ভাষার শুদ্ধিপ্রচেষ্টা : একজন আতরাফের আলাপ

তুহিন খান

ভাষার ভিতরে নানা রকমের ‘শুদ্ধতাবাদী’ প্রজেক্ট চালু হওয়ার লিগ্যাসি পুরান। আ-মরি বাঙলাভাষাও তার ব্যতিক্রম না। সময়ে সময়ে নানান রকমের ‘শুদ্ধতাবাদী’ প্রজেক্ট বাঙলাভাষায়ও চালু হইছিলো। ধরেন, উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়ামের ইংরাজ-বামুন পণ্ডিতদের হাতে চালু হওয়া ‘শুদ্ধ বাঙলা’-র প্রজেক্ট। এই লেখায় আমরা বাঙলাভাষায় অধুনা চালু এবং বেশ প্রভাবশালী একধরনের ‘শুদ্ধতাবাদী’ প্রজেক্ট নিয়া আলাপ করব।

‘রমজান’, ‘মোবারক’, ‘ওজু’, ‘নামাজ’, ‘রোজা’র বদলে ‘রামাদান’, ‘মুবারাক’, ‘উদু’, ‘স্বলাহ’, ‘সাওম/সিয়াম’ এই ধরনের মূলানুগ ‘শুদ্ধ’ শব্দ চালু করার একধরনের শুদ্ধিপ্রবণতা ইদানীং বেশ লক্ষণীয়। এই প্রবণতা কাদের, ভাষাতত্ত্বের বিবেচনায় আমরা তাদেরে কী নামে ডাকবো, এই প্রবণতার পিছনের রাজনৈতিক অর্থনীতিগুলা কী কী, ধর্ম না রাজনীতি নাকি সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন এই প্রবণতার নেপথ্যে মূল—তা অনেক লম্বা আলাপ। আপাতত, মোটাদাগে এই প্রবণতার দুইটা দিক নিয়া আলাপ করব আমরা। তাতে উপরের প্রশ্নগুলার উত্তর না পাওয়া গেলেও, কিছু আভাস-ইঙ্গিত হয়তো পাওয়া যাইতে পারে। খোদা ভরসা।

প্রথম আলাপ এই যে, এই প্রবণতাটা এজমালিভাবে একটা সালাফিস্ট প্রবণতা, যেইটা মূলত ‘থিংক গ্লোবালি এক্ট লোকালি’র বদলে ‘থিংক লোকালি এক্ট গ্লোবালি’ চিন্তায় বিশ্বাসী। এদের চিন্তার ক্ষেত্র এই উপমহাদেশই, বসবাস ও জীবনাচারণও এই ভূমিতেই; কিন্তু কাজেকর্মে বিশ্বজোড়া পাঠশালার ছাত্র উনারা। বাঙলাদেশে সালাফি-ইসলাম মূলতই ধর্মের একটা এলিট ভার্শনরে প্রমোট করে; এইটা ক্ষেত্রবিশেষে কখনও পরম ‘মোডারেট’, আবার কখনও চরম ‘উগ্র’। । সমাজের নীচতলার আতরাফের লগে তার যোগ নাই; বরং এই ইসলাম মূলতই নেট-ইউটিউব-লেকচার-ভিত্তিক একটা আরবান ফেনোমেনা। হলি আর্টিজানের ঘটনায় জড়িতদের দিকে তাকাইলে এই আলাপটার গভীরে ঢোকা যাবে।

এই ইসলামের একটা মৌল প্রবণতা হইলো ‘শুদ্ধতাবাদ’। এই টেক্সটপন্থী শুদ্ধতাবাদরে একসময় এনলাইটেনমেন্টের আলোয় ঝলসানো বিজ্ঞানমনস্করা সাপোর্ট করছেন, ধর্মের অন্যান্য নানান ফেনোমেনারে ‘অবৈজ্ঞানিক’, ‘কুসংস্কার’ ইত্যাদি বলছেন। ‘লালসালু’ দ্রষ্টব্য। কিন্তু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহদেরই পরবর্তী প্রজন্ম সেই আলো-ঝলসানো এনলাইটেনমেন্টে আর থাকেন নাই, তারা বরং ‘লালসালু’ পীরদেরই ‘সত্যিকারের মুসলিম’ এবং আধ্যাত্মবাদী ইসলামরে এদেশে ইসলামের মূলধারা হিশাবে প্রচার করতে আগ্রহী (জাকির তালুকদারের ‘মুসলমানমঙ্গল’ দ্রষ্টব্য)। যা হোক, আকিদা, ফেকাহ, শরিয়তের গণ্ডি পেরোয়ে এই শুদ্ধতাবাদ এখন ভাষারেও প্রভাবিত করা শুরু করছে। সমাজে শুদ্ধ হইতে চাওয়া, এলিট হইতে চাওয়ার একটা বাসনা, সংস্কৃত পণ্ডিতদের মতো, এনাদের মধ্যেও অবচেতনে ক্রিয়াশীল। ফলে, বাঙলাভাষায় আরবি-ফারসি শব্দগুলারে কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় ক্ষ্যাত/আতরাফ বানায়া দেওয়া হইছে, যেমন ‘রমজান’ বা ‘মোবারক’, এগুলারে এরাও ক্ষ্যাত/আতরাফ ভাবেন, তার বিপরীতে ‘রামাদান’/‘মুবারাক’ ইউজ করেন। তাতে লাভ? লাভ আছে।

মধ্যপ্রাচ্য তো এই গরিব উপমহাদেশের জন্যে এমনেই একটা এলিট জায়গা, নানান দিক দিয়াই। তার উপরে ইন্টেলেকচুয়াল এরেনায় মধ্যপ্রাচ্যের লগে ভালো কানেকশন ঘইটা গেছে এদেশের তরুণ ইন্টেলেকচুয়ালদের, মূলত ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান এবং তাদের চিন্তাবলয়ের লোকজনের মাধ্যমে। আমরা তালাল আসাদ/অ্যাডওয়ার্ড সাইদদের প্রতি আগ্রহী হইছি।; এবং, তাদের পাশে রামাদান বুতি/তারিক রামাদান জায়গা তো পানই হালকাপাতলা। তো, এই যে ‘রামাদান বুতি’, মধ্যপ্রাচ্যের একজন ইন্টেলেকচুয়াল, তার নামের ভিতরে একটা এলিট ভাব তো আছেই! রমজান বুতি কইলে থাকে নাকি! অত থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যের ভিতরে, এরাবিকের ভিতরেও যে এলিট গ্লামার আছে, তা সেই বিংশ শতকের গোড়ায় অশিক্ষিত মোসলমানরা টের পায় নাই। ৯/১১-এর পরে, ইসলামের যে গ্লোবাল উত্থান, আর ২০১৩-র পরে এই দেশে ইসলাম আর সেক্যুলারিজমের যে ডিকন্সট্রাকশন, সেই প্রেক্ষাপটে বইসা এই দেশের আধুনিক আরবান তরুণ দেখে যে, এরাবিকের গ্লোবাল ডিমান্ড, গ্লামার বা মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টেলেকচুয়াল গ্লামার তো ম্যালা! ফলে, বাঙলার কাদাডোবা গ্রামের ‘রমজান’-এর বদলে, সিরিয়ার ‘রামাদান’-রেই তার কাছে বেশি এলিট লাগে। এই এলিটিপনা বাঙলার আতরাফদের বিপক্ষে যায়। ক্লাশ/শ্রেণির ভাষাগত ঘৃণা তৈয়ার হয়। সেক্যুলাররা যেমন ‘রমজান’, ‘কুদ্দুস’, ‘মোবারক’, ‘আবুল’ লইয়া হাসাহাসি করে, এগুলার ক্লাশ নামাইয়া দিছে, সেইরকম এই ‘রামাদান’-ওয়ালারাও এগুলার ক্লাশ নামাইয়া দেয়। গরিব মোসলমান আর বাঙলা ভাষা দুই-ই মাইর খায়, একদিকে কোলকাতাজীবী সেক্যুলারগো কাছে, আরেকদিকে মধ্যপ্রাচ্যজীবী সালাফিগো কাছে।

দ্বিতীয় আলাপটা হইল, এই প্রবণতা ইসলামের একটা একক গ্লোবাল ফর্মের কথা কয়, ইসলামের একটা মনোলিথিক ধারণার কথা কয়, যা মূলত অবাস্তব। সেই মনোলিথিক ধারণারে পোক্ত করার জন্য তারা শরিয়া পার হয়া ভাষার ভিতরেও একটা ‘ইসলামি ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এনারা তাজাদ্দুদ করতে করতে এখন ভাষার কমন যে ফর্ম ও স্বভাব, তারেও তাজাদ্দুদ কইরা শুদ্ধ ইসলামি করতে চায়। এই উপমহাদেশে এলেম আর আমলের যে গৌরবের কাল, মোগল আমল বা দেওবন্দের কাল, সেই সময়ই তো এই শব্দগুলা এদেশে চালু হইছে, এই নামাজ, রোজা, তারাবি, ওজু; তারাই তো পারেন নাই কোনো একক গ্লোবাল ইসলাম তৈয়ার করতে, কোনো শুদ্ধতাবাদ চালু করতে; বলা ভালো, তারা সেই চেষ্টাই করেন নাই; বরং, তারা ছিলেন ‘থিংক গ্লোবালি এক্ট লোকালি’র যোগ্য উদাহরণ। শাহ ওয়ালিউল্লাহ, আহমদ বেরলভি, তিতুমির—সকলেই আরব থিকা এলেম নিছেন, বাট সেইটারে বাস্তবায়ন করছেন লোকাল পন্থায়। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবি প্রথম কোরান শরিফ ফারসিতে অনুবাদ করেন, অথচ তার এলেমি রুট আরবেই। তার মানে, ওনারা ইসলামরে কোন মনোলিথিক ব্যাপার বা কোনো গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ ভাবতেন না। এই প্রবণতা এদেশের মেইনস্ট্রিম আলেমসমাজের ভিতরেও অতীতে ছিলো না, এখনও তেমন নাই বললেই চলে; বরং, এখনও এদেশের আলেমসমাজ আরবি শব্দের দ্বিবচনে ‘কিতাবানি’-এর জায়গায় ‘কিতাবানে’ কইতেই ভালোবাসেন। উপমাস্বরুপ কথাটা বললাম যে, এদেশের আলেমরা কখনোই ভাষার মধ্যে এই ধরনের মাখরাজ, উচ্চারণ ও ফর্মের তাজাদ্দুদরে দ্বীনের এত আহাম ফেনোমেনা বানান নাই। এই প্রবণতা এদেশের মেইনস্ট্রিম আলেমসমাজের প্রবণতাও না।

সো, গ্লোবাল ইসলামের এই চিন্তা একটা ইউটোপিয়া। সেইখান থিকা শুদ্ধতাবাদী কর্মকাণ্ড করতে গেলে বাঙালির তো ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে! এই শুদ্ধতাবাদের দোহাইয়েই উনিশ শতকে আরবি-ফারসিবহুল নবাবি বাঙলাভাষার স্বাভাবিকতারে ব্যাহত করছিলো সংস্কৃত পণ্ডিতেরা; ৫০-৬০ বছর পরে হইলেও তার রিঅ্যাকশন হইছে; পাকিস্তান ভাগ তো খালি ধর্মের ভিত্তিতে ভৌগোলিক ভাগ ছিলো না, সেইটার পিছনে ভাষা আর সাংস্কৃতিক রাজনীতির যে বিপুল প্রণোদনা ছিলো, তা ভুলি কেমনে! উনিশ শতকের সেই শুদ্ধ বাঙলার প্রজেক্টও পাকিস্তান ভাগের নেপথ্যে কাজ করছে। ঠিক যেমন ভাষার এই শুদ্ধিপ্রচেষ্টা পাকিস্তান আমলেও ব্যাকফায়ার করছে, বাঙলাদেশের জন্মের বীজ বপন হইলো তো ৫২’-তেই; এখন এই শুদ্ধতাবাদ চাপাইয়া দিতে চাইলে সেইটা আবারও ব্যাকফায়ার করবে। ভয়ানক ব্যাপার, অনেকে এগুলারে দ্বীন-ধর্মের অংশও ভাবেন! ওনারা ভাবেন, এইসব শুদ্ধির মাধ্যমে ওনারা ভাষার ভিতরে ইসলামি ভাব আনবেন। কিন্তু, ভাষার ভিতরে এই ভাব পয়দা হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে, জনগণের মর্জিতে, তাদের জীবনযাত্রার স্বাভাবিকতার ভিতর দিয়া, চাপাইয়া চুপাইয়া না। এবং অবশ্যই, শুদ্ধতাবাদের পন্থায় না। বাঙলাভাষা কখনোই শুদ্ধতাবাদরে নেয় নাই। না সে নিছে ফোর্ট উইলিয়ামের বাঙলা, না নিছে এর প্রতিক্রিয়ায় তৈরি ফররুখ-নজরুলদের ‘মোছলমানী বাঙলা’। বাঙলাভাষা প্রাকৃতভাষা, এর জন্ম প্রকৃতিতে, গণমানুশের মুখে। ফলে এইসব দ্বীন/ধর্ম বা যে কোনো নাম নিয়া করা এই শুদ্ধতাবাদী ফুজুল প্রজেক্ট ব্যাকফায়ার কইরা শেষমেশ, যা কিছু বাঙলার মোসলমানের ঐতিহ্য ছিল তারেও ভাষা থিকা খেদাইয়া দিয়া একেবারে খাঁটি কোলকাতা নিয়া আসে, এলিটিজম নিয়া আসে। ভাষা-রাজনীতির এই জটিল সমীকরণ সাধারণভাবে বাঙলার এবং বিশেষভাবে কওমির নতুন প্রজন্মের মাথায় রাখা লাগবে।

লেখক : কবি ও ক্রিটিক