এলোমেলো কথাদের ভাসান।। মাজিদা রিফা

মাজিদা রিফা

স্কুলটা ছিল শহরের ঠিক বুকের ওপর। আমরা ছিলাম পাঠ্যসূচির তাল লয়ে দিশেহারা। আমরা ছিলাম লাস্টবেঞ্চি। আমাদের নারীর রচনা লিখতে বলা হলো। আমরা ভড়কে গেলাম। আমাদের ধারণা ছিলো—সবার প্রথমে জন্ম নিয়েছে পুরুষ, তাই আমরা পুরুষের রচনা শিখে এসেছি। আমরা কলম কামড়ে ধরলাম।  আমাদের পাশে ছিলো একটি বিড়ালশিশু। সে মোটা মোটা গোটা গোটা হরফে লিখলো—‘নারী মানে আম্মা—সমস্ত আকাশ।’

সুলেমান ওর খাতাটা ছিনিয়ে নিয়ে জোরে জোরে পড়লে আমরা হেসে ওঠলাম। ‘হা হা, কী বোকার হদ্দ, নারী মানে আম্মা!’

রফিক স্যার হুংকার ছাড়লেন—‘সাইলেন্ট!’

আমরা চুপ হয়ে গেলাম।

আমাদের কলম ঝিলকি দিলো—‘নারী মানে অনেক কিছু। চুলে তেল, চোখে জল, ছলছল কবিতা। নারী প্রেমও হয়। প্রচুর হয়। প্রায় প্রতিটা ঘরেই একটা মাশুকা তরুণী আছে। কী অসহ্য সুন্দরে উজ্জ্বল! প্রতিভা কমই হয়। নাকেসাতুল আকল।’

বিশ্রী-দেখতে রাজিয়া হাজিবাড়ির মেয়ে। সে লিখলো—‘হাজিবাড়িতে অনেক মেয়ে। হাজির অনেকগুলি কন্যা। হাজির চেয়ে বেশি প্রতিবেশী পেরেশান। প্রতিবেশীর ঘুম নেই, যার বিয়ে তার খবর নেই। কন্যারা সাজগোজ করে, আড়ালে আবডালে কাঁদে। ব্যস, নারী মানে কান্না—ফ্যাচফ্যাচ, ঘ্যানঘ্যান, যন্ত্রণা! নারী হাপিত্যেস, ধাড়ি মেয়ে, বিয়ে হবে কবে? কত পুরুষ দেখলো, চুলগুলো লালচে, নাকটা বোঁচা, ছি ছি মুখখানা কালচে! সুন্দরী?—সে তো আরও বিপদ, না বাবা, কত পুরুষ ছুঁয়েছে, কে জানে!’

সাহিত্যমনা সুমন লিখলো—‘আহা, নারী উর্বশী, চিত্তরঞ্জনা।’

ফেইক মৌলভির পুত্র উসমান। সে লিখলো—‘নারী মাসনা, নারী সুলাসা, নারী রুবাআ। তবে হ্যাঁ, নারী নাকি কারও কারও বউও হয়।’

সৌম বললো—‘আরে, বউ নয়, ‘বাঁদি’। দেবরের জামা কাঁচো, ননদের হাতপাখা, শাশুড়ির চুল টানো, শ্বশুরের পা ছুঁয়ে সালাম—বাবা!’

উসমান লিখলো—‘নারী মানে, নারী চুম্বনে পদাঘাতে। নারী বুকে, নারী চোখে; এক চোখে রক্ত, এক চোখে জল। নারী পুরুষবেশী ভরা চাঁদের পাশে নিভুনিভু নক্ষত্রদঙ্গল। নারী শয়তানের বন্দুক, অশরীরী।

নারী অপরাধী, তবু—নারীই প্রহরী। নারী জন্মায়। জন্ম দেয়। বারবার। দুপুরের আকাশ, সন্ধ্যার মাটি-জল ছুঁয়ে নারী শিশুর আম্মা হয়ে বয়সের গরাদে নারী হয় অপচয়। নারী বৃদ্ধাশ্রম।’

আমরা লিখলাম—‘ছবি বলে, নারী হাঁড়ি, নারী এঁটো পাতিল, নারী আস্তাকুঁড়, নারী আবর্জনা। কবি বলে, নারী নিদ্রাহীন রাতের পরের ভোর, নারী ঘোর, নারী আগুন; বারেবারে পোড়ানো প্রেমের যন্ত্রণা।’

রফিক স্যার আমাদের কান ধরে বেঞ্চির ওপর দাঁড় করালেন। আমরা বাদে পুরো ক্লাস হেসে উঠলো। বিড়ালশিশু আরো কিছু লিখেছিলো। তার আম্মা শিক্ষা দিয়েছেন নবিজির হাদিস। সে গোটা গোটা হরফে লিখেছে—‘নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নারী সবুজ সকাল, অবাধ রহমত, আকাশিঘন্টা স্বর্গলাভের পরওয়ানা। নারী কন্যা, নারী বোন, নারী মা, নারী প্রিয়তমা।’

রফিক স্যার কাগজটা ছিঁড়ে ফেললেন। রাগে তার মুখ লাল হয়ে গেলো। সব কিছুতে ধর্ম কপচানো তিনি পছন্দ করেন না। তিনি বিড়ালশিশুর মাথায় বেশ কয়েকটা গাট্টা দিলেন। বিড়ালশিশু কেঁদে ফেললো। তার অশ্রুদানা মুক্তো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো ক্লাসরুমে। ছেলেমেয়েরা তাড়াহুড়ো লাগিয়ে দিলো মুক্তো কুড়াবে বলে। এ ওকে ধাক্কা দিলো, একে ও ল্যাংচা। বিড়ালশিশু হঠাৎ মিলিয়ে গেলো বাতাসে। আর এই ফাঁকে রফিক স্যার মারিয়াকে ডেকে নিলেন কাছে। সে কিছুই লেখেনি। শাদা পাতা দেখে রফিক স্যার খুবই খুশি হলেন। আমরা ভাবলাম, হয়তো এটাই নারীর উপযুক্ত উপমা—‘শূন্য, অনুভূতিহীন অনুর্বরা…’

রফিক স্যার হঠাৎ মারিয়াকে চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিলেন। আর কী আশ্চর্য, আমাদের চোখের সামনেই ঘৃণা নাকি লজ্জায়, কেঁপে কেঁপে মারিয়া বালিকা থেকে রূপান্তরিত হয়ে পরিণত হলো নারীতে। আমরা দেখলাম—জগতের সকল অমীমাংসিত রচনা ধারণ করে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিকলপরা একটি পাখি…

(চলবে)

লেখক : আলেমা ও সিরাতরচয়িতা