আরেফিন মুহাম্মদ :
আমি তাবলীগের একজন আউটসাইডার। অর্থাৎ তাবলীগ জামাতের কার্যক্রমকে ভেতর থেকে দেখার কোনো সুযোগ আমার কখনো হয়নি৷ হ্যাঁ, কখনো কখনো তাদের তালীমে বসা হয়েছিলো। তাও তো সেই শৈশবে৷ প্রাইমারি কিংবা হাই স্কুলে পড়ার শুরুর দিনগুলোতে। সাধারণত মসজিদে বিদেশি জামাত এলে আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছে ঘেঁষতাম। আমাদের তখন বুঝ ছিল এরকম যে, আমরা ভাবতাম বিদেশি মানেই ইংরেজি কথা বলে। আমরা দৌড়ে দৌড়ে গিয়ে আমাদের সেই সময়ের চালান— How are you, where from, good, thank you —এগুলো বলতাম। গাট্টি-বোচকা নিয়ে কাতারবদ্ধ হয়ে একদল লোক মসজিদে আসছে, রান্নাবান্না করছে, একসাথে বসে সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে—এ ব্যাপারগুলো খুব ইন্টারেস্টিং লাগতো সে সময়৷ একটু বড় হওয়ার পরে মূলত বিরক্তি লাগতো যখন তারা মাঠে ক্রিকেট খেলার মধ্যে হানা দিতো। হয়তো দূর থেকে কেউ একজন দেখে বলতো, ‘দৌড়া, দৌড়া, আল্লাহর পুলিশ আইলো রে..’। আমরা তখন দৌড়ে পালাতাম।
একটু জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পরে এবং পারিবারিক সূত্রে পলিটিক্যাল ইসলামের সাথে জড়িয়ে যাওয়ায় এবং মাঠে-ময়দানে মিছিল-মিটিং এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই ইসলামের মাকাসিদ মনে করায় তাবলীগের কাজকে অপছন্দ না করলেও অপূর্ণাঙ্গ ইসলাম জ্ঞান করতাম।
তাবলীগ জামাতের ইজতেমায় অংশগ্রহণ এবং দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে ‘আল্লাহর রাস্তায়’ এক চিল্লায় বের হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল আমার জন্য অনেকটা ‘গেইম চেঞ্জিং মোমেন্টামের’ মতো। দেখি কী হয় বা তারা কী বলে, তাদের মজমাগুলোতে শরীক হয়েই দেখি না—এই রকম একটা এপ্রোচ নিয়েই আমি মূলত এবারের ইজতেমায় শরীক হই।
বুধবার রাত দুইটায় ইজতেমার মাঠে আমাদের নির্ধারিত খিত্তায় যখন আসি, ইজতেমার মাঠ ইতোমধ্যেই প্রায় ভরে গেছে৷ আনুষ্ঠানিকভাবে শুক্রবার থেকে ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল। পুরানো সাথি ভাইয়েরা বললেন, সাধারণত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই বয়ান শুরু হয়৷ কিন্তু এ বছর বুধবার থেকেই মজমা জমে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বয়ান শুরু হলো। কেউ একজন বাংলায় বয়ান করলেন। এখানে বয়ানকারীর নাম-পরিচয় ঘোষণা করা হয় না। আমাদের মতো নবাগতদের পক্ষে তাই বয়ানকারীর পরিচয় জানার উপায় নেই। অবশ্য খিত্তায় খিত্তায় বড় ভাইয়েরা বলে দেন কে বয়ান করছেন। বয়ান মিম্বারের একেবারে সামনেই আমাদের নির্ধারিত খুঁটি হওয়ায় খুব স্পষ্টই বয়ানকারীদের দেখা যাচ্ছিল। মূলত মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে বৃহস্পতিবার আসরের পর থেকে৷ রাতের মধ্যে পুরো মাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে৷ কোথাও যেন তিল ধারণের ঠাঁই নাই। আগতরা সবাই বলছিলেন, এতো বড় মজমার ইজতেমা আগে আর কখনোই দেখেন নাই৷ লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত একটা মাঠে৷ তাদের থাকা-খাওয়া, প্রাকৃতিক জরুরত, অজু-গোসল সারা বড় এক মুশকিলের কাজ তো বটেই, রীতিমতো একটা যুদ্ধ-জুহুদের ব্যাপার৷ বয়ান মিম্বার থেকে বারবার ঘোষণা আসছিল, এই কষ্ট-মুজাহাদাকে সবরের সাথে পালন করে যাওয়ার, আল্লাহ উত্তম জাযা দেবেন৷ বিশেষত জুমআর নামাজের সময় প্রায় এক ঘন্টা দেরি করা হয়, কাতারের ইত্তেসাল ঠিক আছে কিনা এইটা নিশ্চিত করার জন্য, যেহেতু উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত কাতার চলে গেছে বলে মাইকে বারবার বলা হচ্ছিল।
সবচেয়ে মুশকিলের ব্যাপার ছিল প্রাকৃতিক জরুরত সারা। একে তো এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশ রুমের অপ্রতুলতা, টয়লেটগুলোতে আবার খানিক বাদে বাদে পানি সংকট, তার উপর টয়লেটগামী মানুষের আসা যাওয়ার ভিড়ের ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের পরিকল্পিত ‘ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট’ না থাকা বিরাট বড় মুশকিলের পরিস্থিতি তৈরি করছিল। বিশেষত ফজরের আগে এমনকি রাত তিনটা থেকেই লাইন ধরে যেতো, ভিড় ঠেলে টয়লেট থেকে তাবু এবং তাবু থেকে টয়লেটে যাওয়ার পথে ঠেলা, ধাক্কায় রীতিমতো প্রাণ ওষ্ঠাগত। যেহেতু এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট ছিল না, এমনকি আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা লাইন মেইটেইন করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের টিম তেমন দেখা যায়নি, সুতরাং ঠেলা, ধাক্কা, ভিড় আরও বাড়ছিলো এবং বেশ কয়েকটা দুর্ঘটনাও ঘটেছে বলে শোনা যাচ্ছিল। আগতদের কেউ কেউ বলছিলেন যে, সাদের লোকেরা (তাবলিগের বিতর্কিত আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভির অনুসারী) ভেতরে ঢুকে গেছে। নইলে এইরকম বে-উসুলি পরিস্থিতি ইজতেমায় এর আগে আর কখনোই হয় নাই।
সবচেয়ে মনখারাপ হয়েছে শনিবার ভোরে একটা পাস জোগাড় করে বিদেশি জামাতের জন্য নির্দিষ্ট টয়লেটে যাওয়ার পরে। একেবারে খালি৷ কোনো চাপ নাই। অথচ টয়লেটগুলোর তিনটা ব্লক ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দুইটা বিদেশি জামাতের জন্য, একটা খেদমতের সাথিদের জন্য৷ মনে হলো, অন্তত একটা ব্লক ছেড়ে দেওয়া যেতো সাধারণের জন্য, যেহেতু মজমা ধারণার চেয়েও অনেক বড় হয়ে গেছে৷ অবশ্য আখেরি মোনাজাতের দিন অর্থাৎ রবিবার ভোর থেকে একটা ব্লক খুলে দেওয়া হয়েছে।
ইজতেমার মূল ফ্লেভার পাওয়া যায় মূলত শুক্রবার মাগরিবের পরের বয়ান থেকে৷ ইন্ডিয়ার মুরব্বিরা হিন্দিতে বয়ান করেন, বাংলায় কাকরাইলের মুরব্বিরা তরজমা করে দেন। লক্ষ লক্ষ লোকের বিরাট এক মজমা, অথচ বয়ানের মাঠে পিন ড্রপ সাইলেন্স৷ একেবারে নিশ্চুপ৷ মানুষজন তন্ময় হয়ে আল্লাহর বড়ত্বের বয়ান শুনছে। মানুষ শুনছে আল্লাহ কত বড় খালিক জাত, ‘হার মাখলুক’ সেই মহামহিম মনিবের সামনে কত তুচ্ছ, হেয়, নীচু! এক অদ্ভুত অশরীরী আধ্যাত্মিক এক প্রতিবেশ যেন মজমা জুড়ে বিরাজ করছে৷ নিজেকে চেনার, নিজের খালিক, মালিক, রাব্বে কারীমের জাতকে চেনার এই রকম আধ্যাত্মিক প্রতিবেশ খুব কম মজলিসেই পাওয়া যায়৷
প্রতিটা বয়ান শুরু হয় আল্লাহর বড়ত্বকে সামনে রেখে৷ লক্ষ লক্ষ মানুষ একটা মাকাসিদকে সামনে রেখেই জড়ো হচ্ছে—দীনের তাকাজা। বয়ান মিম্বারের দিকে সকলেই মুতাওয়াজ্জু হয়ে তন্ময় হয়ে বয়ান শুনছে সেই তাকাজাকে সামনে রেখেই৷ রাত জেগে কেউ তাহাজ্জুদ পড়ছে, কেউ জিকির করছে, কেউ কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন। তুরাগের তীরে পুরা মাঠজুড়ে বিরাজ করছে একটা আধ্যাত্মিক মোহাবিষ্টতার পরিবেশ। যে পরিবেশ খোদার কাছে ফিরে যাওয়ার অমোঘ পরিণতিকেই সার্বক্ষণিক স্মরণ করিয়ে দিতে থাকে। মানুষ এবং খোদার মধ্যে যে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের যোগসূত্র, স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে যে আধ্যাত্মিক প্রেমের যোগাযোগ— পুরা মজমা যেন শুধু এই মহিমারই ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলছে প্রতিনিয়ত।
প্রতিটি বয়ানের শেষে আবার যখন খিত্তায় খিত্তায় জামাতে জামাতে ভাগ হয়ে নিজেরা নিজেরা মোজাকারা হয়, আমি তখন খিত্তা থেকে খিত্তা ঘুরে বেড়িয়েছি শুধু এইটা শোনার জন্য যে, ‘আল্লাহর রাস্তায়’ বের হওয়ার জন্য তশকিল করার সময় মাঠ পর্যায়ের এই দাঈরা কি বলেন। দেখি অনেক ক্ষেত্রেই বয়ানে হুজুর যা বলছেন তার অর্থ অনেকখানিই বদলে যাচ্ছে এই তৃণমূল দাঈদের কাছে এসে৷ কোথাও কোথাও হয়তো সম্পূর্ণ নতুন একটা অর্থ আসছে৷ আমি তাদের কথাগুলো শুনে শুনে বুঝেছি এই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সারা দেশে, গ্রামে, গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় যারা আঞ্জাম দিচ্ছেন তারা আমাদের মতো প্রিভিলেজড লোক না। বেশিরভাগ লোকেরই হয়তো জেনারেল লাইনে শিক্ষা দীক্ষা কম। আর দীনি লাইনে তাবলীগের দাওয়াত ও মেহনতের কাজে মুরব্বিদের বয়ানের বাইরে দীনি ইলমের সাথে তারা খুব একটা পরিচিতও না। অথচ বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এই কম শিক্ষিত, কম ইলমের, কম বুঝের মানুষগুলোই মানুষকে দীন, নামাজ, সুরা কেরাত এগুলো শিক্ষা দিয়ে আসছেন গ্রাম থেকে গ্রামে, মহল্লা থেকে মহল্লায় নিজেদের এই স্বল্প চালানকে পুঁজি করেই। ফাযায়েলে আমলসহ ফাযায়েলের অন্যসব কিতাবের প্রতি আমার খুবই ক্রিটিক্যাল এটিচ্যুড অনেক আগে থেকেই ছিল এবং এখনো আছে৷ কিন্তু তাবলীগের দাওয়াতের বক্তব্য, ভাষা, এই কাজের সাথে জুড়ে থাকা মানুষজনের সাথে মিশে, কথা বলে আমার এটা বুঝে এসেছে যে, ফাযায়েলের এই কিতাব মূলত আম মানুষের ইন্টেলেক্টরে সামনে রেখে রচিত৷ তাবলীগের উসুল এবং তারতীবও এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই।
শুক্রবার রাত এগারোটা নাগাদ মাওলানা যোবায়ের সাহেব মাইকে ঘোষণা দিলেন, মুরব্বিরা বলছেন, এতো বিরাট বড় মজমা ইতিপূর্বে উনারাও আর কখনো দেখেন নাই। আগত ভাইদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন, যাদের চিল্লার জন্য তাশকিল হয়ে গেছে, তাদেরকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে কিছুটা ইহসান হবে। কিন্তু মুরব্বিরা বলছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার নিয়ত করে ফেলছেন, তারা হলেন বাতি। বাতি ছাড়া এই মজমা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে৷ তারা ছাড়া মজমা লবণ ছাড়া তরকারির মতো। তাই কষ্ট হলেও একটু সবর আর মুজাহাদার সাথে যেন সবাই আর দুইদিন পার করি।
শনিবার সকালে যখন আলেম-ওলামাদের উদ্দেশ্যে খাস বয়ান শুরু হয়, তখনই বুঝে আসে কেন এই বছরের ইজতেমায় এতো বড় মজমা তৈরি হয়েছে৷ বয়ান মিম্বারের আশেপাশের বিস্তৃত এলাকা পুরোটা ভরে গেছে আলেম ওলামা, তালেবুল ইলমদের দিয়ে। মূলত এতায়াতিদের সাথে তাবলীগের এই বিভাজনের পরে কওমি ঘরানার আলেম ওলামারা এই ইজতেমাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তাই অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় তারা ইজতেমাকেন্দ্রিক মজমা জমাতে নিজেরা যেমন তালেবুল ইলমদের নিয়ে হাজির হয়েছেন বিপুল সংখ্যায়, তেমনি মানুষের মধ্যে ইজতেমায় অংশগ্রহণের ব্যাপারেও দাওয়াতের মেহনতও করেছেন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় খুব বেশি। তার ফলাফল হচ্ছে এবারের ইজতেমায় এই উপস্থিতি।
ছোটবেলায় একটা ইসলামি গান শুনতাম; ‘আমাদের সেই লোকের প্রয়োজন/ যার গায়ের জামা কাঁটায় বিঁধে আটকে গেলেও/ ছুটে যাবে দীনের পথে/ ভাববে জামা নিষ্প্রয়োজন/ আমাদের সেই লোকের প্রয়োজন। ‘
তাবলীগের কিতাব, বয়ান এবং কার্যকলাপের অনেক কিছুকেই আমরা ক্রিটিক্যালি দেখি৷ সময়ে সময়ে বিভিন্ন ব্যাপারে আমাদের সমালোচনাও আমরা জারি রাখি। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দাওয়াত ও তাবলীগের যে মেহনত, তা জারি রেখেছেন সমাজের লেস প্রিভিলেজড মানুষগুলোই, যাদের ইলম কম, লেখাপড়া কম, অর্থবিত্ত, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি সব কম কম। এই কমের কমের মানুষগুলোই তাদের সকল সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকে মুতাওয়াজ্জু হয়ে এক বিরাট জিম্মাদারি আঞ্জাম দিয়ে আসছেন বছরের পর বছর। যুগের পর যুগ। আমি তাদের নগদ জামাতে বের হওয়ার ব্যাপারে তাশকিল করতে দেখেছি৷ চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আয়-রোজকার, শারীরিক অসুস্থতা ইত্যাদি সবকিছুকে পেছনে ফেলে মুহূর্তের মধ্যে রাজি হয়ে যাচ্ছেন নগদ ‘আল্লাহর রাস্তায়’ বের হওয়ার তামান্না নিয়ে৷ ক্যারিয়ার, টাকা-পয়সা, বিত্ত, প্রতিপত্তি অর্জনের এই মহা প্রতিযোগিতার সময়ে তাবলীগের চেয়ে বড় এন্টি-এস্টাবলিস্টমেন্ট ইন্সটিটিউশন আর কি আছে? যেখানে মানুষ ছুটছে এক পরাবাস্তব জগতের দিকে, তার রাব্বের সন্তুষ্টির জন্য, সকল বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে। মনে হয় সত্যিই তো আমাদের সেই লোকের প্রয়োজন। যার গায়ের জামা কাঁটায় বিঁধে আটকে গেলেও, ছুটে যাবে দীনের পথে, ভাববে জামা নিষ্প্রয়োজন।
