রাগিব রব্বানি :
গতকাল বুধবার (২৯ জানুয়ারি) না ফেরার দেশে চলে গেলেন দেশের খ্যাতিমান ও বরেণ্য আলেম আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ। আজ (বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২০) কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় আলেম-ওলামা ও মাদরাসাছাত্রের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও ঢল নেমেছিল। বিশালায়তনের শোলাকিয়া ময়দান ছাপিয়ে আশপাশের এলাকায়ও ছিল জানাজার নামাজের কাতার।
আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ জাতীয় পর্যায়ে যেমন সমাদৃত একজন মহীরুহ আলেম ছিলেন, তেম্নি কিশোরগঞ্জসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সর্বমহলে ছিলেন বরিত ও মান্যবর ব্যক্তিত্ব। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শহিদি মসজিদের খতিব ছিলেন মৃত্যুর আগ অবধি দীর্ঘকাল। মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি অভিজাত শ্রেণির গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। যার ফলে কিশোরগঞ্জের প্রশাসন থেকে শুরু করে সবাই তাঁকে সমীহ ও সম্মান করে চলতেন। জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জের মুহতামিম ছিলেন দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে। কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক শিক্ষাবোর্ড তানযীমুল মাদারিসিল কওমিয়া আল আরাবিয়ার সভাপতি ছিলেন। ছিলেন শায়খুল হাদীস ও যোগ্যতাসম্পন্ন একজন আলেমে দীন। সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, এ দেশের ইসলামী রাজনীতির পুরোধা পুরুষ আল্লামা আতহার আলী রহমতুল্লাহ আলায়হির সাহেবজাদা ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহসভাপতি ছিলেন। ছিলেন আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়ায় অন্যতম সদস্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়াজ মাহফিলগুলোতেও তাঁর স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছিল। কুরআন-হাদীসের আলোকে হৃদয়গ্রাহী আলোচনা ও সুললিত কণ্ঠের তেলাওয়াতের জন্য ছিল বিশেষ খ্যাতি।
বহুমুখী যোগ্যতার অধিকারী মহীরুহ এ আলেমের একান্ত জীবন সম্পর্কে জানতে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোর থেকে কথা হয়েছিল তাঁর একান্ত স্নেহধন্য ছাত্র এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আসাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ ছিলেন অনন্য এবং স্পষ্টভাষী একজন আলেম। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না, কিন্তু ইসলাম-সংশ্লিষ্ট ইস্যুভিত্তিক প্রতিটা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। নব্বইয়ের দশকে বাবরি মসজিদ আন্দোলন, তসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলন, শূন্যের দশকে ফতোয়া নিষিদ্ধের রায় বিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটা আন্দোলন-সংগ্রামেই কিশোরগঞ্জ থেকে তিনি সিপাহসালারের ভূমিকা রাখতেন।
মাওলানা আসাদ বলেন, নিজের ছাত্রদের প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ ছিল। তেম্নি জামিয়া ইমদাদিয়া পরিচালনাও করেছেন অত্যন্ত সুচারু ও বলিষ্ঠতার সাথে। শত কাজে ব্যস্ত থাকতেন, কিন্তু জামিয়া ইমদাদিয়ার পড়াশোনার মান ধরে রাখতে তিনি সতর্ক এবং দায়িত্ববান ছিলেন।
মাওলানা আসাদ জানান, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আল্লামা আনোয়ার শাহ প্রায়ই আফসোস করে বলতেন, মাদরাসাছাত্রদের মধ্যে আদব-আখলাক দিনদিন কমে যাচ্ছে। আগেকার দিনে উসতাদদের প্রতি যে সম্মান, সম্পর্ক এবং সমীহ থাকত ছাত্রদের মধ্যে, যত দিন যাচ্ছে এটা কমে আসছে।
আল্লামা আনোয়ার শাহ প্রাথমিক পড়াশোনা জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জে করলেও দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছিলেন জামিয়া আশরাফিয়া করাচী থেকে। সেখানে হজরত ইউসুফ বানুরি রহ.-এর কাছে বুখারি পড়েছেন। বানুরির দরসে অধিকাংশ সময়ই আল্লামা আনোয়ার শাহ ইবারত পড়তেন। তাঁর কণ্ঠ যেমন চমৎকার ছিল, পড়তেও পারতেন দ্রুততার সাথে। ফলে হজরত বানুরি তাঁকেই ইবারত পড়তে বলতেন। মাওলানা আসাদ বলেন, হুজুর সেই সময়কার একটা স্মৃতিচারণ প্রায়ই করতেন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। তিনি ছাত্রজমানা থেকেই পান খেতেন। ইউসুফ বানুরি জানতেন না তিনি যে পান খান। একদিন তাঁর দরসের সময় তিনি ক্লাসে আসতে দেরি করছেন দেখে আল্লামা আনোয়ার শাহ পান খাওয়ার জন্য বাইরে যান। এমন সময় বানুরিও ক্লাসে চলে আসেন। ক্লাসে এসে আনোয়ার শাহকে না পেয়ে ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেন কোথায় গেছে। এমন সময় আনোয়ার শাহও ক্লাসে প্রবেশ করেন। ইউসুফ বানুরি তাঁর মুখে পান দেখে খুব রাগ করেন, এবং বলেন ইবারত পড়তে। আনোয়ার শাহ রহ. তখন মুখের পান মুখের দুই পাশে রেখে অন্যদিনের চেয়েও দ্রুততার সাথে ইবারত পড়তে শুরু করেন। পুরো দরসে পানের কারণে এবারত পড়তে একটুও বাঁধেনি তাঁর। ইউসুফ বানুরি তখন খুশি হয়ে তাঁকে পান খাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। মাওলানা আসাদ বলেন, পানের প্রসঙ্গ এলে হুজুর প্রায়ই এই স্মৃতিচারণটা করতেন।
ময়মনসিংহের বিশিষ্ট আলেম লেখক মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ আল্লামা আনোয়ার শাহ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেন, আমরা ছোট মানুষ তাঁর সম্পর্কে কী মূল্যায়ন করব! কেবল এতটুকু বলতে পারি, ভারত-পাকিস্তানের নিকট অতীতের যে সমস্ত আকাবির পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তিনি ছিলেন তাঁদের প্রতিচ্ছবি। একই সঙ্গে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের আলেম-ওলামা ও তরুণদেরকেও কাছে টানতে পারতেন। তাঁদের সঙ্গে মাদরাসাশিক্ষা বা অন্য যেকোনো বিষয়ে দিলখোলা মতবিনিময় করতেন। তাঁদের মতামত জানতেন আগ্রহ সহকারে, নিজের চিন্তাও শেয়ার করতেন তাঁদের কাছে। একই সঙ্গে তিনি একজন যুগসচেতন আলেম ছিলেন।
মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ বলেন, বেশ কিছুদিন আগে আমার লিবিয়া সফরে পাকিস্তানের শহিদ আলেম আল্লামা সামিউল হক হক্কানির দীর্ঘ একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি। সেখানে কথাপ্রসঙ্গে আল্লামা আনোয়ার শাহ সম্পর্কে সামিউল হক হক্কানি এতো চমৎকার মূল্যায়ন করেছিলেন যে, আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে আল্লামা আনোয়ার শাহ’র মেধা, প্রত্যুতপন্নমতিত্ব এবং যোগ্যতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন তিনি। আল্লামা সামিউল হক হক্কানির সেই প্রশংসা ও মূল্যায়ন থেকে আল্লামা আনোয়ার শাহ’র নতুন এক রূপ পরিস্ফুট হয়েছিল আমার সামনে।
মাওলানা লাবীব আবদুল্লাহ বলেন, আজ চিরবিদায় জানিয়ে আসলাম আমাদের এই মহান সেরতাজকে। জানাজায় মুসল্লিদের অংশগ্রহণ এবং সবশ্রেণির মানুষের আপ্লুত করা অনুভূতি ছিল বিস্ময়জাগানিয়া। আল্লাহ তাআলা হজরতকে জান্নাতের আলা মাকাম দান করুন।
