাখাসসুসে ভর্তি।

হাইআতুল উলয়ায় মাকবুল বিভাগে উত্তীর্ণ ইফতা পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তিনি যে মাদরাসায় ইফতা পড়ছেন, সেখানে ভর্তি হতে বিশেষ কোনো পরীক্ষা দিতে হয়নি। নির্ধারিত ভর্তি ফি ও মাসিক ফি আদায় করলেই সেখানে ইফতা বিভাগে ভর্তি নেওয়া হয়।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য বৃহত্তম কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের একটা নীতিমালা আছে। বেফাকের মহাপরিচালক অধ্যাপক মাওলানা যোবায়ের আহমদ চৌধুরী জানান, বোর্ডটির অধিভুক্ত মাদরাসাগুলোতে এই নীতিমালা কার্যকর করার তাগিদ দেওয়া হয় বোর্ড থেকে। নইলে অধিভুক্তি বাতিল করা হবে বলে জানানো হয় নির্দিষ্ট মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে।

বেফাকের মহাপরিচালক আরও জানান, মাদরাসা পরিচালনার জন্য এলাকাবাসীর সমন্বয়ে একটা কমিটি গঠনের কথা আছে নীতিমালায়। এলাকার নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধির সম্পৃক্তির কথাও আছে। এ ছাড়া কমিটি এবং মাদরাসার মুহতামিমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে মাদরাসা পরিচালনায় জোর দেওয়া হয়েছে নীতিমালায়।

মাদরাসা ভাড়া বাড়িতে হলে ভাড়ার কাগজপত্র আর নিজস্ব জমিতে হলে জমির কাগজপত্রও এলহাকের সময় যাচাই করে বেফাক। জানান অধ্যাপক মাওলানা যোবায়ের আহমদ।

ভাড়া বাড়িতে যে সমস্ত মাদরাসা গড়ে উঠেছে, সেগুলোতে তো সাধারণত কমিটি থাকে না, এ মাদরাসাগুলোকে এলহাকভুক্ত করা হয় কীভাবে জানতে চাইলে বেফাক মহাপরিচালক জানান, এ সমস্ত মাদরাসাকে প্রাথমিকভাবে এলহাক দেওয়া হয়, এবং কমিটি গঠনসহ বেফাকের নীতিমালা অনুসরণের ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তারা ক্রমান্বয়ে এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করেন।

তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বেফাকের নীতিমালা পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করে না উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদরাসা। এসব নীতিমালা অনুসরণে বাধ্যবাধকতায় যাবার মতো ক্ষমতাও নেই বেফাকের।

আগের সংবাদবিএসএফের আপত্তিতে বন্ধ আখাউড়া ইমিগ্রেশন ভবন নির্মাণের কাজ
পরবর্তি সংবাদহজ-ওমরা ও মক্কা-মদিনা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য, ভণ্ডপীরের ফাঁসি দাবি কিশোরগঞ্জের আলেমদের