বৃত্তের বৃত্তান্ত—প্রথম যে গৃহত্যাগের গল্প (১) ।। আহমদ রফিক

আহমদ রফিক

এমন এক শীত-শীত রাতে আমি প্রথম হেফজখানায় এসেছিলাম। এর আগের দিন ক্লাস শেষে কুরআন শরিফে চুমু খাচ্ছি পরম আদরে। আর একটা ভরাট কণ্ঠস্বর একই সাথে মমতা ও শাসনের প্রতাপ নিয়ে কানে এসে পড়ছে—‘কাল থেকে ফজরের আজানের আগে আসবা, ঠিক আছে?’ কণ্ঠস্বরটি শোনামাত্র চিন্তায় পড়ে গেলেও  ‘হুজুরের কথা, পাইপাই করে মানতে হবে’—এমন পবিত্র বিশ্বাস নিয়েই বেড়ে ওঠা আমাদের লিকলিকে বয়সে। হুজুরগণ যে আমাদের জীবনে  একেকজন কোনো স্বর্গীয়দূত হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন, সে বিশ্বাস  বোধিতে-মানসে গেঁথে গিয়েছিলো। ফলে ‘আজানের আগে আসতে হবে’ কথাটা সেইদিন রাত্রে এক দিঘল দুশ্চিন্তা হয়ে করোটির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লেগেছে। এর ন্যায়সঙ্গত একটা কারণ, অত সকালে আমি কোনো দিনই রাস্তায় বের হইনি; এর উপর, শিশু মনে তখন ছেলেধরা-ছেলেধরা একটা খেয়াল প্রায়শই উঁকিঝুঁকি মারতো। গলি ছেঁড়ে যখনই একটু মেইন রোডে হাঁটতাম, মানুষের প্রতিটা চোখে সেই ভয়টাকে ফলাতে চেষ্টা করতাম।

বলা বাহুল্য, ভয় আমার সেই এখনো কাটেনি; জয়দেবপুর জংশনে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাপারে এ তথ্যটি আবিষ্কার করেছি এই সেদিনই। রেললাইনের আশেপাশে  প্রতিটা চোখের মতো শৈশবের দিনগুলোতেও আমি মানুষ ভয় পেতাম। নষ্ট চেইনে হাঁ-করা স্কুল ব্যাগ নিয়ে যখন মক্তবে আসতে শুরু করি তখন যেমন, আরেকটু বড় হয়ে যখন অন্যান্য ছেলেপিলেদের সাথে একসাথে আসা-যাওয়া করি তখনো তেমন মানুষের ভয় আমার পিছু ছাড়েনি কোনো দিন। সে রাতে তাই ভয় ধরে গিয়েছিলো খুব। কাকে বলবো অত সকাল-সকাল, ভোরে-ভোরে আমাকে মাদরাসায় দিয়ে আসতে? এমনিতেই ঢাকা যে ভয়ঙ্কর শহর! রাতের আঁধারে কী না কী হয় বলা যায়! তাছাড়া মা গৃহস্থের মানুষ। অতটা সাহস কী করে করেন!

ভোর চারটার দিকে কুরআন হেফজের জন্য আমার সেই প্রথম  গৃহত্যাগ। বিল্ডিংগুলো জিরাফের মতো গলা উঁচু করে  দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। মানুষের কোলাহল এ শেষ রাতে যে কই উবে গেলো, কোথাও টু শব্দটি পর্যন্ত হয় না। ঢাকার ছোটছোট গলির মাথায় কুকুর জেগে থাকার  এক প্রাচীন রেওয়াজ আছে। এবেলায় তারও কোনো হদিস-পাত্তা নেই। নেড়ির দল কোথায় শীতে কাঁপছে কে জানে! অন্ধকারে আমি মা-র হাত ধরে গলির পর গলি পেরিয়ে যাচ্ছি। দশ বারো মিনিটের পথ, অথচ যে কটা গলি-ঘুপচির মোড় হয়েছি টালি অফিস থেকে শেরেবাংলা  রোডের ওই রাস্তাটিতে আসতে, তাতে মনে হয় মুলুক পেরুচ্ছি।

আমি মাদরাসায় ঢুকে গেছি। মা বাইরে দুশ্চিন্তা করছেন খুব। আসতে আসতে না হয় ছেলে সঙ্গে ছিলো। ভয়টয় কম লেগেছে। এবার যাওয়ার কী হবে—ভেবে মা ভয়ে ধুকধুক করছেন। অন্ধকার গুটিগুটি পা ফেলে বাসার দিকে ফিরতে শুরু করেছেন। মুখে দুরুদ-কালাম। এই শীতেও অনবরত ঘন ঘন নিশ্বাস উঠছে গলা থেকে। ততক্ষণে সিঁড়ি ভেঙে চারতলা উঠে একটি বালক আজানের আগে পৌঁছুতে পারার আনন্দে গলা ছেঁড়ে পাঠ করছে—‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজি-ম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহি-ম। হা-মি-ম…’

সে রাতে মা কীভাবে পৌঁছুলো, সে নিয়ে আর মার সঙ্গে কথা হয়নি কোনো দিন। গত কয়েকদিন আগে কী প্রসঙ্গে যেন গল্পগুলো জেগে উঠলো। মা তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে দূরের কী যেন দেখতে চাচ্ছেন। দেখতে দেখতেই একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন—‘একটা ছেলেকে মাদরাসায় পড়ানো মানুষ যতটা সহজ ভাবে, ততটা সহজ না!’

আমার করোটিতে এসে বাঁধে মার একটা দীর্ঘ স্বপ্ন আছে। মা সেই স্বপ্নের আড়াল থেকেই এসব কথা বলেন। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দূরে কী যেন দেখতে চান। স্বপ্নের উপকরণগুলো আমার নখদর্পণে সুস্পষ্ট, তবে পৃথিবীর বাজারে ওসব খুব দামে বিকোয় না। সেজন্য কেবল পরকালেই ও দিয়ে মা স্বপ্ন দেখতেন একটা নূরের মুকুট মা-র কোল আলো করে দিয়ে পৃথিবীর চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। মানুষেরা প্রবল ঈর্ষায় মা-র দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আর মা  হাসছেন। ছেলেকে মাদরাসায় দিয়ে মা কোনো দিনই আড়ম্বরতার স্বপ্ন দেখেননি, মনে করি। হরহামেশাই তো দেখে এসেছেন, পৈতৃক মৌরাস ছাড়া আমাদের জীবনযাপন খুব যে একটা আড়ম্বরতার না। তবু প্রতিদিন মাদরাসায় যাওয়ার আগে মা মাথায় এমনভাবে টুপিটা পরিয়ে দিতেন, যেন অনায়াসেই একটা রাজমুকুট আমার মাথায় খেটে যাচ্ছে। প্রায়শই মা-র মুখে একটা বাক্য তখন শুনতাম খুব—‘আম্মুর  জন্য দোয়া করবা সবসময়।’ দোয়া যে এখনো চান না, তা না; কিন্তু সেসময় যেহেতু আমার চেতনার অঙ্কুর উঠছে, তাই ওই সময়কার দোয়া চাওয়া আমাকে এই মাদরাসা-জীবনের কাছে আকাল নত করে রেখেছে ।

তখন  আমরা থাকতাম চরকঘাটার ওইদিকে একটা তিনতলা বাসায়। আমাদের থাকার বিল্ডিং আর একই ডিজাইনের পাশের তেতলা বিল্ডিংয়ের মাঝে ছিলো খেলার মাঠ। মনে পড়ে, বিকাল তিনটায় সূর্যের যখন  ঘুম পেতো, ছোটছোট ছেলেপিলেরা বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে মাঠে চলে আসতো, বড়রা আসতে আসতে  আরেকটু বিকাল হয়ে যেতো। তাদের কারো সাথেই আমার গলায় গলায়  সখ্যতা ছিলো না। বোধকরি প্রত্যহ খেলাধুলার সূত্রে সহসাই একটা সখ্যদ গড়ে ওঠার কথা ছিলো। হয়নি, আমার ভাগ্যে ওসব সখ্যটক্ষ কিছুই হয়নি আর! হয়নি বলেই কি আমার মাদরাসার জীবনে আটকে পড়া, নাকি মা-র অবিচলতা আর দৃঢ়তার সামনে অন্য জীবন চিন্তা করার সাহসই ছিলো না আমার?

(চলবে…)

লেখক : গদ্যকার