শোকরানা মাহফিল করা মন্দ কিছু নয়, এটি কৃতজ্ঞতা আদায়: মুফতি ওয়াক্কাস

ওমর ফারুক

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোর ৬টি বোর্ড নিয়ে গঠিত ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কাওমিয়া বাংলাদেশ’ আগামী ৪ নভেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শোকরানা মাহফিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স (আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ) ডিগ্রি সমমানের স্বীকৃতির কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করছে হাইয়াতুল উলইয়া। মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আল হাইয়াতুল উলইয়ার সভাপতি আল্লামা আহমদ শফীর হাতে আলেম উলামাদের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হবে। তবে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়ার আলোচনা হলেও পরবর্তীতে শুকরানা মাহফিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

দেশের শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে ও পরামর্শক্রমে শোকরানা মাহফিলের আয়োজন করা হলেও কওমি আলেমদের একটি শ্রেণি শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন এ নিয়ে আলেমরা কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ হয়ে পড়েছেন। দেশের অধিকাংশ আলেমরা শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে একমত থাকলেও একটি শ্রেণি মনে করছে শাপলা চত্ত্বরে আলেমদের ওপর ভয়াবহ আগ্রাসন ও আলেমদের রক্তে রঞ্জিত এ সরকারের সঙ্গে আলেমদের এ ঘনিষ্ঠতা মেনে নেওয়া কষ্টকর। আলেমদের একটি শ্রেণি সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

অপরদিকে শোকরানা মাহফিলের আয়োজক কমিটি ও শীর্ষ আলেমরা মনে করছেন, কওমি স্বীকৃতি আলেমদের দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের ফসল। শুকরানা মাহফিলের মাধ্যমে স্বীকৃতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে। রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এ আয়োজন নয়। তবে সরকার যদি এর মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায় এটি তাদের ব্যাপার। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন চাওয়াটা স্বাভাবিক। যেকোনো সরকারই তাদের কাজগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করে থাকেন। বিএনপির হাতে স্বীকৃতি আসলেও তারা এ স্বীকৃতি প্রদানের ফসল ঘরে তুলতে চাইতো। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রশ্ন নয়। এটি আলেম সমাজের প্রাপ্তির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। এরসঙ্গে ৫ মের শাপলা চত্ত¡রের কোনো সম্পর্ক নেই।

আল হাইয়াতুল উলইয়ার ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির অন্যতম সদস্য জমিয়ত-সভাপতি (একাংশ) মুফতি ওয়াক্কাস বলেন, ‘আমরা কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি যেভাবে চেয়েছি সেভাবেই প্রধানমন্ত্রী এর মান দিয়েছেন। এটি আমাদের জন্য বড় একটি প্রাপ্তি। জোট সরকারের আমলেও আমরা এর জন্য আন্দোলন করেছি। কিন্তু এ দাবি আদায় সম্ভব হয়ে উঠেনি। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অল্পদিনের মাঝেই এর বাস্তবায়ন করেছেন। এর বিনিময়ে শুকরানা মাহফিল করা মন্দ কিছু নয়। এটি কৃতজ্ঞতা আদায় করা। হাদীসেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে, যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে সে আল্লাহ পাকেরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।’

সংবর্ধনার পরিবর্তে শুকরানা মাহফিলের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সংবর্ধনার বিষয়টি বড় আকারে দেখানো হয় ও বড় বিষয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু শোকরানা মাহফিলের মাধ্যমে শুধু কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়। এতে অর্থের মাঝেও পার্থক্য রয়েছে মর্মের দিক দিয়েও পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে আমরা শোকরানা মাহফিলটিকেই ভালো মনে করেছি। কারণ এটি ‘নন পলিটিক্যাল’। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী অনেক কিছুকে পাশ কাটিয়ে এ স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার শুকরগুজারি করাই বড় জিনিস।’

যারা এ শোকরানা মাহফিলের বিরোধিতা করছেন তাদের ব্যাপারে মুফতি ওয়াক্কাস বলেন, ‘এরা কোন স্তরের মৌলভী তাদের ব্যাপারে আমার জানার ইচ্ছে। এরাই সবচেয়ে বড় অপরাধী। তাদের কতটুকু অভিজ্ঞতা রয়েছে, যেখানে দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম অনেক চিন্তা ভাবনা করে এটিকে ভালো মনে করছেন? মরহুম আল্লামা আজিজুল হক সাহেব (রহ.) এর জন্য তিন দিন অবস্থান ধর্মঘটও করেছিলেন। আমরা শাপলা চত্ত্বরে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা অবশ্যই জানাই। তবে সে রাতে নন পলিটিক্যাল সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ষড়যন্ত্রেরও শিকার হয়েছিল। তখনও কিছু তরুণ আলেমদের নেতৃত্বের কারণে আমরা সেখানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আজ যখন দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে স্বীকৃতি এলো তারা এখনও বিরোধিতা করছে। আমার ভাষায় আমি তাদেরকেই বড় অপরাধী বলবো। আমাদের কওমি ইতিহাস ঐতিহ্যে নেই বড়দের মুরুব্বীদের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কথা বলে। এটি সিস্টেমের মাঝেও পড়ে না। শুকরানা মাহফিলটিও আল হাইয়াতুল উলইয়ার এটি একাডেমিক বিষয়। এখানে রাজনীতির কোনো গন্ধ নেই।’

শোকরানা মাহফিলে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বলেন, ‘আমাদের সব স্তরের মুরুব্বিরা যেহেতু এ বিষয়ে একমত, সে হিসেবে আমরা মনে করি তারা বুঝে শুনেই এটি করছেন। প্রধানমন্ত্রীও দীর্ঘ দিনের একটি দাবি পূরণ করেছেন। সে হিসেবে একটি শোকরানা মাহফিলের আয়োজন বড় কিছু নয়। এটি করাও যায়। তবে এটি নিয়ে যেন ‘অতি রাজনীতি’ না হয় এ বিষয়টির প্রতিও সতর্ক থাকতে হবে।’