ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না।। আফিফা মারজানা

আফিফা মারজানা

এমনই এক কদমফোটা বরষার দিনে চার বছরের আমার  হঠাৎ করেই কদমফুলের শখ জাগলো। সারাদিন কেঁদেকেটে মান-অভিমান করার পর আমার রাশভারী পিতাজি মই লাগিয়ে গোসলখানার টিনের চালায়  চড়ে লম্বা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পেড়ে দিলেন কদমফুল। সূর্যের মতো কদমফুল। একগুচ্ছ কদম তখন আমার কী কাজে এসেছিলো, তা এখন আর মনে পড়ে না—তবে রাজার ধন পাবার মতো আনন্দ পেয়েছিলাম, সে বেশ মনে আছে এখনো।  সেই প্রথম ফুল চিনেছিলাম। হয়তো তখনই ফুলের ভালোবাসার বীজ বুনেছিলো হৃদয়।

আমি শহরে মানুষ। তবে তখনকার শহরগুলোও মানুষ ছিলো। এখনকার মত ইট-পাথরের জঞ্জাল ছিলো না। শহরে থেকেও  কদম-কৃষ্ণচূঁড়া হিজল-বকুলের ছায়ায় বেড়ে ওঠার সৌভাগ্য হয়েছে বলে আমি দয়াময়ের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার শৈশবে ঘড়ির কাঁটা ধরে ঋতু বদল হতো। ঋতুরা তখন এখনকার মতো মনভুলো ছিলো না। ঠিকঠাক এসে পড়তো সময় মতোই।  ছয় ঋতুর প্রত্যেকটা আলাদা করে চেনা যেতো আকাশ দেখে, বাতাসে নাক ডুবিয়ে। ঋতুরাজ  বসন্ত আসতো রাজার মতোই—পাগলা হাওয়ার পিঠে চড়ে, পথের দুধারে বাহারি ফুল ছিটিয়ে, আর খুশবু ছড়িয়ে । বসন্ত এলে আমার পিঠেও যেনো দুখানা পাখনা গজিয়ে যেতো। চারদিকে প্রজাপতির মেলা। বুনোফুলের গন্ধে যখন চারপাশ মৌ মৌ করতো, আমি গৃহছাড়া হয়ে পড়তাম।

দীর্ঘ দিবসের ক্লান্তি  যখন আম্মুকে কাবু করে ফেলতো, সেই আগুনঝরা দুপুরে তিনি ঘুমাতে যেতেন আমাকে পাশে নিয়ে,  আঁচলে আলগোছে বেঁধে দিতেন আমার কবজি। আমি চুপ করে চোখ বুজে অপেক্ষায় থাকতাম তার ঘুমিয়ে পড়ার। আমাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে যখন টুপ করে ঘুমিয়ে পড়তেন নিজেই, তখন আমি উঠে পড়তাম। মাঠের প্রজাপতি আর ফুলেরা আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে, আমার কী সাধ্য ঘরে থাকার! হাতে বাঁধা মায়ের শাড়ির আঁচল খসিয়ে পা টিপে টিপে চেয়ার টেনে দরজার ছিটকিনিটা খুলে ছুটে যেতাম সে আকর্ষণে।

আজও বসন্ত বাতাসে আমি যেন বুনোফুলের গন্ধ পাই। এখনও শৈশবের সে একলা দুপুর আমায় টানে। চোখ বুজলেই ফড়িংয়ের সাথে লুকোচুরি খেলা সে সময় আমার সামনে হেসে ওঠে।

দুই

একদিন পাশের পাড়ায় বেড়াতে গিয়ে  চারটে গাঁদাফুলের গাছ নিয়ে এলাম। আধ বিঘত পরিমাণ বড় সেই চারাগাছ লাগালাম বড় আয়োজন করে। সারা বিকেল কাদামাটি মেখে মায়ের বকুনি খেয়েও মন খারাপ হলো না সেদিন।  সারারাত মন পড়ে রইলো গাছের গোড়ায়। সকাল হতেই চোখ কচলে দেখতে গেলাম গাছ কত বড় হয়েছে! ফুল ফুটলো কি না!  বাসার সবাই মুখ টিপে হাসে। আম্মু বলে, ওরে বোকা মেয়ে, একদিনেই কি গাছ বড় হয়ে যায়! ফুল ফোটে!  আমার মন খারাপ হয়।

তবু সকাল-বিকাল নিয়ম করে গাছে পানি দিই। রোজ মোড়া পেতে বসে থাকি। শুকনো, মরা পাতা খুঁজে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। গোড়ার মাটি উল্টেপাল্টে দিই, ইট-কাঁকড় বেছে ফেলে দিই।  আমার অনুভবের বাইরে থেকেই ওরা একটু একটু করে বড় হয়। পাতারা বাড়ে, ডালপালা ছড়ায় আর বাড়ে আমার ফুলের জন্য অস্থিরতা। গাছের ভাঁজে ভাঁজে চোখ দুটো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মতো করে খোঁজ করি, কুঁড়ির কোনো আভাস মেলে কি না!

প্রতিদিন হতাশ হই। তারপর একসময় আবিষ্কার করি, এ গাছের পাতা থেকেও ফুলের গন্ধ আসে! আমি খুশি হয়ে যাই। রোজ একটা করে পাতা ছিঁড়ি আর ঘ্রাণ নিই, আর মহা উৎসাহে সবাইকে এই অবাক-করা সংবাদ দিই। ছোটরা চমৎকৃত হয়। বড়রা মুখ টিপে হাসে আর অবাক হবার ভান করে। আমি গৌরববোধ করি…

এক দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে জানলাম—কাল আমরা নানাবাড়ি যাচ্ছি। খুশিতে মন আত্মহারা হয়ে গেলো। সেদিন দীর্ঘ সময় ধরে গাছের যত্ন নিলাম। পরদিন যাবার সময় বেশ করে পানি ঢাললাম গাঁদা গাছের গায়ে। মনটা একটু খারাপ লাগলো।

সেবার বেশ দীর্ঘ সময় নানাবাড়ি থাকা হলো, প্রায় দেড় মাসের মতো। প্রথম কয়েকদিন সবার সাথে গল্প করে গাছের কথা বলেছিলাম। তারপর ভুলেই গেলাম। সেই সাত-আট বছর বয়সের  দুরন্ত সময়ে নানাবাড়িতে হাজারও ব্যস্ততায় ডুবে থাকি সারাদিন। খেলাঘর বানানো, রান্নাখেলা, পুকুরে ডুবসাঁতার, গাছে চড়া, বিকেলে কানামাছি-বৌছি খেলা বা লতার দোলনার দুলুনিতে কোথায় হারিয়ে গেলো গাছ আর ফুলের স্বপ্ন! রাতে নানিজানের কাছে ইউসুফ-নুহ আর ইসমাইল আ.-এর রোমাঞ্চকর কাহিনি শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। নানিজানের কোলের ভেতর সেঁটে ঘুমিয়ে পড়তাম হারিকেন না নেভানোর অনুরোধ করে।

দেড় মাস পরে চোখের পানি ফেলে মুখ হাঁড়ির মতো করে বরিশাল এলাম। রিকশা থেকে নেমে  গেট পেরুতেই আমার কলজে ধড়াস করে উঠলো। আমি বিস্ময়ে ওখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম! সেই আধহাত রেখে যাওয়া গাছগুলো আমার বুকসমান হয়ে গেছে—কী কান্ড! আমি ভুললেও তারা ফুল ফোটাতে ভুল করেনি। চারটে গাছে ফুলের এত আয়োজন, পাতা দেখাই যাচ্ছিলো না প্রায়—ফুল আর ফুল! আম্মু আব্বু আমার অবস্থা দেখে হাসেন। আমার চোখে তখন পানি। সেই থেকে ফুলের সাথে আমার মন গেঁথে গেলো। গাছ লাগানোর ভিটেটা একটু বড় আর উঁচু করলাম—রোজ দুপুরে গোসলের আগে কর্দমাক্ত হয়ে।

সেই শীতের দিনে আমাকে গোসল করাতে গিয়ে আম্মু মেজাজ চড়ে যেতো। তাতে কী, তত দিনে আমি বেশ বড় হয়ে গেছি। বরিশালের সেরা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি কোনো কোচিং-টিউশনি ছাড়াই। খামখেয়ালি আমাকে দিয়ে এটা কেউ আশা করেনি। তাই বড় বড় ভাব এসে গেছে। একটু গর্বও। আসলে ওই স্কুলে পড়াটা তখন গর্বের ব্যাপারই ছিলো। এখনো।

(চলবে)

লেখক :গল্পকার