আঁধারের আধার যে-বুদ্ধিজীবীরা

আবদুস সাত্তার আইনী

বাংলাদেশে যেসব বুদ্ধিজীবী মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রচারকারী তাঁরা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসারী এবং ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে এক করে দেখতে প্রয়াসী। তাঁরা ইসলামকে মাটির নিচের এবং আসমানের ওপরের বিষয় বলে মনে করেন; পার্থিব জীবনের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক আছে বা থাকা উচিত বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন না। ইসলামি জীবনব্যবস্থার কথা বলা এবং মুসলমান হিসেবে আত্মপরিচয় দেওয়া তাঁদের কাছে ধর্মান্ধতা বা সাম্প্রদায়িকতার নামান্তর। এখন তাঁরা আরো একধাপ এগিয়ে গিয়েছেন; তাঁরা বলতে শুরু করেছেন ইসলামি জীবনব্যবস্থা বা শরীয়া আইন ইসলামেরই বিকৃত রূপ; মূল ইসলামের সাথে এর ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তাঁরা ইসলামি শরীয়ার ওপর বই লিখছেন এবং সেসব বইয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, ইসলামি শরীয়া আইন কখনো ছিলো না পৃথিবীতে এবং ইসলামের মৌল বিশ্বাসের সাথে এর আদৌ সম্পর্ক নেই। কিন্তু সত্য হচ্ছে, এইসব বুদ্ধিজীবী আসলে বিভ্রান্ত কলমদাস এবং ইসলামের সাথে তাঁদের দূরতম সম্পর্কও নেই। যদিও তাঁরা নিজেদের নাম প্রচার করছেন ইসলামপন্থী ও ইসলামের আধুনিক রূপকার বলে। তাঁদের কথায় মনে হবে ইসলামের বিকৃতিতে তাঁরা খুবই মর্মাহত এবং শরীয়া আইন বলে যে জিনিসটা আছে এটাকে পুরোপুরি নিঃশেষ করতে পারলেই তাঁদের মর্মযাতনা কিছুটা কমে।

এইসব বুদ্ধিজীবীকে দেখলে মনে হবে মুসলমান হিসেবে তাঁরা গর্বিত, বিশ্বমুসলিমের কল্যাণ-চিন্তায় তাঁরা ব্যাকুল। তাঁরা হয়তোবা মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন, কিন্তু ইসলামি জীবনব্যবস্থায় তাঁদের কোনো আস্থা নেই; এ-ব্যাপারে তাঁরা উদাসীন। তাঁরা ইসলামের মহিমা প্রচার করেন ঠিকই, কিন্তু ইসলামি মৌলবাদে তাঁদের কোনো বিশ্বাস নেই।

এই উপমহাদেশে এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কি খেলাফতের যখন টলটলায়মান অবস্থা তখন ভারতবর্ষের মুসলমানদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সহানুভূতি উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। অনেক ভারতীয় মুসলমান — এদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীও ছিলেন — যখন হৃত গৌরব আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হয়, তখনও মুসলমানদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা পরিলক্ষিত হয়। বাংলা সাহিত্যে তুর্কি বীরদের গৌরবগাঁথা রচিত হতে থাকে। গোলাম মোস্তফা ‘আদ্রিয়ানোপল-উদ্ধারে’ শিরোনামে কবিতা লেখেন; কাজী নজরুল ইসলাম লেখেন ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার পাশা’ কবিতা; ইব্রাহিম খাঁ লেখেন ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার পাশা’ নাটক। অথচ যে-কামাল পাশার নেতৃত্বে তুর্কিদের বিজয় এলো, নবজাগরণ এলো এবং যাঁর মহিমাপ্রচারে মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা গর্বিত ও উল্লসিত, সেই কামাল পাশা ইসলামের খাদেম ছিলেন না, এমনকি মুসলমানও ছিলেন না। তিনি ইসলামকে `this theology of an immoral Arab’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি খিলাফত উচ্ছেদ করেন, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রবর্তন করেন এবং তুর্কিদের জীবন থেকে ইসলামি রীতিনীতি ও মূল্যবোধ জোরপূর্বক নির্বাসিত করেন। এতোকিছু সত্ত্বেও তাঁকে নিয়ে গর্ব করা হয়েছে এবং আজো এদেশে অনেকে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

পাকিস্তান আন্দোলনের মূলেও ছিলো এই শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের অব্যাহত প্রচেষ্টা। তাঁরা মনে করেছিলেন, মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতি, কারণ তাদের ধর্ম আলাদা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি আলাদা। ইসলামের আলোকে তাদের জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি বিকাশের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমির প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা মুসলমানদের সংঘবদ্ধ করেন, দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং হাজার হাজার প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু এইসব বুদ্ধিজীবী কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করেন নি। তাঁরা পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং ইংরেজঘেঁষা ছিলেন। এমনকি তাঁরা মুসলমানদের অবশ্য করণীয় নামায-রোযার ব্যাপারেও উদাসীন ছিলেন (সৈয়দ আলী আহসান তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের শিলান্যাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন পাকিস্তানের ধর্মমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে রাতের বেলা বাগানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন)। পাকিস্তানে ইসলামি জীবনব্যবস্থার রূপায়ন নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলেমদের বিতর্ক হয়েছে, এমনকি সংঘর্ষ হয়েছে। তাঁরা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে ধর্মত্যাগী হয়ে যান নি; তবে প্রগতির নামে ইসলামের আধুনিকীকরণের কথা বলেছেন।

তবে এ-কথা স্বীকার করতেই হবে যে, মুসলমানদের জাগতিক উন্নতির ক্ষেত্রে এইসব বুদ্ধিজীবীদের অবদান অপরিসীম। ইসলামকে তাঁরা মুসলমানদের স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে পরিচিতি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং সেই স্বতন্ত্র সত্তা আমাদেরকে বর্তমান রাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে তাদের মিল পাওয়া যায়। যদিও পাশ্চাত্য সমাজে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা অনেক আগেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তবু তারা ইহুদিদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা সমর্থন করেছে, সেটা বাস্তবে রূপায়িত করতে সাহায্য করেছে এবং সে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ইহুদিরা যে খুব ধার্মিক তা নয়, তারা যে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে তাও নয়। তাদের রাষ্ট্র মূলত ধর্মনিরপেক্ষ, পাশ্চাত্য আদর্শে গঠিত। কিন্তু তাদের জাতীয়তাবোধের উৎস ধর্ম। ধর্মই তাদের সংঘটিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে, জাতিসত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। ঠিক তেমনি এই উপমহাদেশের মুসলমানদের জাতীয়তাবাদের উৎস ইসলাম। কিন্তু ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামি জীবনব্যবস্থা মেনে চলা হচ্ছে না। প্রগতির নামে, আধুনিকতার নামে পাশ্চাত্য আদর্শ ও ধ্যান-ধারণাকেই অনুসরণ করা হচ্ছে।

কোনো কোনো বুদ্ধিজীবী মনে করেন, ইসলাম আধুনিক পাশ্চাত্য জীবনধারার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামের মূল কথা হলো তাওহিদ — এক আল্লাহতে বিশ্বাস। এক আল্লাহতে বিশ্বাস যে মানুষের জন্য অপরিহার্য, এটা ছাড়া মানবজীবন যে উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে তা মুষ্টিমেয় নাস্তিক ছাড়া আর সবাই স্বীকার করেন। তাওহিদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে কতগুলো মৌলিক মূল্যবোধ– সাম্য, মানবতা, ন্যায়বিচার, ভালোমন্দ ইত্যাদি। এগুলোও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মেনে নিয়েছে। তবে ইসলামে এসবের প্রকাশ ঘটেছে তৎকালীন রীতিনীতি অনুযায়ী। সেসব রীতিনীতি অপরিবর্তনীয় বা অনড় নয়। মহানবীর সুন্নাহ হুবহু মেনে চলা মানে তিনি অনন্তকালের জন্য আমাদের জীবন কীভাবে চলবে সেটা ঠিক করে দিয়ে গেছেন তা মেনে নেওয়া। কিন্তু এ-ধরনের দাবি তিনি করেন নি। তাছাড়া যুগের পরিবর্তন ঘটেছে এবং মানুষের জীবন অনেক জটিল হয়ে পড়েছে। সুতরাং সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগের জীবনব্যবস্থা বর্তমানে নীতি হিসেবে গ্রহণ-অযোগ্য এবং বাস্তবে প্রয়োগ-অযোগ্য। এই জীবনব্যবস্থা যেসব মৌলিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলো অনুসরণ করাই যথেষ্ঠ এবং সে-মৌলিক নীতির সঙ্গে বর্তমান সভ্যতার কোনো বিরোধ নেই। এইসব বুদ্ধিজীবীরা আরো মনে করেন যে, ধর্মের সংজ্ঞা বদলে গেছে। আগে ধর্ম জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করতো; কিন্তু এখন ধর্মের এলাকা সীমিত হয়ে পড়েছে। তাই জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান মানতে হবে এই মতবাদ ঠিক নয়। আমাদের মৌলবাদকে পরিত্যাগ করতে হবে, ধর্মান্ধতা পরিহার করতে হবে।

মুসলিম জাতিসত্তায় বিশ্বাসী এইসব বুদ্ধিজীবী আর ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা ব্যক্তিগত সীমানার বাইরে ধর্মের কথা বলাকে প্রতিক্রিয়াশীলতা মনে করেন, এমনকি রাষ্ট্রনেতাদের পক্ষে জনসভায় ‘ইনশাল্লাহ’ বলাটাও আপত্তিজনক মনে করেন। অন্যদিকে মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আধুনিক বুদ্ধিজীবীরা এতোটা বাড়াবাড়ি না করলেও আধুনিক সভ্যতার প্রায় সবকিছুকে ইসলাম সম্মত মনে করে অনুসরণ করতে আগ্রহী এবং ইসলামের একটা সর্বজনগ্রাহ্য আধুনিক রূপ দিতে বদ্ধপরিকর। ইসলামের এই আধুনিক রূপায়নে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থাকবে; কিন্তু ইসলামি শরীয়া থাকবে না, ইসলামি জীবনব্যবস্থা থাকবে না। এই উভয় শ্রেণীর কাছে ইসলামি মৌলবাদ প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ধর্মান্ধতা; তাই তা পরিত্যাজ্য।

ইসলামি মৌলবাদকে প্রত্যাখান করার কতোগুলো কারণ আছে। অনেকে ইসলামকে অন্যান্য ধর্ম ও মতাদর্শের সঙ্গে এক করে দেখেন। অন্যান্য ধর্মে আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দিকটা প্রাধান্য পেয়েছে। জীবনের বাকি সবকিছু ধর্মবহির্ভূত রাখা হয়েছে; ধর্মকে খণ্ডিত করে দেখা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম সেরকম কোনো ধর্ম নয়। তাছাড়া ধর্ম শব্দটা ইসলামের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় বহন করে না। ধর্ম শব্দের আরবি হচ্ছে ‘মিল্লাহ’। কিন্তু কুরআন-হাদিসের কোথাও ইসলামকে এই নামে অভিহিত করা হয় নি। ইসলামকে সবসময় ‘দীন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ‘দীন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জীবনে চলার জন্য বিশেষ মত ও পথ; অন্য কথায় জীবনবিধান। তাই বর্তমান যুগে ধর্মের এলাকা সীমিত হয়ে পড়েছে বলে যাঁরা মনে করেন তাঁরা ইসলাম সম্বন্ধে মারাত্মক ভুল ধারণা পোষণ করেন। অনেকে আবার অন্যান্য মতাদর্শ যেমন পুঁজিবাদ ও সমাজবাদকে ইসলামি জীবনবিধানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেন। এক সময় মানুষ এ দু’টো মতাদর্শকে গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে আঁকড়ে ধরেছিলো। পুঁজিবাদীরা এই ব্যবস্থার সুযোগসুবিধা পুরোপুরি গ্রহণ করেছে এবং এর পরিবর্তনে প্রবল বিরোধিতা করেছে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের অগ্রগতির ফলে অবস্থার চাপে পড়ে তারা তাদের মতবাদকে কিছুটা শিথিল করতে বাধ্য হয়েছে। তারা নির্ভেজাল পুঁজিবাদে আটকে থাকতে পারে নি। ওয়েলফেয়ার স্টেট-এর ধারণার মধ্যে কিছু সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার স্থান দেওয়া হয়েছে। ফলে পুঁজিবাদীরা আর মৌলবাদী থাকতে পারে নি। অন্যদিকে যারা কমিউনিজমের গোঁড়া সমর্থক ছিলো তারা এক সময় মার্কস ও এঙ্গেলসের মতবাদ অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট গঠনের পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু দেখা গেলো তাদের মতবাদ হুবহু বাস্তবায়িত করা যায় না। সেই মতবাদ কাটছাট করতে হয়। তাই সমাজবাদীরাও মৌলবাদী থাকতে পারে নি। এখন একেক সমাজতান্ত্রিক দেশে একেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যেহেতু উভয় মতবাদের সমর্থকেরা তাঁদের আদি ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা মৌলবাদী থাকতে পারেন নি, তাই যেকোনো মৌলবাদকে আক্রমণ করে মনস্তাত্বিক শান্তি বোধ করেন। ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তাঁরা সাধারণত একটা যুক্তির আশ্রয় নিয়ে থাকেন। সেটা এই যে, ইসলাম এক বিশেষ দেশে এবং ইতিহাসের এক বিশেষ পর্যায়ে প্রবর্তিত হয়েছিলো। সুতরাং এর অনুশাসন ও বিধানাবলি কালচি‎ি‎হ্নত ও অচল হয়ে পড়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ইসলামি অনুশাসনকে সম্পূর্ণ বর্জন করার পক্ষে আর তথাকথিত মুসলিম জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা ইসলামের অনুশাসনের প্রতি কেবল তাঁদের মৌখিক আনুগত্যই প্রকাশ করেন।

নির্ভেজাল পুঁজিবাদ ও নির্ভেজাল সমাজবাদের সঙ্গে ইসলামি মৌলবাদের বড়ো দু’টো পার্থক্য আছে। সমাজবাদ আর পুঁজিবাদ মানবরচিত মতবাদ। এসব মতবাদের যাঁরা প্রবর্তক তাঁরা যতো বুদ্ধিমানই হন না কেনো, যতো প্রতিভাবানই হন না কেনো, তাঁরা মানুষ ছিলেন। কিন্তু ইসলামি জীবনব্যবস্থা কুরআন ও সুন্নাহর ওপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন মানুষের কথা নয়, আল্লাহর বাণী; মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ট নবী এবং গোটা পৃথিবীর জন্য রহমত। তাঁর সুন্নাহ ঐশী বাণীর গুরুত্ব বহন করে। অবশ্য যাঁরা এসব মানতে রাজি নন বা মানেন না তাঁরা মুসলমান নন। তাঁদের সঙ্গে তর্কে অবতীর্ণ না হওয়াই ভালো।

পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ বাস্তবে রূপান্তরিত করতে গিয়ে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সমাজে নির্যাতন বা অন্যায় সংঘটিত হয়েছে এবং কোনো কোনো ধারণা প্রয়োগ-অযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামি জীবনব্যবস্থা ইতিহাসের এক পর্যায়ে হুবহু রূপায়িত হয়েছে, কোনো বিধান অবাস্তব বলে প্রমাণিত হয় নি এবং সমাজের কোনো শ্রেণী কোনো অন্যায় বা নির্যাতনের শিকার হয় নি। যে-শ্রেণীসংগ্রামকে পৃথিবীর ইতিহাসের অগ্রগতির একমাত্র ভিত্তি বলে বিবেচনা করা হয় তার কোনো নজির ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে নেই। সেসময় মানুষ জাগতিক দিক দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে থেকেছে, ভ্রাতৃত্ব-মানবতা-নৈতিকতার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং মানবিক গুণাবলিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

তাঁরা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, ‘কিন্তু সপ্তম শতাব্দীর উপযোগী জীবনবিধান এই একবিংশ শতাব্দীতে কীভাবে প্রযোজ্য হতে পারে? মৌলবাদ কি আমাদেরকে চৌদ্দশ বছর পেছনে ঠেলে দেবে না?’ ইসলামি জীবনবিধান আল্লাহপাকের প্রদত্ত, এই কথা যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁরা এই ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারেন না। আল্লাহ তো কুরআনে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম।’ আল্লাহপাক আরো বলেছেন, ‘মুহাম্মদ সর্বশেষ নবী।’ আল্লাহপাক যুগে যুগে তাঁর বাণী দিয়ে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে সে-বাণী সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো বা সে বাণী বিকৃত হয়েছিলো। কিন্তু কুরআন সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেছেন, ‘আমি এই কিতাব নাযিল করেছি, আমিই একে রক্ষা করবো।’ তিনি যা বলেছেন তাই করেছেন। কুরআন চৌদ্দশ বছর অবিকৃত রয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে বিকৃত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্য কোনো আসমানি কিতাব নাযিল হবে না, আর কোনো নবী আসবেন না এবং ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দীন হিসেবে পাঠানো হয়েছে — এসব কথার একটাই অর্থ হতে পারে। সেটা হলো ইসলামি জীবনবিধান সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। এই জীবনবিধান বর্তমান কালে তার প্রয়োগযোগ্যতা হারিয়েছে–এই কথা ভুল ও ইসলামবিরোধী এবং কুফরির নামান্তর। কিন্তু এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ইসলাম সম্পর্কে কথা বললেও এবং মুসলমানদের কল্যাণচিন্তা করলেও ইসলামের অনুশাসনকে সেকেলে ও বাতিল মনে করছেন। কিন্তু যিনি খাঁটি মুসলমান এবং ইসলামকে চিরন্তন সত্য বলে বিশ্বাস করেন তাঁরা কখনো এই ধরনের চিন্তা করতে পারেন না। কারণ তিনি যদি ইসলামকে সত্য ও চিরন্তন বলেই বিশ্বাস করেন তাহলে তাঁর ভেতরে কোনো ধরনের হীনমন্যতা থাকা উচিত নয়। তিনি যা সত্য বলে বিশ্বাস করেছেন তা আচরণে প্রকাশ করার সৎসাহস থাকতে হবে। তিনি যেখানেই থাকুন, যে পরিস্থিতিতেই থাকুন তিনি যা বিশ্বাস করেন তা প্রকাশ করবেন এবং যা প্রকাশ করেন তা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবেন। কে কী বললো বা কী আচরণ করলো তা তিনি আমলে নেবেন না। তাই যেসব বুদ্ধিজীবী বলেন, কুরআন ও সুন্নাহ-ভিত্তিক অনুশাসন বর্তমান যুগে মেনে চলা অসম্ভব তাঁরা নিঃসন্দেহে হীনমন্য, বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। আসলে পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদেরকে এমনভাবে মোহগ্রস্ত করেছে যে, অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করার কথা ভাবতে আমরা শিউরে উঠি। দুনিয়ার কাছে হাস্যস্পদ হতে হবে বা কারো চোখরাঙানোর শিকার হতে হবে এটাই হয়তো আমাদের ভয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ইসলাম তৎকালীন রীতিনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে এক সম্পূর্ণ নতুন জীবনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলো। স্রোতের বিপরীতে যাত্রা শুরু করে এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন এনেছিলো এবং নতুন সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো।

যখন ইসলামি জীবনব্যবস্থার কথা বলা হয় তখন এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ধারণা করে বসেন যে, এই লোকগুলো ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিবিরোধী। কিন্তু আসল ব্যাপারটা তা নয়। পাশ্চাত্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে অগ্রগতি হয়েছে ইসলাম তার বিরোধী নয়। বরং মুসলমানরাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন। ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে উৎসাহিত করেছে এবং এসব ক্ষেত্রে আরব মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে এর মানে এই নয় যে, আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে ইসলামি জীবনধারা সামঞ্জস্যপূর্ণ। উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এবং বলা যায় তারা পরস্পর বিরোধী।

আধুনিক পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার না করলেও মানুষের পার্থিব জীবনে তাঁর কোনো কর্তৃত্ব স্বীকার করে না এবং পার্থিব জীবনকে একমাত্র সত্য বলে গ্রহণ করে আরাম-আয়েশকেই জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যেখানে আল্লাহর প্রতি কোনো আনুগত্য নেই এবং পরকালের জীবনে কোনো বিশ্বাস নেই, যেখানে মানুষ নিজেই তার ভাগ্যনিয়ন্তা, সেখানে ক্ষমতা-লিপ্সা, লোভ-লালসা, উচ্ছৃংখলতা সীমিত রাখা কঠিন। সেখানে বিভিন্ন মত ও পথের উদ্ভবের ফলে জীবনে নানা বিপর্যয় সৃষ্টি হতে বাধ্য। পাশ্চাত্যে মানুষ তার ভাগ্যনিয়ন্তা হয়েছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ফলে জীবনে সৌষ্ঠব এসেছে, প্রাচুর্য এসেছে, জীবন উপভোগের নানা উপকরণ সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সমাজে বিরোধ ও সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে, অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নৈতিক বোধের অবনতি ঘটেছে। মানুষ জীবনের গভীর অর্থ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে এবং মানসিক প্রশান্তি মরীচিকার মতো সুদূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামি জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দেয় আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আত্মসমর্পণ। একদিন সমস্ত পার্থিব কার্যকলাপের জবাবদিহি করতে হবে এ-বোধ মানুষকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করতে শেখায়। পার্থিব জীবন একমাত্র সত্য নয়–এ-বিশ্বাস বস্তুতান্ত্রিকতার প্রতি মোহকে নিয়ন্ত্রিত করে, মানুষকে নৈতিকতার মহান শিখরে আরোহণ করার প্রেরণা যোগায়। তাই ইসলামি জীবনবিধানের বিকল্প নেই। এবং একটা শাশ্বত আদর্শ। তবে তা বাস্তবায়িত করা সহজ হবে না। এ-পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়; বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ। এ-পথে সংশয় এসে মনকে ঘিরে ধরবে, অন্যান্য মতাদর্শ উদ্দেশ্যহীন ও আধ্যাত্মিকতাবর্জিত জৌলুসপূর্ণ জীবনের দিকে হাতছানি দিয়ে প্রলুব্ধ করবে। এ-অবস্থায় প্রয়োজন কুরআন ও সুন্নাহর ওপর অখণ্ড বিশ্বাস এবং তা অনুসরণের প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি।